আপডেট : ২২ মার্চ, ২০১৬ ২০:৩৪

দার্জিলিং: মেঘের রাজ্যেই হোক তবে মধুমিতালী

পরাগ মাঝি
দার্জিলিং: মেঘের রাজ্যেই হোক তবে মধুমিতালী

কেমন হবে, যদি রাত-বিরাতে দুষ্ট মেঘ এসে টোকা দেয় পাহাড়ের চূড়োয় আপনার কটেজের দরজায়! মেঘের এই দুষ্টুমি আপনার মাদকতা বাড়িয়ে দেবে শতগুন। আপনার সঙ্গীকে মনে হবে আরও রোমাঞ্চকর। রোমাঞ্চের এই স্বর্গভূমি দেখতে চাইলে কেবল পরিকল্পনা নয়, করে ফেলুন এর বাস্তবায়নও।

হিমালয়ের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ছবির মতো সুন্দর স্বপ্নপুরী দার্জিলিং ভ্রমণ নিয়েই বিডিটাইমস’র আজকের আয়োজন-

দার্জিলিং জেলা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের অন্তর্গত একটি গ্রীষ্মকালীন অবকাশ যাপন কেন্দ্র।

হিমালয়ের পাদদেশে দক্ষিণ থেকে উত্তরে মোটামুটি ১০কিমি লম্বা শহর টা একটা পাহাড়ের উপর, এটাকে বলে শিবালিক রেঞ্জ, লোকাল নাম চূড়িয়া। মূলতঃ বৃটিশ রাজের সময় থেকেই এর বিস্তার, ওদের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী ছিলো, তারও আগে ছিলো সিকিমের অর্ন্তভূক্ত, প্রথমে বৃটিশরা লীজ নিয়ে (১৮৩৫ সালে) এখানে আসে এবং আস্তে আস্তে নিজেদের করে। সে সময়টাতে স্কটিশ মিশনারীরা এর উন্নয়নের দায়িত্বে ছিলো, চা বাগান, স্কুল-কলেজ ওদের সময়েই করা এবং ওরাই পরিচালনা করতো। তখন থেকেই দারজিলিং এর স্কুল সারা ভারতে নামকরা।

বৃটিশ অনূগত রাজা আর জমিদাররা বৃটিশদের দেখাদেখি এখানে গ্রীষ্মকালীন অবকাশ কাটাতে আসা শুরু করলে আস্তে আস্তে এটা টুরিস্ট স্পট হিসাবে পরিচয় পেতে থাকে। গৌরীপুরের জমিদার, দিনাজপুর কিংবা মুক্তাগাছার জমিদার সবার গ্রীষ্মকালীন আবাসন ছিলো এখানে। কালিম্পঙ্গে দিনাজপুরের রাজবাড়ী বর্তমানে হোটেল পার্ক, একই জায়গায় কবি রবীন্দ্রনাথের বাড়ী কারিগরী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। বৃটিশরা যেখান থেকে বসতি শুরু করে সে পাহাড়টির নাম ওরা দিয়েছিলো অবজারভেটরী হিল, মূল শহরটা এই অবজারভেটরী হিলকে কেন্দ্র করেই।

কিভাবে যাবেন?

বাংলাদেশ থেকে দার্জিলিং যাওয়ার সহজ ব্যবস্থা হচ্ছে বাস (প্রায় ২৮ ঘণ্টা লাগবে)।
ঢাকা থেকে বেশ কিছু পরিবহনের বাস সরাসরি বুরিমারি, লালমনিরহাট যায়। যেতে সময় লাগবে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা। বুরিমারি এদিককার বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত শহর। চার-পাঁচটা দোকান আর কয়েকটা বাস কোম্পানীর অফিস এই হলো বুড়িমারী, একটা রেল স্টেশন আছে কিন্তু চালু না, ভারত থেকে কয়লা আর পাথর টানা হতো একসময়। এরই মাঝে বুড়ীর দোকান, একসময় খুপরী ঘর ছিলো, এখন পাকা দালান, একনামে চেনে সবাই। যারা এ লাইনে নিয়মিত যাতায়াত করেন তাদের কাছে সকালের নাস্তার জন্য প্রথম পছন্দ বুড়ীর হোটেল।

