আপডেট : ২ জুলাই, ২০১৬ ১১:৫২

চিনি চক্রের পকেটে ৩২৫ কোটি টাকা

বিডিটাইমস ডেস্ক
চিনি চক্রের পকেটে ৩২৫ কোটি টাকা

গড় আমদানি খরচ মাত্র ২৬ টাকা। আমদানিকারক বা উৎপাদক, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতার খরচ ও মুনাফাসহ সব মিলে প্রতি কেজিতে বাড়তি খরচ যোগ হয় আরও ২৫ টাকা ৯৯ পয়সা। সে অনুযায়ী শতভাগ মূল্য সংযোজনের পরও ক্রেতার কাছে সর্বোচ্চ খুচরা দর ৫২ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু বাজারে চিনি বিক্রি হচ্ছে এর চেয়েও ১৩ টাকা বেশি দরে, ৬৫ টাকায়। এ হিসাবে এ রমজানে আড়াই লাখ টন বা ২৫ কোটি কেজি চিনির ভোগব্যয়ে চিনি সিন্ডিকেট ভোক্তার পকেট থেকে অতিরিক্ত হাতিয়ে নিয়েছে ৩২৫ কোটি টাকা। চিনি সরবরাহে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে এ অর্থ হাতিয়ে নেয়া হয়। যুগান্তরের অনুসন্ধানে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

দেশে পণ্যটির আমদানিকারক বা উৎপাদক হিসেবে রয়েছে সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, এস আলম, দেশবন্ধু, আবদুল মোনেম, পারটেক্সসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। মূলত এসব প্রতিষ্ঠানের কারসাজিতেই প্রতিবছর চিনির বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সরাসরি ভোক্তাপর্যায়ে চিনি বিক্রিতে প্রায় ৪০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করে সিটি সুগার ও ইউনাইটেড সুগার মিল। তাই ভোক্তা, খুচরা বিক্রেতা এবং পরিবেশক ও পাইকারদের অভিযোগের তীরও এ দুই প্রতিষ্ঠানের দিকেই।

মিলগেটেই এরা চিনির দাম অযৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। মূল্য সংযোজন ও মুনাফা রেখে মিলগেটে চিনির প্রকৃত দর ৪২ টাকা ৬৫ পয়সার বেশি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সেখানেই বিক্রি হয়েছে ৪৮ টাকা ও ৫৪ টাকায়। গড় দাম ৫১ টাকা। এদের অনুসরণ করে অন্য উৎপাদকরাও যে যেমন পেরেছে দাম বাড়িয়েছে। একইভাবে এ অনৈতিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থানে থেকে শামিল হয়েছে পাইকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও। ফলে সারা দেশেই চিনির বাজার বেজায় চড়েছে। ভোক্তার কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া এ অতিরিক্ত অর্থ বাজার প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সবার পকেটেই ঢুকেছে।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন বলেন, চিনি নিয়ে একটা কারসাজি হয়েছে। অতিরিক্ত দর ও সরবরাহ সংকটের কথাও উঠেছে। আমরা বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখছি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের প্রেক্ষিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এরই মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানকে ২০ লাখ টাকা জরিমানা ও এর এমডিসহ দু’জনকে আটক করা হয়েছে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। এ কারসাজির সঙ্গে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান জড়িত থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে সরকার।  
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতি কেজি চিনির ২৬ টাকা আমদানি মূল্যের সঙ্গে আমদানিকারক বা উৎপাদকই বাড়তি মূল্য সংযোজন করেছে ১৫ টাকা ৫০ পয়সা। এই খরচের মধ্যে আমদানিকারকের ব্যাংক ঋণের সুদ প্রতি কেজিতে ৪ টাকা ৩২ পয়সা, পরিশোধিত ও অপরিশোধিত চিনির ওপর আরোপিত সব ধরনের শুল্ক করের গড় হার ৮ টাকা ৫০ পয়সা, পরিবহন ব্যয় ১ টাকা ৫০ পয়সা, ঝুঁকি খরচ ৩৬ পয়সা এবং বাজারজাত খরচে ২ শতাংশ মুনাফা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর বাইরে পাইকারি পর্যায়ে পরিবহন ব্যয় ও মুনাফা ৬ শতাংশ হারে প্রতি কেজিতে বাড়তি মূল্য সংযোজন ঘটেছে ২ টাকা ৫৬ পয়সা। অনুরূপভাবে খুচরা পর্যায়ে ১৫ শতাংশ হারে বাড়তি মূল্য সংযোজন হয় আরও ৬ টাকা ৭৮ পয়সা। এই হিসেবে পাইকারের বিক্রি দাম হওয়ার কথা ৪৫ টাকা ২১ পয়সা এবং খুচরা বিক্রেতার প্রকৃত বিক্রি দর দাঁড়ায় ৫২ টাকায়। কিন্তু মিলগেটে বেশি মূল্য রাখায় ওই চিনি পাইকাররা বিক্রি করেছে ৫৮ থেকে ৬০ টাকায় এবং খুচরা বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৬৭ টাকায়।

উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রয় কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সিটি গ্রুপের উৎপাদন ক্ষমতা ৫ হাজার টন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পরিকল্পিতভাবে প্রতিষ্ঠানটি সেই উৎপাদন ক্ষমতা ৩ হাজার টনে নামিয়ে আনে। রোজায় সেটি ২ হাজার ৮শ’ টনে এসে ঠেকেছে। আবার ওভারহোলিংয়ের নামে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদনও বন্ধ থেকেছে প্রায় এক সপ্তাহ। এর ফলে মিলগেটে তারা চিনির ডিও সরবরাহ কমিয়ে দেয়। এতে করে নতুন ডিওদাতাদের চাহিদা অনুযায়ী চিনি পেতে বেশ বেগ পোহাতে হয়। তবে তাদের পুরনো ডিও-এর কার্যক্রম চলেছে। ফলে রোজার অনেক আগে থেকেই এদের মিলগেটে অতিরিক্ত বাণিজ্য শুরু হয়। রোজার পুরোটা সময়জুড়েই মিলগেট দর ৪৮ থেকে ৫৪ টাকায় ওঠানামা করেছে। অর্থাৎ এদের মিলগেটে চিনির গড় দাম হচ্ছে ৫১ টাকা। প্রতি কেজিতে বেশি রাখা হয়েছে ৮ টাকা ৩৫ পয়সা। সেই হিসাবে রোজার আগে-পরে গড়ে ৩০ দিনের হিসাব ধরলেও এ রমজানে প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত হাতিয়ে নিয়েছে ৭০ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এ সময়ে তারা ভোক্তা পর্যায়ে ৮ কোটি ৪০ লাখ কেজি চিনির সরবরাহ থেকে এই অর্থ লুটে নেয়।

মেঘনা গ্রুপের উৎপাদন ক্ষমতা ২ হাজার টন। একই পথ অনুসরণ করেছে এ প্রতিষ্ঠানটিও। ওভারহোলিংয়ের নামে এদের উৎপাদন ইউনিটও প্রায় এক সপ্তাহ বন্ধ থাকে। ফলে সরবরাহ সংকট তৈরি হয় ও মিলগেটে আগের চিনির বিক্রি দর বেড়ে যায়। এভাবে নানা প্রক্রিয়ায় ডিও সরবরাহে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ইউনাইটেড সুগারও প্রতি কেজিতে ৮ টাকা ৩৫ পয়সা বেশি হাতিয়ে নেয়। রোজার আগে-পরে এদের ৩০ দিনের বিক্রয় কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এ সময়ে তারা ৬ লাখ কোটি কেজি চিনি সরবরাহ দিয়েছে। এর থেকে অতিরিক্ত হাতিয়ে নিয়েছে ৫০ কোটি ১০ লাখ টাকা। কনজ্যুমারস

অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, বাজারে এ অনৈতিক তৎপরতার রাশ টেনে ধরতে হলে সরকারের উচিত হবে সবার জন্য পরিশোধিত চিনি আমদানির সুযোগ করে দেয়া। একই সঙ্গে দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনি শিল্পকেই বন্ধ করে দেয়া। অনুরূপ রিফাইন শিল্পেরও কোনো যৌক্তিকতা নেই। কারণ এখানে মূল্য সংযোজন ছাড়া কিছুই হয় না। তিনি বলেন, বাজার হতে হবে প্রতিযোগিতাপূর্ণ। সেখানে অনেকের অংশগ্রহণ থাকবে। প্রতিযোগিতা করে যদি কেউ টিকে থাকতে পারে তাহলে সেটি ভালো। কিন্তু কারও একচেটিয়া ব্যবসা করার সুযোগ নেই। তাই গুটিকয়েক মানুষের স্বার্থ না দেখে ১৬ কোটি মানুষের স্বার্থ বিবেচনা করে পরিশোধিত চিনি আমদানির পথ উন্মুক্ত করে দেয়াই হবে ভোক্তা দুর্ভোগ লাঘবের একমাত্র সমাধান। সিটি গ্রুপের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমানের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে ফোন করে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি এ নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তার মহাব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি। পরে মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) বিশ্বজিৎ সাহার সঙ্গে বহুবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

