আপডেট : ৯ মার্চ, ২০১৬ ১৯:৪৮

হারিয়ে যাওয়া নগরী "পানাম সিটি"

বিডিটাইমস ডেস্ক
হারিয়ে যাওয়া নগরী

“হারিয়ে যাওয়া নগরী” হিসাবে পরিচিত পানাম নগর বা পানাম সিটি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পার্শবর্তী নারায়ণগঞ্জ জেলার মোগরাপাড়া পয়েন্টে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উত্তরে প্রায় ২.৫ কিলোমিটার অদূরে সোনারগাঁও থানার একটি নিকটতম শহর। পৃথিবীর ১০০টি ধ্বংসপ্রায় ঐতিহাসিক শহরের একটি পানাম নগর। ওয়ার্ল্ড মনুমেন্ট ফান্ড ২০০৬ সালে পানাম নগরকে বিশ্বের ধ্বংসপ্রায় ১০০টি ঐতিহাসিক স্থাপনার তালিকায় প্রকাশ করে। বড় নগর, খাস নগর, পানাম নগর -প্রাচীন সোনারগাঁর এই তিন নগরের মধ্যে পানাম ছিলো সবচেয়ে আকর্ষণীয়। আজ থেকে প্রায় ৪৫০ বছর আগে বার ভূইয়ার দলপতি ঈশা খাঁ ১৫ শতকে বাংলার প্রথম রাজধানী স্থাপন করেছিলেন সোনারগাঁওতে।সোনারগাঁর ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই নগরী গড়ে ওঠে।

ঐতিহাসিক পানাম নগর-
১৫ শতকে ঈসা খাঁ বাংলার প্রথম রাজধানী স্থাপন করেছিলেন সোনাগাঁওয়ে। ঈসা খাঁর যাতায়াত ছিল এই নগরীতে। সেই সময়টাতেই অর্থাৎ সুলতানি আমলে বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতি বিকাশ লাভ করে। পূর্বে মেঘনা আর পশ্চিমে শীতলক্ষ্যা নদীপথে বিলেত থেকে আসতো বিলাতি থানকাপড়, দেশ থেকে যেতো মসলিন। শীতলক্ষ্যা আর মেঘনার ঘাটে প্রতিদিনই ভিড়তো বড় বড় পালতোলা নৌকা। প্রায় ঐ সময়েই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে ইউরোপীয় অনুপ্রেরণায় নতুন ঔপনিবেশিক স্থাপত্যরীতিতে গড়ে উঠে পানাম নগরী। ইংরেজরা এখানে নীলের বাণিজ্যকেন্দ্র খুলে বসে। সেই সাথে মসলিনের বাজার দখল করে নেয় নীল বাণিজ্য।

অনেকে বলেছেন পানাম ছিল সোনারগাঁয়ের রাজধানী। কিন্তু এই দাবীটির পক্ষে যথাযথ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু পানাম নগর যে সোনারগাঁয়ের প্রাচীন নগরী ছিল এই কথা সবাই একবাক্যে মেনে নেন। সোনারগাঁয়ের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য পানামের আশেপাশে অনেক সেতু তৈরি করা হয়েছিল। এদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হল পানাম পুল, দুলালপুর পুল। পানাম পুল এখন আর সেখানে নেই। কালের বিবর্তনে আজ হারিয়ে গেছে। এই পুলগুলো এবং এর সাথে যোগাযোগ রক্ষাকারী সড়ক তৈরি করেছিলেন মোঘলরা। ১৬১১ সালে মোঘলরা সোনারগাঁ অধিকারের পর সেখানকার ব্যাপক উন্নয়ন কাজ করেন।

পানামের অবকাঠামো-
পানাম নগরে ঢুকেই চোখে পড়বে একটি সরু রাস্তার ধারে সারি সারি পুরনো দালান। কোনটা দোতলা কোনটা আবার এক তলা। বাড়িগুলোর স্থাপত্য নিদর্শন দেখে বোঝা যায় এখানে ধনী বণিক শ্রেণীর লোকেরা বসবাস করতেন। বাড়ীগুলোতে মোঘল ও গ্রীক স্থাপত্যশৈলীর মিশ্রণ দেখা যায় এবং প্রতিটি বাড়ির কারুকাজ স্বতন্ত্র। কারুকাজ, রঙের ব্যবহার এবং নির্মাণকৌশলের দিক থেকে নতুন নতুন উদ্ভাবনী কৌশলের প্রমাণ পাওয়া যায় এখানে। প্রায় প্রতিটি বাড়ি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে ঢালাই লোহার তৈরি ব্রাকেট। জানালায় ব্যবহার করা হয়েছে লোহার গ্রিল এবং ঘরে বায়ু চলাচলের জন্য ভেন্টিলেটর ব্যবহার করা হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল বাড়িগুলোতে কাস্ট আয়রনের নিখুঁত কাজ আছে, এবং ইউরোপে ব্যবহৃত কাস্ট আয়রনের কাজের সাথে এই কাজের অনেক মিল লক্ষ্য করা যায়। এছাড়াও মেঝেতে লাল, সাদা, কালো মোজাইকের কারুকাজ লক্ষ্যনীয়। নগরীর ভিতরে আবাসিক ভবন ছাড়াও আছে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, মঠ, গোসলখানা, নাচঘর, পান্থশালা, চিত্রশালা, খাজাঞ্চিখানা, দরবার কক্ষ, গুপ্ত পথ, বিচারালয়, পুরনো জাদুঘর।

