আপডেট : ৯ আগস্ট, ২০১৬ ১০:৪১

লাগামছাড়া চিনির দর

বিডিটাইমস ডেস্ক
লাগামছাড়া চিনির দর

আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দর যখন তলানিতে ছিল, তখনই বিপুল পরিমাণ চিনি আমদানি করেছেন মিল মালিকরা। গত দুই মাসে বিশ্ববাজারে চিনির দর প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বাংলাদেশের বাজারেও তা-ই হয়েছে। যদিও এসব চিনি কেনা হয়েছে প্রায় অর্ধেক দরে, বিদেশে দাম বাড়ার বেশ আগে। দেশের বাজারে প্রতি কেজি চিনির দর এখন ৭৫ টাকায় ঠেকেছে। অথচ আমদানি খরচ, পরিশোধন ব্যয়, সরকারের নির্ধারিত শুল্ক, ভ্যাট ও পরিবহন খরচ যোগ করে প্রতি কেজি চিনির দর হওয়ার কথা ৪৯ টাকা ১২ পয়সা।

সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজারদরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সোমবার প্রতি কেজি চিনির দাম ছিল ৬৮ থেকে ৭২ টাকা। আর গত ১০ জুলাই থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত কেজিপ্রতি চিনির দর ছিল সর্বোচ্চ ৭৫ টাকা। গত বছর একই সময়ে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হয়েছে ৩৮ থেকে ৪০ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশের বাজারে চিনির দর বেড়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দর বৃদ্ধির পূর্বাভাস ছিল আগে থেকেই। কারণ বিশ্বের ৬০ শতাংশ অপরিশোধিত চিনির জোগানদাতা ব্রাজিলে উৎপাদন কম হয়েছে। ভারতেও তাই। ভারত সরকার চিনি রপ্তানির ওপর ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করেছে। অন্যদিকে ব্রাজিলের স্থানীয় মুদ্রা ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে গত দুই মাসে প্রতি টন অপরিশোধিত চিনির দর ৩৫৬ ডলার থেকে বেড়ে ৫০০ ডলারে পৌঁছেছে। তবে প্রতি টন ৫০০ ডলার দরে আমদানি করে তা পরিশোধনসহ সব খরচ যোগ করলেও প্রতি কেজি চিনির দাম হওয়ার কথা ৬৪ টাকা ৮১ পয়সা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ১০ লাখ টন চিনির এলসি নিষ্পত্তি হয়েছিল। এ বছর নিষ্পত্তি হয়েছে ১৭ লাখ টনের। অথচ দেশে চিনির সর্বোচ্চ চাহিদা বছরে ১৫ লাখ টন। এর মধ্যে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের কলগুলোতে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টন চিনি উৎপাদিত হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালের জুলাই থেকে গত এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ১২ লাখ ৭৪ হাজার টন চিনি আমদানি হয়েছে।

টিসিবির কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার আগেই আমদানিকারকরা আগাম অতিরিক্ত সাত লাখ টন আমদানি করে রেখেছেন। এ কারণেই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার পর এলসি নিষ্পত্তি বাড়লেও নতুন এলসি খোলার হার বেশ কম। গত জুলাইয়ে মাত্র ৪৭ হাজার টন অপরিশোধিত চিনি আমদানির এলসি খোলা হয়েছে। এই সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে এক লাখ টনের এলসি। গত মে মাসে ৫০ হাজার ৪০০ টন চিনির এলসি খোলা হয়েছে। গত বছর মে মাসে এলসি খোলা হয়েছিল দুই লাখ ২৬ হাজার ৬৮ টনের। সে হিসাবে গত বছরের মে মাসের তুলনায় এ বছর মে মাসে এক লাখ ৫২ হাজার ৬৮ টন চিনির এলসি কম খোলা হয়েছে। কিন্তু এ বছর মে মাসে আগের বছরের একই  সময়ের তুলনায় নিষ্পত্তি বেড়েছে এক লাখ ৪০ হাজার ৭৪৬ টনের।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ মে থেকে ১১ জুন পর্যন্ত প্রতি টন অপরিশোধিত চিনির গড় এলসি মূল্য ছিল ৩৫৬ ডলার (২৮ হাজার ১৩০ টাকা)। এর সঙ্গে প্রতি টন চিনির ওপর সরকার নির্ধারিত দুই হাজার টাকা শুল্ক, ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বাবদ পাঁচ হাজার ৬২৬ টাকা, ১৫ শতাংশ ভ্যাট বাবদ পাঁচ হাজার ৩৬৩ টাকা এবং পরিশোধন, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বাবদ আট হাজার টাকা যোগ হয়েছ। সব মিলিয়ে  এক টন অপরিশোধিত চিনির এলসি মূল্যের সঙ্গে শুল্ক কর ও অন্যান্য খরচ যোগ করার পর হিসাব করলে প্রতি কেজি চিনির মূল্য দাঁড়ায় ৪৯ টাকা ১২ পয়সা।

