আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ২০:২৪

কাশ্মির : স্বর্গে যাওয়ার আগে দেখে নিন ভূ-স্বর্গও!

পরাগ মাঝি
কাশ্মির : স্বর্গে যাওয়ার আগে দেখে নিন ভূ-স্বর্গও!

কাশ্মির কে বলা হয় ভূ-স্বর্গ। তাই মরে যওয়ার পর যারা স্বর্গে যেতে চান তারা চাইলে একবার দেখে নিতে পারেন ভূ-স্বর্গটাকেও। কাশ্মিরের এমন নৈসর্গিক প্রকৃতিও সৃষ্টিকর্তারই কৃপায়।

প্রথমেই আসি কোন সময়টি কাশ্মীর ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত সময়। কাশ্মীরের পরিপূর্ণ রূপ উপভোগ করতে হলে, আপনাকে কমপক্ষে তিনবার যেতে হবে কাশ্মীর। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর এর দিকে, যখন বর্ষার শেষে চারিদিকে থাকবে সবুজের সমারোহ, গাছে গাছে ধরবে আপেল। আবার ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি, যখন বরফে ছেয়ে যাবে চারিধার।

আর একটি হল এপ্রিল, যখন কাশ্মীরের বিখ্যাত টিউলিপ গার্ডেনে ধরবে ফুল, সাথে থাকবে বরফে ঢাকা পাহাড়ের সারি, রৌদ্রোজ্জ্বল দিন। আর সব বিবেচনা করে, আপনি যদি একবারের জন্য কাশ্মীর যেতে চান, তাহলে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ হবে আপনার জন্য সেরা সময়। তাই আসছে এপ্রিলকে সামনে রেখে সাজিয়ে ফেলুন আপনার ভ্রমণ পরিকল্পনাও।

পাসপোর্ট ও ভিসা

প্রথমেই আলোচনা করা যাক পাসপোর্ট করা নিয়ে। পাসপোর্ট করার নিয়মকানুন সবাই কমবেশী জানেন। অনলাইনে পাসপোর্টের জন্য আবেদন ফর্ম পাওয়া যায়। এই সংক্রান্ত নির্দেশিকা পাওয়া যাবে এই ঠিকানায়ঃ http://www.passport.gov.bd/ যেখানে Online MRP Instruction নামে একটি মেনুবার আছে, এখানে ক্লিক করলে ১৪ পাতার একটি নির্দেশিকা পিডিএফ ফাইল আকারে পাবেন। এখান হতে পাসপোর্ট সংক্রান্ত যাবতীয় প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়ে যাবেন।

এবার পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার পর, দরকার হবে ভারতীয় ভিসা। ভারতীয় ভিসা’র জন্য বর্তমানে ‘ষ্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া’ পরিচালিত ভারতীয় ভিসা সেন্টারের ওয়েবসাইট এর মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন জমা দিতে হয়। এখানে যত যন্ত্রণা, বর্তমানে কোন এজেন্ট ছাড়া অনলাইনে আবেদনপত্র জমা দেয়ার ডেট পাওয়া দুষ্কর। ১৫০০-৫০০০ টাকা পর্যন্ত সার্ভিস চার্জ নিয়ে আপনার আবেদনপত্র জমার ডেট পাইয়ে দিতে পারে এই সকল এজেন্টরা। আপনি যেহেতু অনলাইনে জমা দিতে পারছেন না, প্রয়োজনে ওদের এম্বাসির ভিসা প্রসেসিং সেকশনে মেইল করতে পারেন। আমার পরিচিত একজন এই প্রক্রিয়ায় আবেদনপত্র জমা দেয়ার ডেট পেয়েছে। যেহেতু এখানে টুরিস্ট ভিসার কথা আলোচনা করছি, তাই একটা কথা বলা প্রয়োজন। টুরিস্ট ভিসার জন্য সলভেন্সি প্রুভ হিসেবে আপনার কমপক্ষে ১৫০ ইউএস ডলার সমপরিমাণ অর্থ পাসপোর্টে এন্ডোর্স করতে হবে অথবা ব্যাংক স্টেটমেন্ট জমা দিতে হবে। তবে সবচেয়ে বেটার ডলার এন্ডোর্স করা। আমার এক বন্ধুর ব্যাংক স্টেটমেন্ট এর ট্রানজেকশন প্যাটার্ন এর কারণে ভিসা এপ্লিকেশন রিফিউজ হয়েছে। আপনি চাইলে আপনার ইন্টারন্যাশনাল ক্রেডিট কার্ড দিয়েও ডলার এন্ডোর্স করাতে পারেন। http://www.ivacbd.com/visas_and_document.php এই ঠিকানায় দেয়া নির্দেশিকা হতে সহজেই জেনে নিতে পারবেন আপনার ভিসা আবেদনের জন্য কি কি কাগজপত্র লাগতে পারে।