ইমিগ্রেশন পেরোতে সময় লাগবে ২ ঘণ্টার মত। বুড়ীমারীর ওপারে জায়গাটার নাম চেংড়াবান্ধা, ওপারে বাস আছে, টেক্সি আছে, শিলিগুড়ী টেক্সিতেও যাওয়া যায়, ৮২ কিঃমিঃ নেবে ৫০০রুপীর মতো। চেংড়াবান্ধা থেকে যেতে হবে শিলিগুড়ি সময় লাগবে দুই ঘন্টার উপর। শিলিগুড়ী মহকুমা শহর (জেলা দারজিলিং) হলেও অনেক বড়ো, ভারতের পূর্বাঞ্চলের সাতটা রাজ্যের জিনিষপত্র শিলিগুড়ী হয়েই যায়, তাই এর গুরুত্ত অনেক। শিলিগুড়ী থেকে দার্জিলিং জীপ ভাড়া সাধারণত ৭০০-৮০০ রুপীর মাঝেই থাকে। শিলিগুড়ী থেকে ৩৫ কিমি যাবার পর কার্সিয়াং, ছোট্টো হিল্ স্টেশন। এখান থেকে সোজা দার্জিলিং, সময় লাগবে ঘণ্টা ২ এর মত।

আকাশ পথেঃ দার্জিলিং এর সর্ব কাছের বিমানবন্দর বাগডোগরা, শিলিগুড়ি। দার্শজিলিং শহর থেকে ৯৬ কিঃ মিঃ দূরে, সময় লাগবে ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট। ঢাকা থেকে সরাসরি কোন ফ্লাইট নেই, কলকাতা হয়ে যেতে হবে। কলকাতা থেকে যেতে সময় লাগবে ৫০ মিনিট। অথবা ঢাকা থেকে সৈয়দপুর বিমানে গিয়ে (৫০ মিনিট) সেখান থেকে গাড়ীতে বুরিমারি হয়েও যেতে পারেন।

কোথায় থাকবেন?

পুঞ্জীভূত মেঘের কণা ভেদ করে আঁকাবাঁকা পথের ধারে পুরো দার্জিলিং শহরে রয়েছে অসংখ্য আবাসিক হোটেল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হোটেলে প্রতিদিনের থাকা এবং খাওয়াসহ জনপ্রতি ভাড়া প্রায় ৮৫০-১২০০ রুপি করে। প্রায় প্রতিটি হোটেলেই রয়েছে দর্শনীয় স্থানসমূহ ঘুরে বেড়ানোর জন্য আকর্ষণীয় জিপ, সার্বক্ষণিক গরম পানির ব্যবস্থা, ঠাণ্ডা প্রতিরোধে ওষুধসহ যে কোন মুহূর্তে যে কোন সমস্যার তাৎক্ষণিক সেবা।

খাবার-দাবার

ট্যুরিস্টদের জন্য হোটেলগুলোতে সব ধরনের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। ফলে পুষ্টিকর ও রুচিসম্মত খাবার নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর অসংখ্য ট্যুরিস্টের আগমনের ফলে এখানকার হোটেল মালিকরা বাংলাদেশীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় একেবারে বাঙালি রুচিসম্মত খাবার-দাবারের জোগান দিয়ে থাকেন। ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ এবং ডিনার ছাড়াও হোটেল কর্তৃপক্ষ ভোরবেলায় বেড-টি এবং ডিনারের আগে ইভনিং-টি’র ব্যবস্থাও করে থাকেন।

কোথায় বেড়াবেন?

*পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু রেলওয়ে স্টেশন ‘ঘুম’।

*সমুদ্র-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০,০০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়া থেকে অপূর্ব সূর্যোদয় দেখা।

*খুব ভোরে ৮ হাজার ৩’শ ফুট উঁচু টাইগার হিল থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা পাহাড় চূড়ায় সূর্যোদয়ের অসাধারণ দৃশ্য।

*পৃথিবীর বিখ্যাত প্রার্থনা স্থান ঘুম মোনাস্ট্রি।

*ছবির মতো সুন্দর স্মৃতিসৌধ বাতাসিয়া লুপ।

*বিলুপ্ত-প্রায় পাহাড়ি বাঘ ঝহড়ি খঁঢ়ধৎফ খ্যাত দার্জিলিং চিড়িয়াখানা।

*পাহাড়ে অভিযান শিক্ষাকেন্দ্র হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউট। সর্বপ্রথম এভারেস্ট বিজয়ী তেনজিং-রক- এর স্মৃতিস্তম্ভ।

*কেবল কারে ১৬ কিমিটার এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে ভ্রমণ।

*হ্যাপি ভ্যালি টি গার্ডেনে পৃথিবী খ্যাত ব্ল্যাক টি পানের অপূর্ব অভিজ্ঞতা।

*যুদ্ধবিধ্বস্ত শরণার্থী কেন্দ্র তিব্বতিয়ান সেলফ হেলপ্ সেন্টার।

*প্রায় ৮’শ ফুট উঁচুতে দার্জিলিং গোরখা স্টেডিয়াম।

*নেপালি জাতির স্বাক্ষর বহনকারী দার্জিলিং মিউজিয়াম।

*পৃথিবীর বিখ্যাত বৌদ্ধ বিহার জাপানিজ টেম্পল,

*ব্রিটিশ আমলের সরকারি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র কাউন্সিল হাউস লাল কুঠির অসাধারণ শৈল্পিক নিদর্শন খ্যাত আভা আর্ট গ্যালারি।

*শতবর্ষের প্রাচীন মন্দির দিরদাহাম টেম্পল।

*পাথর কেটে তৈরি রক গার্ডেন এবং গঙ্গামায়া পার্ক।

*হিমালয় কন্যা কাঞ্চন-জংঘা, পানির অবিরাম ঝর্ণাধারা ভিক্টোরিয়া ফলস্ এবং সুসভ্য জাতির সংস্কৃতি।

কেনাকাটা

দার্জিলিং শহরের লাডেন-লা রোডের কোল ঘেঁষে রয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় মার্কেট। দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহার্য প্রায় সব জিনিসই আপনি পেয়ে যাবেন আপনার ক্রয়- ক্ষমতার মধ্যে। সবচেয়ে ভালো পাবেন শীতের পোশাক। হাতমোজা, কানটুপি, মাফলার, সোয়েটারসহ যে কোন প্রকারের লেদার জ্যাকেট পেয়ে যাবেন আপনার পছন্দমতো মূল্যে। তাছাড়া ১০০ থেকে ৫০০ রুপির মধ্যে পেয়ে যাবেন অসাধারণ কাজ করা নেপালি শাল এবং শাড়ি যা আপনার পছন্দ হতে বাধ্য। প্রিয়জনকে উপহার দিতে সর্বনিম্ন ২০ রুপি থেকে ২৫০ রুপির মধ্যে পেয়ে যাবেন বিভিন্ন অ্যান্টিক্স ও নানাবিধ গিফট আইটেম, যা আপনার প্রিয়জনের ভালোবাসা কেড়ে নিতে সক্ষম।

তাছাড়া আকর্ষণীয় লেদার সু আর বাহারি সানগ্লাস তো আছেই। কেনাকাটা করতে গিয়ে প্রতারিত হওয়ার আশংকা একেবারেই নেই। তবে হোটেলগুলোতে কিছু নেপালি তরুণ-তরুণী ভ্রাম্যমাণ ফেরি করে শাল, শাড়ি বিক্রয় করে থাকে। তাদের কাছ থেকে না কেনাটাই উত্তম।