এছাড়া আছে ৪০০ বছরের পুরনো টাকশাল বাড়ি। পানাম নগরে টিকে থাকা বাড়িগুলোর মধ্যে ৫২টি বাড়ি উল্লেখযোগ্য। পানাম সড়কের উত্তর পাশে ৩১টি আর দক্ষিণ পাশে ২১টি বাড়ি রয়েছে। প্রায় প্রতিটি বাড়ি দুটি অংশে বিভক্ত। একটি বহির্বাটী এবং অন্যটি অন্দর-বাটি এবং বাড়ির সামনে উন্মুক্ত উঠান আছে। প্রতিটি বাড়ি পরস্পর থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে অবস্থিত। নগরীর মাঝখান দিয়ে একটি সরু রাস্তা পানাম নগরীর ভেতর দিয়ে চলে গেছে। এই রাস্তার দুপাশেই মূলত পানামের বাড়িগুলো তৈরি করা হয়েছে। পানাম নগরে ঢুকেই আপনি হারিয়ে যাবেন কোন এক অতীতে। এই শান্ত সুনিবিড় গ্রামে কালের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে এই ভবন গুলো। সংস্কারের অভাবে ভবনগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। প্রায় প্রতিটি বাড়িতে লাগানো আছে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন। ভবনের জানালাগুলো ইটের গাঁথুনি দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পানাম পুলের কাছে দুলালপুর সড়কের খুব কাছেই রয়েছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক তৈরিকৃত নীলকুঠি। নীল চাষের নির্মম ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়েছে পানামের নীলকুঠি।

নিরাপদ পানির জন্য প্রতিটি বাড়িতেই কুয়া বা কুপ ছিল। নিখুঁত পরিকল্পনা মাফিক পানাম নগর তৈরি করা হয়েছিল। পুরো নগরীতে যেন পানির কোন সমস্যা না হয় তাই নগরীতে পাঁচটি পুকুর ও নগরীর দুপাশে দুটি খাল কাটা হয়েছিল। নগরীতে যেন জলাবদ্ধতা না হয় সেই জন্য পানি নিষ্কাশনের জন্য ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল।

এছাড়া এখানে আছে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহীর শাসনামলে নির্মিত একটি মসজিদ। মসজিদটির নাম গোয়ালদী হোসেন শাহী মসজিদ। সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘর থেকে পশ্চিম দিকে রয়েছে এই মসজিদ। মগরাপাড়া থেকে দক্ষিণ দিকে আরও কিছু ইমারত আছে যেমন বারো আউলিয়ার মাজার, হযরত শাহ ইব্রাহিম দানিশ মন্দা ও তার বংশধরদের মাজার, দমদম দূর্গ ইত্যাদি। পানাম নগরে রয়েছে অসংখ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন। ঈসা খাঁর ছেলে মুসা খাঁর প্রমোদ ভবন যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে ফতেহ শাহের মাজার, সোনাকান্দা দুর্গ, পঞ্চপীরের মাজার, চিলেকোঠা সহ অসংখ্য পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন।

পানামের উল্লেখযোগ্য ঘটনা-
পানাম নগরের সৌন্দর্যে অনেকে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তখন পারস্যের বিখ্যাত কবি ছিলেন কবি হাফিজ। বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দিন আযম শাহ কবিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কবি হাফিজ সেই আমন্ত্রণরক্ষা করতে পারেননি। তাই তিনি উপহার স্বরূপ একটি গজল লিখে পাঠিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ফরাসি একজন পর্যটক সোনারগাঁয়ে এসেছিলেন। তিনি পানাম নগর দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন।

