আপডেট : ২৯ মে, ২০১৬ ০৭:২৮

১১ মাসের কাজ এক মাসে সারতে হুলস্থুল!

বিডিটাইমস ডেস্ক
১১ মাসের কাজ এক মাসে সারতে হুলস্থুল!

চলতি অর্থবছর শেষ হতে আর মাত্র এক মাস বাকি। স্বাভাবিকভাবেই এই অর্থবছরের ১১ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দ করা বেশির ভাগ টাকাই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু শিক্ষা খাত তাদের বিভিন্ন প্রকল্পে এপ্রিল মাস পর্যন্ত বরাদ্দের অর্ধেক টাকাও শেষ করতে পারেনি। এখন শেষ সময়ে চলছে টাকা ব্যয় করার হুলস্থুল কাণ্ড। অনেক প্রকল্পেই আপাতত বিল-ভাউচার করে টাকা উত্তোলন করার চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। আবার কেউ কেউ তাড়াহুড়া করে যেনতেনভাবে কাজ শেষ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। ফলে কাজের মান নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে তেমনি সন্দেহও দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কয়েকটি প্রকল্পে ১১ মাসে মাত্র ১ শতাংশ অর্থ ব্যয় করেও বাকি এক মাসে পুরো অর্থ ব্যয় করার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করা হচ্ছে।    

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) এ মন্ত্রণালয়ের ৭৩টি প্রকল্পের জন্য চার হাজার ১২৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে সরকারের (জিওবি) তিন হাজার ৬২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা এবং প্রকল্প সহায়তা এক হাজার ৬৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। গত মার্চ পর্যন্ত এসব প্রকল্পের জন্য দুই হাজার ৬৪৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ছাড় করা হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ৬৪ শতাংশ। অথচ এই সময়ে ব্যয় করা হয়েছে এক হাজার ৮৮০ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৪৫ শতাংশ। অথচ গত অর্থবছরের এই সময়েই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এডিপি বাস্তবায়নের অগ্রগতি ছিল ৪৯ শতাংশ।

জানা যায়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের ১৪টি প্রকল্পের গত এপ্রিল পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি ৪৭.৩১ শতাংশ। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মার্চ পর্যন্ত ব্যয় ৪৩ শতাংশ, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের ৩৩ শতাংশ, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ৪৪ শতাংশ, বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২৭ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মার্চ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে বরাদ্দের মাত্র ১৪ শতাংশ।

এসব বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) এ এস মাহমুদ বলেন, ‘আশা করছি, আমরা যথাসময়েই শতভাগ টাকা ব্যয় করতে সমর্থ হব। আসলে শিক্ষার প্রকল্পগুলো ভিন্ন। ট্রেনিং-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর টাকা সঙ্গে সঙ্গেই ব্যয় হয়। কিন্তু উপবৃত্তির টাকা একটা নির্দিষ্ট সময়ে দিতে হয়। আর নির্মাণকাজ শেষ হলেই বিলের বড় অংশ দেওয়া হয়। সে ক্ষেত্রে সারা বছর কিন্তু ঠিকই কাজ হচ্ছে, তবে টাকা পরিশোধ করতে হবে জুনে। সব সময়ই অর্থবছরের শেষ দিকে পাওনাদি পরিশোধ করা হয়। নির্মাণসংশ্লিষ্ট কাজের পাওনা পরিশোধ করলে একসঙ্গে অনেক টাকা চলে যাবে।’

গত ৮ মে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সভাপতিত্বে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের এডিপির বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়ে পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বরাদ্দ করা অর্থের শতভাগ ব্যয় করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা প্রদান করা হয়। কিন্তু অর্থ ব্যয় নিয়ে ভিন্ন রকমের তথ্যও পাওয়া গেছে। মাউশি অধিদপ্তর গত মার্চ পর্যন্ত এডিপির ৫১ শতাংশ অর্থ ব্যয় করেছে বলে মন্ত্রণালয়কে জানায়। কিন্তু মাউশির ১৪টি প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে জানা যায়, মার্চ নয়, গত এপ্রিল পর্যন্ত তাদের ব্যয় হয়েছে ৪৭.৩১ শতাংশ।

