আপডেট : ১৩ এপ্রিল, ২০১৬ ১২:৩১

বাংলা চলচ্চিত্র: চলে যাচ্ছেন তারা, আসছেন কারা?

-রবিউল করিম মৃদুল
বাংলা চলচ্চিত্র: চলে যাচ্ছেন তারা, আসছেন কারা?

মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে চলে গেলেন বাংলা চলচ্চিত্র অঙ্গনের দুই গুণী শিল্পী। ২০ মার্চ পরপারে পারি জমালেন এক সময়ের নন্দিত নায়িকা ও গুণি অভিনেত্রী পারভীন সুলতানা দিতি। ৪ এপ্রিল চলে গেলেন আরেক গুণী পরিচালক শহিদুল ইসলাম খোকন। একজন মাতিয়ে গেছেন ক্যামেরার সামনে, আরেকজন কারিশমা দেখিয়েছেন ক্যামেরার পেছনে। অল্প কদিনের ব্যবধানে এই দুজন গুণী মানুষের প্রয়ানে অপরিসীম ক্ষতি হয়ে গেল বাংলা চলচ্চিত্রের। কিন্তু যেতে তো হবেই। ওপরের ডাকে সাড়া না দিয়ে আর উপায় কী!

আশির দশকের শেষ ও গোটা নব্বই দশক জুড়ে চলচ্চিত্র অঙ্গনে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন এই দুই শিল্পী। একজন অভিনয় করেছেন একের পর এক ব্যবসাসফল বাংলা চলচ্চিত্রে, আরেকজন নির্মাণ করে গেছেন দূর্দান্ত গতিতে।

বাংলা চলচ্চিত্রের যে দূর্দিন দেখা যায় এখন, এমন দিন সব সময় ছিল না। এ অঙ্গনের সোনালী অতীত ছিল বেশ ঝলমলে। হলে হলে দর্শকদের হুমড়ি খাওয়া ভিড়, সিনেমার টিকেট নিয়ে হুড়োহুড়ি-মারামারি, টিভিতে চলচ্চিত্র প্রদর্শণীর দিনে বাড়ির বউ ঝি ছেলে ছোকড়াদের গাদাগাদি করে টিভির সামনে বসা, এমন দিনও ছিল বাংলা চলচ্চিত্রের।

সেই সব সোনালী দিনে ক্যামেরার সামনে লাস্যময়ী যে নায়িকারা কাঁপন ধরাতেন দর্শক হৃদয়ে, দিতি ছিলেন তাদের অন্যতম।

১৯৮৪ সালে নতুন মুখের সন্ধানের মাধ্যমে দেশীয় চলচ্চিত্রে দিতির সম্পৃক্ততা ঘটে। দিতি অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র উদয়ন চৌধুরী পরিচালিত ‘ডাক দিয়ে যাই’। কিন্তু তার প্রথম ছবিটি শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায়নি। দিতি অভিনীত মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম চলচ্চিত্র ছিল ‘আমিই ওস্তাদ’। ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন আজমল হুদা মিঠু। এরপর দিতি প্রায় দুই শতাধিক ছবিতে কাজ করেছেন। সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘স্বামী স্ত্রী’ ছবিতে দিতি আলমগীরের স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেন। এই ছবিতে অভিনয় করে দিতি প্রথম বারের মতো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।

তার অভিনীত বিপুল পরিমাণ ছবির মধ্যে হীরামতি, দুই জীবন, উছিলা, আজকের হাঙ্গামা, স্বামী-স্ত্রী, কালিয়া, শেষ উপহার, লেডি ইন্সপেক্টর ভাইবন্ধু উল্লেখযোগ্য। বাংলা চলচ্চিত্র অঙ্গনের মিষ্টি মেয়ে বলে খ্যাত পারভীন সুলতানা দিতির প্রয়ানে যে ক্ষতি হয়ে গেল তা পূরণ হবার কী? তার এ জায়গা পূরণ করবে কে? যদিও কারো জায়গা কেউ কখনো পূরণ করতে পারে না। প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ জায়গায় উজ্জল হয়ে থাকেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলা চলচ্চিত্রের শিল্পীর সংকট যে প্রকট আকার ধারণ করেছে, তাতে জায়গা পূরণের বিষয়টি সামনে আসে। এতদিন তো তারা ছিলেন, করেছেন, এখন কে/কারা সেই দায়িত্ব নেবেন কাঁধে? সর্বস্তরের দর্শক হৃদয়ে স্থান করে নেওয়ার মত অভিনেতা/অভিনেত্রী তো তৈরি হতে দেখা যাচ্ছে না।