সাধারণত টুরিস্ট ভিসা’র জন্য যা যা লাগেঃ

* ২”X২” সাইজের পাসপোর্ট সাইজের ছবি (দুই কপি)। (অনলাইন আবেদনপত্র জমা দেয়ার ক্ষেত্রে এই ছবিই স্ক্যান করে দেবেন)

* জাতীয় পরিচয় পত্রের ফটোকপি

* কর্মজীবীদের জন্য অফিস হতে অনাপত্তিপত্র (NOC), ব্যবসায়ীদের জন্য আপডেট ট্রেড লাইসেন্সের ফটোকপি।

অফিস পরিচয়পত্র (এমপ্লয়মেন্ট আইডি কার্ড)

* ভিজিটিং কার্ড

* কমিশনার সার্টিফিকেট

* বর্তমান ঠিকানার সাম্প্রতিক কোন ইউটিলিটি বিলের ফটোকপি।

এখানে মনে রাখবেন, ইউটিলিটি বিলে ঠিকানা যেভাবে লেখা থাকবে, ঠিক সেইভাবে ভিসা এপ্লিকেশন ফর্মে দিতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ, আপনি পাসপোর্ট করার যে বাসায় ছিলেন, এখনো সেখানেই আছেন। ঠিকানা ১০০৪, বিষ্ণু চরন দাস স্ট্রীট, লালবাগ, ঢাকা। কিন্তু আপনার ইউটিলিটি বিলে লেখা আছে, ১০০৪, বি সি দাস স্ট্রীট, লালবাগ, ঢাকা। এক্ষেত্রে আপনি ইউটিলিটি বিলেরটাই আবেদনপত্রে দিবেন। উল্লেখ্য যে, ভিসা আবেদনে চারটি বিষয় বিবেচনা করা হয়ঃ (১) আপনি কোন দেশের নাগরিক (এর জন্য জাতীয় পরিচয় পত্রের ফটোকপি), (২) আপনার স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা (ইউটিলিটি বিলের ফটোকপি এবং কমিশনার সার্টিফিকেট এর জন্য প্রয়োজন), (৩) আপনার পেশার সত্যতা (এজন্য এনওসি, আইডি কার্ড এবং ভিজিটিং কার্ড) এবং (৪) সলভেন্সি (এজন্য নুন্যতম ১৫০ ইউএস ডলার এন্ডোর্সমেণ্ট)।

তো আর কি? এবার পাসপোর্ট এবং ভিসা পর্ব শেষ, আসুন শুরু করি কাশ্মীর যাত্রা। মনে রাখবেন, এই পোস্টে আমি প্রতিটি ভিন্ন ভিন্ন খরচের জন্য পাঁচটি ক্যাটাগরি রাখবো। আপনি যে খরচ যে ক্যাটাগরিতে করতে চান, সেটির খরচ আলাদা করে হিসেবে রেখে আপনার মোট খরচ বের করতে পারবেন।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে শ্রীনগর যাওয়ার বিভিন্ন রুট রয়েছে। ঢাকা হতে কলকাতা বা দিল্লী যেতে হবে প্রথমে। সেখান থেকে সরাসরি শ্রীনগর (বিমানে) অথবা জম্মু হয়ে শ্রীনগর (রেল ও সড়ক পথে)।

কোথায় কোথায় বেড়াবেন

শ্রীনগরঃ ডাল ও নাগিন লেক, মুঘল গার্ডেনস (নিশাতবাগ, শালিমারবাগ, চাশমেশাহি, পারিমাহাল), শঙ্করাচার্য হিল, জামে মসজিদ, হযরত বাল মসজিদ, টিউলিপ গার্ডেন, জাদুঘর, বোটানিক্যাল গার্ডেন।

পাহেলগাওঃ চান্দানওয়ারি, বেতাবভ্যালি, আরুভ্যালি, বাইসারান, লিদারওয়াত রিভার, সান টেম্পল, তুলিয়ান লেক।

