আপডেট : ৩১ জুলাই, ২০১৬ ০৮:২২

জালিয়াত বিদেশি কম্পানিকে কাজ দিতে চাপ

বিডিটাইমস ডেস্ক
জালিয়াত বিদেশি কম্পানিকে কাজ দিতে চাপ

ভুয়া পারফরম্যান্স সনদ জমা দেওয়ার দায়ে টেন্ডার প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়া একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে বিনা মূল্যের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের কাজ দিতে উঠেপড়ে লেগেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই ‘প্রক্রিয়ায় অনিয়মে’র অভিযোগ আনে মন্ত্রণালয়। শুধু তাই নয়, তড়িঘড়ি করে তদন্তেও নেমে পড়ে তারা। এদিকে পছন্দের ওই বিদেশি কম্পানিকে কাজ দেওয়ার জন্য পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান এনসিটিবির (জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড) ওপর মন্ত্রণালয়ের সচিব চাপ প্রয়োগ করেছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানকে অনৈতিকভাবে পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের কাজ দেওয়া হলে দেশের মুদ্রণশিল্প সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্ধেকই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

জানা যায়, ২০১৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিকের ১১ কোটি ৫৭ লাখ বই ছাপার জন্য এনসিটিবি আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করলে ৯৮টি লটে ভাগ করা এই কাজের জন্য ৪২২টি দরপত্র জমা পড়ে। গত ৩১ মে দরদাতাদের উপস্থিতিতে এই দরপত্র খোলা হলে দেখা যায়, ৯৮টি লটের মধ্যে ৭৭টিতে বিদেশি প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে। এর মধ্যে ভারতের উত্তর প্রদেশের পিতাম্বর বুকস প্রা. লি. ৫৫টি লটে, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠান ১৭ লটে ও চীনের প্রতিষ্ঠান দুটি লটে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানগুলো টেন্ডারের শর্ত অনুসারে প্রয়োজনীয়  কাগজপত্র জমা না দেওয়ায় টেন্ডার প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়ে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পিতাম্বর বাংলাদেশে এনসিটিবির বই ছাপার কাজের যে অভিজ্ঞতা সনদ জমা দিয়েছে তা জাল বলে ধরা পড়েছে। এনসিটিবির ভূতপূর্ব চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরিত যে সনদ জমা দেওয়া হয়েছে তাতে কোনো তারিখ কিংবা স্মারক নম্বর নেই। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি ২০১০-১১ এবং ২০১৩-১৪ সালে এনসিটিবির বই মুদ্রণ করেছে বলে প্রত্যয়ন করা হলেও প্রকৃতপক্ষে ২০১৩-১৪ সালে ওই প্রতিষ্ঠান কোনো কাজই করেনি। এই জালিয়াতির দায়ে পিতাম্বরকে টেন্ডার প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কোরিয়ান কম্পানিকে নমুনা কাগজ জমা না দেওয়ায় এবং চীনা কম্পানির ব্যাংক ডকুমেন্ট যথাযথ না হওয়ায় তাদেরও অযোগ্য বলে টেন্ডার প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হয়।

পিতাম্বর টেন্ডার প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়ায় ৫৫টি লটে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ভারতের অন্য প্রতিষ্ঠান কৃষ্ণা ১০টি লটে এবং বাকি ৪৫টি লটে বাংলাদেশের কয়েকটি মুদ্রণশিল্প প্রতিষ্ঠান মুদ্রণকাজের জন্য নির্বাচিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

টেন্ডারের জন্য এনসিটিবির গঠিত টেকনিক্যাল ইভ্যালুয়েশন কমিটি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের জন্য সর্বনিম্ন দরদাতাদের তালিকা প্রস্তুত করে অনুমোদনের জন্য এ কাজের অর্থ সহায়তাদানকারী প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংক এবং প্রাথমিকের বইয়ের কর্তৃপক্ষ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠিয়েছে। টেন্ডার প্রক্রিয়ার নিয়ম অনুসারে ওই দুই কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়া গেলে তারপর সর্বনিম্ন দরদাতাদের কাজ দেওয়ার বিষয়টি জানানো হবে। দেওয়া হবে নোয়া (নো অবজেকশন অ্যাওয়ার্ড)।

কিন্তু কাজ করার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশের আগেই বাতিল হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ পাইয়ে দিতে উঠেপড়ে লেগেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের সচিব হুমায়ুন খালিদ গত ১৪ জুলাই এনসিটিবিতে গিয়ে টেন্ডারের টেকনিক্যাল ইভ্যালুয়েশন কমিটিকে ডেকে পিতাম্বরকে কাজ দেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। কিন্তু টেকনিক্যাল কমিটি রাজি না হওয়ায় এই প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে অভিযোগ করে তদন্তের জন্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব গিয়াস উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেন। ওই কমিটি গত ১৯ জুলাই এসটিবিতে গিয়ে তদন্ত করে।

এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, বিধি অনুসারে নোয়া দেওয়ার পর এ ব্যাপারে কারো আপত্তি থাকলে প্রথমে এনসিটিবির সদস্য-পাঠ্যপুস্তক, তারপর সন্তুষ্ট না হলে এনসিটিবির চেয়ারম্যানের কাছে আপত্তি জানাতে পারবে। এর পরও সন্তুষ্ট না হলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবকে এবং সেখানেও সন্তুষ্ট না হলে সিপিটিইউয়ের (সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট) কাছে নালিশ করতে পারবে। কিন্তু এসব প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে মন্ত্রণালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ সরকারের পিপিআর (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধি) বিরুদ্ধ। পিপিআর অনুসারে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাবিত করার চেষ্টা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এ ব্যাপারে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব হুমায়ুন খালিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘টেন্ডারের বিষয়ে প্রভাবিত করার কোনো সুযোগ নেই। টেকনিক্যাল কমিটি তাদের মতো করে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে আমাদের কাছে একটি কম্পানি অভিযোগ করেছে, আমরা তাদের অভিযোগ আমলে নিয়েছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছি।’

সূত্র- কালের কণ্ঠ

জেডএম

উপরে