গত ১৭ জুন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন অপরিশোধিত চিনির দর ছিল ৫০০ ডলার (৩৯ হাজার ৫০০ টাকা)। এর সঙ্গে প্রতি টনে নির্ধারিত শুল্ক দুই হাজার টাকা, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক সাত হাজার ৯০০ টাকা, ভ্যাট সাত হাজার ৪১০ টাকা এবং উৎপাদন ও অন্যান্য খরচ যোগ করার পর হিসাব করলে প্রতি কেজি চিনির মূল্য দাঁড়ায় ৬৪ টাকা ৮১ পয়সা।

বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের (বিটিসি) এক কর্মকর্তা বলেন, চিনির মূল্য নির্ধারণে এলসি খোলার মূল্য ও এলসি নিষ্পত্তির মূল্যের গড় হিসাব করা হয়। সে হিসাবে, দেশের বাজারে এখন চিনির দাম সর্বোচ্চ ৬৫ টাকা পর্যন্ত হলে তাকে যৌক্তিক বলা যেত। কিন্তু বিক্রি হচ্ছে ৭৫ টাকায়। গত শনিবার দেশের বৃহৎ চিনি কলটি এক হাজার ৬০০ টন চিনি বাজারে ছেড়েছে। তারা মিল গেটেই প্রতি কেজি ৬২ থেকে ৬৪ টাকা দাম নিয়েছে। বাকিটা পাইকারি  ও খুচরা পর্যায়ে যোগ হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্য পূর্বাভাস ও নিয়ন্ত্রণ সেলের এক কর্মকর্তা জানান, চিনির দর নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তৎপর রয়েছে। গত ২৬ জুলাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মুন্সী সফিউল হকের সভাপতিত্বে এ বিষয়ে বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের হাতে থাকা চিনি প্রয়োজন অনুসারে বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। চিনি নিয়ে শিগগিরই আরেকটি বৈঠক হবে। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন বর্তমানে ছুটিতে রয়েছেন। তিনি ফেরার পরই এ বৈঠক হবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব বলেন, ‘ব্রাজিল ও ভারতে উৎপাদন কম হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম বাড়ছে। কিন্তু আমাদের চিনি কল মালিকরা এখন বাজারে যে চিনি ছাড়ছেন, তা আগের কম দামে আমদানি করা। কেউ চিনির বাজার নিয়ে কারসাজি করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে সরকার। তা ছাড়া চিনির দর কিছুটা নামিয়ে আনতে বর্তমানে ২০ শতাংশ হারে যে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ রয়েছে, তা কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দিতে পারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সে বিষয়েও আলোচনা চলছে।’

চিনি কল মালিকরা ঠিকমতো পাইকারি ব্যবসায়ীদের চিনি সরবরাহ করছেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে। আগে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দর কম ছিল, তখন প্রতি কেজি ৩৮-৪০ টাকা দরে ডিও ব্যবসায়ীদের কাছে হাজার হাজার টন চিনি বিক্রি করেন মিল মালিকরা। এখন আন্তর্জাতিক বাজারের পাশাপাশি দেশের বাজারে দাম বাড়ার কারণে আগের দরের ডিওর  মালিকদের চিনি দিচ্ছেন না মিল মালিকরা। তবে যেসব ব্যবসায়ী বেশি দামে ডিও কিনছেন, তাঁদের প্রায় স্বাভাবিকভাবেই চিনি সরবরাহ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের কাছে প্রায় ৬৬ হাজার ৭২৯ টন চিনি মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন বাহিনীর রেশনের জন্য রাখা হয়েছে ২৩ হাজার টন। বাকি চিনি বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই চিনি সর্বোচ্চ ৫৫ টাকা দরে বিক্রি হওয়ার কথা। প্রতি কেজির প্যাকেটের গায়েও দাম লেখা রয়েছে ৫৫ টাকা। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীরা কম দামের এসব চিনি বাজারে ৭২ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের পরিচালক ও সরকারের যুগ্ম সচিব মীর জহিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের চিনি বাজারে ছাড়া হয়েছে। সরকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ ৫৫ টাকা দরেই তা বিক্রি হচ্ছে। খুচরা পর্যায়েও এ চিনি নির্ধারিত দরেই পাওয়া যাচ্ছে। কারণ চিনির প্যাকেটের গায়েই সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য লেখা রয়েছে।’ সরকারি চিনি কলের চিনি ৭২ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হওয়ার তথ্য অস্বীকার করে তিনি বলেন, ওগুলো বেসরকারি মিলের চিনি।

সূত্র- কালের কণ্ঠ

জেডএম

উপরে