গুলমার্গঃ গুলমার্গ গণ্ডোলা, আফারওয়াত পিক, খিলানমার্গ, বাবা রেশির মাজার, গলফ কোর্স, সেন্ট মেরী চার্চ, এলপাথর লেক, বায়সফিয়ার রিজার্ভ, ফিরজপুর নাল্লাহ।
সোনামার্গঃ জজিলা পাস, থাজিওয়াস গ্লেসিয়ার, গাঙ্গাবাল লেক, গাদসার লেক, ভিসান্তার লেক, সাসতার লেক।

সময়ের হিসেব

এখন আসুন সময়ের হিসেবে। শ্রীনগরের সবকয়টি স্থান ভ্রমণের জন্য তিন-চার দিন সময় লাগবে। পাহেলগাও এর সবকয়টি স্থান ভ্রমণে চারদিন, গুলমার্গ তিনদিন, সোনামার্গ দুই দিন। সবমিলে ১২-১৩ দিন কাশ্মীর এর সবকয়টি স্পট ঘুরে দেখতে চাইলে। সাথে ইন্টারনাল ট্রান্সফারে আরও ২-৩ দিন যোগ করে ১৫ দিন। ১৫ দিনে আপনি মোটামুটি সবকয়টি স্থান ঘুরে দেখতে পাবনে। তবে একসপ্তাহের একটা ট্যুর হতে পারে এমনঃ পাহেলগাও তিনদিন, শ্রীনগর দুদিন, গুলমার্গ একদিন, সোনামার্গ একদিন।

খরচের হিসেব

যাতায়াত-

ঢাকা থেকে যশোহর হয়ে বেনাপোল। সেখান থেকে কলকাতা। খরচ ৫০০-১০০০ টাকা। কলকাতা থেকে জম্মু হয়ে শ্রীনগর ১২০০-১৫০০ টাকা।

থাকা-
জম্মু এন্ড কাশ্মীর ট্যুরিজম কর্পোরেশনের ডরমিটরিতে সিট, ৪০০ টাকা। সাধারণ মানের ব্যাচেলরদের জন্য আদর্শ মানের হোটেল, ৬০০ টাকা। ষ্ট্যাণ্ডার্ড হোটেল, ১২০০-১৫০০ টাকা। এছাড়াও সেখানে আছে আরও উন্নতমানের হোটেল; যেখানে খরচ তুলনামূলক একটু বেশিই।

খাওয়া-

যা পাই, তাই খাই- ড্রাই ফুড (রুটি কলা টাইপ) প্রতি বেলা অনধিক ৫০ টাকা। সাধারণ ভারতীয় থালি টাইপ খাবার- প্রতি বেলা ১০০ টাকা। ষ্ট্যাণ্ডার্ড মিল- ২০০ টাকা প্রতি বেলা। ভালো মানের রেস্টুরেন্ট- ৩০০-৪০০ টাকা প্রতি বেলা। সকালের নাস্তার জন্য অর্ধেক খরচ ধরতে পারেন। আর হোটেলের থাকার সাথে ব্রেকফাস্ট ফ্রি থাকলে খরচ শূন্য।

সাইট সিয়িং-

কাশ্মীরে এক জোনের প্রাইভেট কার, অন্য জোনে আপনাকে ড্রপ করে দেবে ঠিকই, কিন্তু ঐ জোনের সাইট সিয়িং এর জন্য আলাদা করে প্রত্যেক জোনের গাড়ী ভাড়া করতে হবে। চারজনের জন্য ট্যাক্সি টাইপ প্রাইভেট গাড়ী দৈনিক ১২০০-১৫০০ টাকা থেকে শুরু করে অনধিক ৩০০০ টাকা। নির্ভর করে সময় এবং কয়টা সাইট ভিজিট করবেন তার উপর। লোকাল ট্রান্সপোর্ট দিয়ে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকা যেতে পারেবেন। কিন্তু সাইট সিয়িং এর জন্য কোন পাবলিক ট্রান্সপোর্ট দেখি নাই। পাহেলগাও, গুলমার্গ এসব এলাকায় সাইট সিয়িং এর জন্য পনি রাইড (ঘোড়ায় চড়া) রয়েছে, খরচ ২০০-১০০০ টাকা, সময় এবং দরদাম এর উপর নির্ভর করে। আর টিকেট বাবদ লাগতে পারে মোট ৫০০ রুপী সর্বোচ্চ; তবে তা গণ্ডোলা রাইড ছাড়া।

তো আর কি? এবার নিজের হিসেব নিজেই করুন। কয়দিন থাকবেন, কোথায় কোথায় বেড়াবেন এর উপর ভিত্তি করে বের করে ফেলুন আপনার বাজেট।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/পিএম

উপরে