১৯৭১ সাল থেকে অর্থাৎ বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর পানাম নগরের বাড়িগুলো ইজারা দেয়া হয়। কিন্তু অযত্ন আর অবহেলায় বাড়িগুলো নষ্ট হয়ে যেতে থাকে। তাই ২০০৪ সাল থেকে ইজারা দেয়া বন্ধ করে দেয়া হয়। সংরক্ষণের অভাবে ২০০৫ সালে দুটি বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বসে যায়। পরবর্তীতে এই পানাম নগর রক্ষার জন্য বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়।

এখানে অনেক সৌখিন ফটোগ্রাফার তাদের ছবির বিষয়বস্তুর জন্য আসেন। তার অসাধারণ কিছু ছবি তুলে ফিরে যান। এছাড়া এখানে নাসির উদ্দীন ইউসুফ পরিচালিত ‘গেরিলা’ সিনেমাটির কিছু অংশ শুটিং হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের আগের কিছু দৃশ্য ধারণ করার জন্য পানাম নগরকে বেছে নেয়া হয়েছে। ২০১১ সালে ছবিটি মুক্তি পায় এবং প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা পায়। এছাড়া ২০১০ সালে ‘সুবর্ণগ্রাম’ নামের একটি ডকু-ড্রামা তৈরি হয় পানাম নগরীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে।

আরও দেখুন-
সোনারগাঁয়ে পানাম নগর এবং লোকশিল্প জাদুঘর দুটোই পাশাপাশি। তাই সময় নিয়ে এলে এটিও দেখতে পারেন। ১০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে জাদুঘরে প্রবেশ করতে হবে। ফাউন্ডেশনের প্রবেশ পথেই একটি ভাস্কর্য আছে। একজন লোক গরুর গাড়ি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। জাদুঘরের প্রবেশদ্বার সুন্দর কারুকাজ ও নকশায় সজ্জিত। জাদুঘর ভবনের সমনে বিশাল একটি দিঘী আছে। তিনদিকে বাঁধানো ঘাট একপাশের ঘাটের দুইপাশে দুটি ঘোড়ায় সওয়ার সৈন্যের মূর্তি। ফাউন্ডেশনে (সোনারগাঁ জাদুঘর) দর্শনার্থীদের জন্য মোট ১১টি গ্যালারি রয়েছে। প্রতিটি গ্যালারিতে দুর্লভ ঐতিহ্যের নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। গ্যালারিগুলো হল-নিপুণ কাঠ খোদাই গ্যালারি, মুখোশ গ্যালারি, নৌকার মডেল গ্যালারি, আদিবাসী গ্যালারি, লোকজ বাদ্যযন্ত ও পোড়া মাটির নিদর্শন গ্যালারি, তামা, কাঁসা, পিতলের তৈজসপত্র গ্যালারি, লোকজ অলঙ্কার গ্যালারি, বাঁশ, বেত, শীল পাটি গ্যালারি ও বিশেষ প্রদর্শনী গ্যালারি। এছাড়া ফাউন্ডেশন ১৯৯৬ সালে আরো দুটি গ্যালারী স্থাপন করে। যার প্রথমটি কাঠের তৈরি প্রাচীন ও আধুনিককালের নিদর্শন দিয়ে সাজানো হয়েছে। আর অন্য গ্যালারীটি সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্যবাহী জামদানি ও নকশিকাঁথা দিয়ে সাজানো হয়েছে। গ্রামবাংলার প্রায় সব কিছুই এই জাদুঘরে স্থান পেয়েছে। নকশা করা কাঠের দরজা থেকে শুরু করে কাঠের সিন্ধুক, বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র, বিভিন্ন নৌকার ছোট আকৃতির মডেল, পোড়ামাটির পুতুল, পাথরের থালা, পোড়ামাটির নকশি ইট কি নেই সেখানে।

যেভাবে যাবেন-
গুলিস্তান থেকে স্বদেশ, বোরাক ও সোনারগাঁ নামক বাসে উঠে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সোনারগাঁ মোগরাপাড়া চৌরাস্তায় নামতে হবে। মোগরাপাড়া থেকে লোকশিল্প জাদুঘরের দূরত্ব প্রায় ২ কি.মি.। চাইলে রিক্সা অথবা সিএনজি তে করে যেতে পারেন। যদি তাড়াতাড়ি যেতে চান তাহলে সিএনজি নিয়ে নিন। তা নাহলে রিক্সাতে যাওয়াই ভাল। গ্রামের আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে রিক্সায় যেতে খারাপ লাগবেনা। তাছাড়াও নিজস্ব যানবাহন নিয়েও যেতে পারেন। জাদুঘরের সাথেই আছে পার্কিং স্থান। এখান থেকে পানাম নগর খুব কাছেই। চাইলে হেঁটেই যেতে পারবেন।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/এসএম

উপরে