একইভাবে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মুস্তফা কামালের ব্যক্তিগত নম্বরে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তার সাড়া না পেয়ে এ প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা এমএইচ মুন্সীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে তিনিও কথা বলতে রাজি হননি।

মৌলভীবাজারের একাধিক পাইকার এ ব্যাপারে কাছে দাবি করেন, উৎপাদন স্থান থেকে রেশনিং করা হলে সর্বত্রই সংকট দেখা দেবে। এখন তাই হচ্ছে। কিন্তু সরকারের পলিসি পর্যায়ে ওইসব মিল মালিক মিথ্যা ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দিয়ে সংকটের জন্য পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীদের ওপর দোষ চাপিয়ে দিচ্ছে। পাইকারদের মতে, মনিটরিং টিমগুলোর প্রয়োজন এখন মিলগুলোতে জোরালো অভিযান চালানো।

দেশে চিনির বার্ষিক চাহিদা রয়েছে ১৫ লাখ টন। প্রতি মাসে চাহিদা গড়ে ১ লাখ ২৫ হাজার টন। রোজার মাসে স্বাভাবিক এ চাহিদা দ্বিগুণ হয়ে যায়। অর্থাৎ রমজানে চিনির ভোগব্যয় হয় আড়াই লাখ টন। প্রতি টনে ১ হাজার কেজি ধরলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ২৫ কোটি কেজি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে গত জানুয়ারি থেকে এপ্রিলে চিনি আমদানিতে এলসি খোলা হয়েছে ৫ লাখ ৮১ হাজার ৩৮০টি। এ সময়ের মধ্যে এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ৬ লাখ ২৩ হাজার ৫২৬টি। এ বছরের প্রথম চার মাসে প্রতি কেজি চিনির গড় আমদানি মূল্য পড়েছে ২৬ টাকা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যমতে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৭ লাখ ৯৪ হাজার টন চিনি আমদানি হয়েছে। সে বছর চিনির চাহিদা পূরণের পরও দেশে উদ্বৃত্ত ছিল ২ লাখ ৯৪ হাজার টন। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে আমদানি হয়েছে ১২ লাখ ৭৪ হাজার টন। ফলে এ বছর দেশে মোট চিনি মজুদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৬৮ হাজার টন। গত ১০ মাসে ভোগ হয়েছে ১৩ লাখ ৭৫ হাজার টন। রমজানে চাহিদা আড়াই লাখ টন। বেসরকারি খাতে অর্থবছরের শেষ মাসটি (জুন) ২ লাখ ৯৩ হাজার টন চিনির মজুদ নিয়ে শুরু হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের কাছে চিনির মজুদ রয়েছে আরও এক লাখ টন। অর্থাৎ দেশে চিনির কোনো সংকট নেই। বরং চাহিদার তুলনায় বেশি রয়েছে।
বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান মুশফেকা ইকফাৎ এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, মিলগেটে বেশি দর রাখার অভিযোগ ওঠার পর আমরা চিনি উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বসেছি। ওদের ডিওগুলো পর্যালোচনা করে দেখেছি। এতে বেশিরভাগ ডিওতে প্রতি কেজির দর ছিল ৪৮ টাকা। তবে ক্ষেত্র বিশেষে এর ব্যতিক্রম হতে পারে। সেটি দেখবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তবে পণ্যটির যৌক্তিক দাম পর্যালোচনা করে আমরা দেখেছি এর খুচরা মূল্য ৫৬ টাকার বেশি হওয়া উচিত নয়। মুক্তবাজার অর্থনীতির কারণে আমরা তাদের বাধ্য করতে পারি না। কিন্তু তাদের এর ভেতরেই বিক্রি করার অনুরোধ জানিয়েছি।
দেশে ছয়টি রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজের বার্ষিক চিনি উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে ৩১ লাখ ৫০ হাজার টন।

কিন্তু এরা পরিকল্পিতভাবে উৎপাদন সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম উৎপাদন করছে। আর এ সুযোগেই চিনির বাজার অস্থির করে তোলে সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেট। যদিও এদের পরিশোধিত ও অপরিশোধিত চিনি আমদানি এবং নতুন এলসি খোলার প্রবণতা থেমে থাকে না।

বাংলাদেশ সুগার রিফাইনারি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, আবদুল মোনেম সুগার মিলের উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার টন, বছরে ৩ লাখ টন। এস আলম রিফাইনারি ও পারটেক্স সুগার মিলের সক্ষমতাও একই। দেশবন্ধুর দৈনিক ৫০০ টন হিসেবে বছরে দেড় লাখ টন উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে।

সূত্র- যুগান্তর

জেডএম

উপরে