অন্যদিকে, চিত্রপরিচালক শহিদুল ইসলাম খোকন ছিলেন নব্বই দশকের বলতে গেলে প্রায় সবচেয়ে বেশি হিট ছবির নির্মাতা। তার পরিচালনায় ছবি যেমন হিট হয়েছ একের পর এক, তেমনি তিনি উপহার দিয়ে গেছেন নতুন নতুন শিল্পীও। এক সময়ের ছোটপর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদিকে বড় পর্দায় এনেছিলেন তিনিই। এরপর হুমায়ুন ফরিদি বাংলাচলচ্চিত্রে কেমন দোর্দন্ড প্রতাপে অভিনয় করে গেছেন তা এ দেশের দর্শকদের অজানা নয়। এক সময়ের হিট নায়ক রুবেলের চলচ্চিত্র যাত্রাও খোকনের হাত ধরে। তখনকার চলচ্চিত্রের ফাইটিং দৃশ্যে মার্শাল আর্ট এর পরিচিতিটা খোকনের হাত ধরে। একসময় দর্শক কেবল মার্শাল আর্ট নির্ভর ফাইটিং দেখতে হলে যেতেন, এমন দর্শকের সংখ্যা নগন্য নয়। পদ্মগোখরা, বীরপুরুষ, বজ্রমুষ্ঠি, লড়াকু, বিপ্লব, গৃহযুদ্ধ, ম্যাডাম ফুলি, ভন্ড, কমান্ডার, ভেজাবিড়াল খোকনের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র।

৯০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে পরিচালক খোকন মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও তার পরবর্তী সময়ের একটি দুর্দান্ত গল্প নিয়ে ‘কমান্ডার’ নামক ছবি তৈরি করেন। খোকন শুধু ফরিদিকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে রেখে বিপরীতে শাবানা, চম্পা ও সুবর্ণা মোস্তফা’র মতো তিনজন জনপ্রিয় অভিনেত্রীকে নিয়ে তৈরি করেছেন বাংলাদেশের সর্বপ্রথম নায়কবিহীন সম্পূর্ণ সোশ্যাল কমেডি ছবি ‘পালাবী কোথায়’। যার প্রযোজক ছিলেন ফরিদি নিজেই। খোকন, ফরিদি ও রুবেল ত্রয়ী একত্রে জুটি বেঁধে একের পর এক ব্যবসা সফল চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছেন এদেশীয় চলচ্চিত্র দর্শকদের।

ফরিদি গত হয়েছেন দীর্ঘদিন হল। যার জায়গা এখনো বলা চলে একেবারে শূণ্যই পড়ে আছে। তার মত শক্তিমান অভিনেতা বা খল অভিনেতা আর দেখা যায় নি। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই চেষ্টা করছেন বটে, কাজের কাজটি হচ্ছেনা। পুরনো অভিনেতা অভিনেত্রীরা সময়ের নিয়মেই বিদায় নিচ্ছেন, কিন্তু চলচ্চিত্র শিল্পকে ধরে রাখার মত সম্ভাবনাময়ী শিল্পীর সংকট কমেনি বরং বেড়েছে ক্রমাগত।