নাম প্রকাশ না করে একজন প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘বিদেশি সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পগুলোতে নানা বাধা রয়েছে। দেখা যায়, তারা প্রকল্পের মোট অর্থের এক-চতুর্থাংশ দিয়েছে কিন্তু পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করছে। কী করা যাবে বা  যাবে না, কোন জায়গা থেকে মালপত্র নেওয়া যাবে বা যাবে না—এসব বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি অবকাঠামো উন্নয়নের কাজে অভিজ্ঞ ও নামি-দামি কম্পানি ছাড়া তারা কাজ দিতে চায় না। বর্তমানে তাদের চাহিদামতো কম্পানির সংখ্যা কম। যারা আছে তারা তাদের সক্ষমতার চেয়েও বেশি কাজ পায়। ফলে কাজ শেষ করতে দেরি হয়ে যায়। অথচ যদি এসব শর্তে কিছুটা ছাড় দিয়ে কাজ বুঝে নেওয়া হয়, তাহলে আনুপাতিক হারেই কাজ শেষ হবে। বরাদ্দ নিয়েও এত চিন্তা করতে হবে না। তবে যেহেতু আমরা একটা সিস্টেমের মধ্যে বাঁধা, তাই শেষ সময়ে তাড়াহুড়ো করেই আমাদের কাজ করতে হয়।’

মাউশি অধিদপ্তর সূত্র জানায়, সেকেন্ডারি এডুকেশন কোয়ালিটি অ্যান্ড অ্যাকসেস এনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট (সেকায়েপ) গত এপ্রিল পর্যন্ত ব্যয় করেছে ৬১.৩২ শতাংশ, ৩১৫ উপজেলা সদরে নির্বাচিত বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোকে মডেল স্কুলে রূপান্তর প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩২.৭৯ শতাংশ, ঢাকা মহানগরীতে ১১ স্কুল ও ছয় কলেজ নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৬১.৮০ শতাংশ, ৭০ সরকারি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজের উন্নয়ন প্রকল্পে ৪১.৪৭ শতাংশ, স্নাতক (পাস) ছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রদান প্রকল্পে ৪৫.২১ শতাংশ, বিদেশি ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প ২-এ ২৬.০২ শতাংশ, টিচার্স কোয়ালিটি ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পে ৫৪.৬৩ শতাংশ, আইসিটির মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার প্রচলন প্রকল্পে ৬৪.৪৬ শতাংশ, সাতটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পে ৫৩.৭৪ শতাংশ, সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রামে (সেসিপ) ৫৯.১৬ শতাংশ, অটিস্টিক একাডেমি স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পে ৩.৯৪ শতাংশ, মাধ্যমিক শিক্ষা উপবৃত্তি দ্বিতীয় পর্যায় প্রকল্পে ০.৯৩ শতাংশ, উচ্চ মাধ্যমিক উপবৃত্তি প্রকল্পে ০.৮৭ শতাংশ এবং জেনারেশন ব্রেক থ্রু প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৮৯.৩৬ শতাংশ টাকা।

গত মার্চ মাস পর্যন্ত প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি নিয়ে সম্প্রতি মাউশি অধিদপ্তর এক সভার আয়োজন করে। সেখানে অটিস্টিক একাডেমি শীর্ষক প্রকল্প পরিচালক হযরত আলী বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণ ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য কার্যক্রম বাবদ বরাদ্দ করা অর্থ ব্যয় করাই (এ অর্থবছরে) শুধু সম্ভব হবে।’ একই সভায় মাধ্যমিক শিক্ষা উপবৃত্তি প্রকল্প পরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, ‘প্রায় ৫০ হাজার ছেলেমেয়ের উপবৃত্তি বিতরণে সমস্যা দেখা দিয়েছিল, বর্তমানে তা সংশোধন করা হয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং নিয়ে উপবৃত্তি বিতরণেও কিছু সমস্যা রয়েছে। যদিও বর্তমানে প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি কম, তার পরও অবশিষ্ট সময়ের মধ্যে বরাদ্দ করা অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হবে।’ উচ্চ মাধ্যমিক উপবৃত্তি প্রকল্প পরিচালক শ্যামা প্রসাদ বেপারী উপবৃত্তি বিতরণ নির্ধারিত সময়ে শেষ হবে বলে জানান। ওই সভায় টিকিউআই প্রকল্প পরিচালক জহির উদ্দিন বাবর জানান, ‘চলতি অর্থবছরে আরএডিপিতে প্রকল্প সাহায্য অংশে চাহিদার অতিরিক্ত ছয় কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ হয়েছে, যা ব্যয় করা কষ্টসাধ্য হবে।’ এ ছাড়া আরো কয়েকজন প্রকল্প পরিচালক তাঁদের বরাদ্দকৃত টাকা ব্যয় করা কষ্টকর হয়ে পড়বে বলে জানিয়েছেন।

এসব বিষয়ে মাউশি অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসাইন বলেন, ‘সব সময়ই শেষের দিকে কাজের গতি বেশি থাকে। আশা করছি, জুনের মধ্যেই প্রায় শতভাগ অর্থ খরচ হয়ে যাবে। তবে শুরুর দিকে যদি বেশি বরাদ্দ দেওয়া হতো তাহলে এই সময়ে আনুপাতিক হারেই কাজ শেষ হয়ে যেত।

সূত্র-কালের কণ্ঠ

জেডএম

উপরে