ঝুঁকি

মানুষের জীবনটাই একটা বড় ঝুঁকি। তার পরেও সাবধানতা অবলম্বন করে ঝুঁকি এড়িয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে বেঁচে থাকার প্রয়াস পেয়েছে মানুষ দীর্ঘকাল। দার্জিলিং ভ্রমণেও ছোটখাটো কিছু ঝুঁকি রয়েছে। মাঝে-মাঝেই পাহাড়ি অঞ্চলে ছোটখাটো ধস নামে। তবে সেটা বেশি হয় বর্ষা মৌসুমে। শীত বা গরমে সে ঝুঁকিটা একেবারেই নেই। আর গরম জামাকাপড় ব্যবহারে অবহেলা না করলে ঠাণ্ডা লাগার ঝুঁকিটাও কমে যায় একেবারেই। তাছাড়া হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সবরকম বিষয়ে পরামর্শ করে চলাফেরা করলে স্থানীয় দালাল বা হারিয়ে যাওয়ার আশংকা থেকেও আপনি পেয়ে যাবেন পুরোপুরি মুক্তি।

মোট খরচ

স্বল্প খরচে, অল্প আরামে মনটাকে মানিয়ে নিতে পারলে মাত্র ১০,০০০ টাকার মধ্যেই আপনি সেরে নিতে পারেন স্বপ্নপুরী দার্জিলিং দেখার যাবতীয় কার্যক্রম। ভালো কথা, এ হিসাবটা শুধু বুড়িমারী সীমান্ত পথের। কলকাতার শিয়ালদহ হয়ে গেলে এ হিসাব বেড়ে দাঁড়াবে সর্বসাকুল্যে ১৫০০০ টাকায়।

মনে রাখা ভালো

ভারতীয় ভিসার আবেদনপত্র পূরণের সময় স্থলবন্দরের নাম উল্লেখ করে দেবেন। শিলিগুড়ি থেকে টাটা সুমো জিপে দার্জিলিংয়ের ভাড়া নেবে ১০০ রুপির মতো। দার্জিলিংয়ে হোটেল ঠিক করে দেওয়ার জন্য জিপ স্ট্যান্ডে দালাল গিজগিজ করবে, তাদের এড়িয়ে নিজে নিজে হোটেল ঠিক করুন। নয়তো রুম ভাড়ায় একশ থেকে দেড়শ রুপি গচ্চা দিতে হবে। এক হাজার থেকে দেড় হাজার রুপি রেঞ্জে মোটামুটি ভালো হোটেল পাবেন, তবে হোটেল ঠিক করার আগে গরম পানি আর রুম হিটারের ব্যবস্থাটি জেনে নিতে ভুল করবেন না যেন!

যেভাবে পাবেন ভিসা

ভারতীয় ভিসা পাওয়াটা সহজ হলেও নেয়াটা একটু ঝামেলার। ই-টোকেনের জন্য এপ্লাই করলে ৮/১০ দিন পর সিরিয়াল পাওয়া যায়। আর যেদিন আপনি এপ্লাই করবেন সেদিন থেকে ১ মাসের জন্য ভিসা পাবেন। তাই এমন সময় এপ্লাই করবেন যেন কিছুতেই ভারত যেতে ১ মাস ক্রস না করে। আপনার সাথে যদি আপনার স্পাউস থাকে তবে ই-টোকেনের নির্ধারিত দিনে ভিসাপ্রতি ৩০০ টাকা সার্ভিস চার্জসহ সকালবেলাই তাকে মহিলা সারিতে দাড় করিয়ে দিন। কারন ফিমেলদের লাইনটা একটু ছোট থাকে আর সিরিয়াল শুরুও হয় আগে। আবেদনপত্র নিজেই পুরন করুন। আর সকল প্রকার আইডি কার্ডের কপি (না চাইলেও) জমা দিন। অফিস থেকে অবশ্যই NOC নিয়ে জমা দিবেন। আর ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ইউটিলিটির কপি, টিকেটের কপি সবই জমা দিয়ে দিন। ভারতীয় ২জন ব্যাক্তির রেফারেন্স দরকার হয়। সেখানে হোটেলের নাম লিখে দিতে পারেন।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/মাঝি

উপরে