শুধু শিল্পীই নয়, একই অবস্থা দেখা যাচ্ছে চিত্র পরিচালনার ক্ষেত্রে। এই সময়ের বেশ কিছু ছেলে মেয়ে চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ করছেন, কিন্তু দর্শকদের হলে ফেরাতে পারছেন না। সেই যে দর্শক শূন্য দশকের দিকে হল ছাড়ল, আর ফিরল না। কার্যত দর্শক হলে টানার মত সেরকম উল্লেখযোগ্য ছবির পরিমাণও নিতান্তই নগন্য। একবার যে দর্শক আশাহত হয়ে হল থেকে ফিরছেন, আর যাচ্ছেন না। পরিচালনার জায়গাটিতেও তৈরি হয়েছে গভির সংকট। নতুন পরিচালকরা চেষ্টা করছেন বটে, কিন্তু তা এখনও চেষ্টা পর্যায়েই আছে। সফলতা আসছে না। উল্টো অনেক ক্ষেত্রেই বাংলা চলচ্চিত্রের দশর্করা নতুন পরিচালকদের ওপর হতাশ হয়ে পড়ছেন। সিনেমা বলে প্রচার করে তার যা দেখাচ্ছেন হলে, দর্শক সেটা ভালোভাবে নিচ্ছে না। সংকট বাড়ছেই।

পুরনো শিল্পী, পুরণো নির্মাতরা গত হচ্ছেন, চলচ্চিত্র অঙ্গনের ক্ষত আরো বাড়ছে। অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টো। বর্তমান যুগ তথ্য প্রযুক্তির যুগ। এখন যত উন্নত কারিগরি ব্যবস্থাপনা, উন্নত কলা কৌশল এসেছে, তাতে অত্যাধুনিক মানের চলচ্চিত্র নির্মান হওয়ার কথা। কিন্তু হতাশ হতে হচ্ছে বারবার। পাইরেসির অভিযোগ উঠছে। নকলের অভিযোগ উঠছে। এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী দেশীয় চলচ্চিত্রকে ধ্বংসের মহরায় নেমেছে যেন। নকল স্ক্রীপ্ট, মানহীন অভিনয়, মানহীন নির্মাণ নিয়ে বারবার ধোকা দিচ্ছেন দর্শকদের। দশর্করা বিরক্ত হয়ে হল বিমুখ হচ্ছেন। এইভাবে চলতে থাকলে এই শিল্পের চলমান হুমকি বাড়বে বৈ কমবে না।

দেশীয় চলচ্চিত্র শিল্পের প্রসারে দক্ষ নির্মাণ ও মানসম্পন্ন অভিনয়ের বিকল্প নেই। তার আগে দরকার দক্ষ নির্মাণজ্ঞান সম্পন্ন চিত্রপরিচালক ও অভিনয়জ্ঞান সম্পন্ন পাত্র/পাত্রী। কারিগড়ি কলাকৌশলও দরকার। তবে সবই যেন ডুবে যায় নির্মাতাদের শিল্পজ্ঞান ও পাত্র/পাত্রীদের অভিনয় দক্ষতার অজ্ঞতার কাছে। ভালো গল্প হলে, অভিনয় সুচারু হলে, সিনেমা যেভাবেই দেখানো হবে, দর্শক দেখবে। মানসম্মত স্ক্রীপ্টের সংকটও বর্তমান বাংলা চলচ্চিত্রে প্রকট।

এখন এই শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে সংকট ভেবে বসে থাকলে চলবে না। দক্ষ নির্মাতা যেমন তৈরি হতে হবে, তেমনি তৈরি হতে হবে দক্ষ পাত্র/পাত্রীও। সোনালী অতিতের গুণি শিল্পীরা চলে যাচ্ছেন, এ অপরিসীম ক্ষতি পুষিয়ে নিতে নুতনদের এগিয়ে আসতে হবে। শিখতে হবে। শুধু গ্ল্যামার দিয়ে শিল্প হয় না। শিল্প অন্তরে ধারণ করার জিনিস। নতুন নতুন ছেলেমেয়েরা এগিয়ে আসবে। বাংলা চলচ্চিত্রে শিল্পী/ নির্মাতা সংকট কাটবে এই হল প্রত্যাশা।

লেখক : তরুণ কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষক, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/মাঝি

উপরে