আপডেট : ২ মার্চ, ২০১৬ ১১:১৬

আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা সংশোধন হচ্ছে

বিডিটাইমস ডেস্ক
আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা সংশোধন হচ্ছে

উচ্চ আদালতে রিট ও বিভিন্ন মহলের সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে অবশেষে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ৫৭ ধারা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা ও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২-এর ৮(৩) ধারায় অপরাধ একই রকম হলেও দণ্ড ভিন্ন হওয়ায় কিছুটা জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। তাই বিভিন্ন মহলের দাবি বিবেচনা করে সংশোধন করা হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা। সংশোধিত এ আইনে আইসিটি আইনের দণ্ড নির্ধারিত হতে পারে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনের দণ্ডের সমান।

জানা গেছে, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা ও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে অপরাধের ধরন একই রকম হলেও দণ্ডের বিধান ভিন্ন। আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় সর্বোচ্চ সাজা ১৪ বছর এবং জরিমানা এক কোটি টাকা হলেও পর্নোগ্রাফি আইনে এ ধরনের অপরাধের সাজা সর্বোচ্চ ৫ বছর এবং জরিমানা দুই লাখ টাকা।

আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোন ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানি প্রদান করা হয়, তাহা ইহলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ।’ ‘(২) কোন ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন অপরাধ করিলে তিনি অনধিক চৌদ্দ বৎসর এবং অন্যূন সাত বৎসর কারাদন্ড এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’

অন্যদিকে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২-এর ৮(৩) ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোন ব্যক্তি ইন্টারনেট বা ওয়েবসাইট বা মোবাইল ফোন বা অন্য কোন ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে পর্নোগ্রাফি সরবরাহ করিলে তিনি অপরাধ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন এবং উক্তরূপ অপরাধের জন্য তিনি সর্বোচ্চ ৫ (পাঁচ) বৎসর পর্যন্ত সশ্রম কারাদ- এবং ২,০০,০০০ (দুই লক্ষ) টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’

আইনজ্ঞদের মতে, একই ধরনের অপরাধে দুই আইনে দণ্ডের এমন পার্থক্য এক ধরনের বৈষম্য। একই সঙ্গে এটা সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দুই আইনে দণ্ডের এমন বড় ধরনের পার্থক্য নিরসনের জন্য এবং সাধারণ মানুষের হয়রানি রোধ করতেই আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, বিভিন্ন মহলের আপত্তি আছে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারার বিষয়ে। রিটও হয়েছে হাইকোর্টে। খুব শিগগির ধারাটি সংশোধন করা হতে পারে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আশা করি সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার রফিক-উল হক এ ব্যাপারে বলেন, যে আইনে মানুষের সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বা বৈষম্য সৃষ্টির অবস্থা হয়, সে আইন সংশোধন করাই ভালো।

এদিকে, হাইকোর্টে রিটকারীর আইনজীবী শিশির মনির তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা ও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২-এর ৮(৩) ধারায় অপরাধের সাজার ভিন্নতাকে বৈষম্য উল্লেখ করে বলেছেন, এতে সাধরণ মানুষ বিপদে পড়বে। তিনি বলেন, এ ধরনের অপরাধ করলে কোন আইনে মামলা হবে তা নির্ধারণ করবে পুলিশ। এখন পুলিশ যদি পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করে তাহলে তার সাজা হবে কম। আর আইসিটি আইনে সর্বোচ্চ সাজা হবে ১৪ বছর। এখানে ভুক্তভোগীরা বৈষম্যের শিকার হতে পারেন।

অন্যদিকে এ বিষয়ে সরকারকে আইনি নোটিশ দেওয়া শিক্ষক ও লেখকদের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়ার মতে, ৫৭ ধারাকে বিরুদ্ধ মত দমন করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ অপব্যবহার রোধে ধারাটির বিলুপ্তি ঘটাতে হবে।

এদিকে সংবিধানের ৩৯(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘৩৯। (১) চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল। (২) রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের, এবং (খ) সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।’ আইনজীবীদের মতে, সংবিধানের ওই অনুচ্ছেদের ২(ক)-এর সঙ্গে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা সাংঘর্ষিক। এখানে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আইসিটি আইনে তাতে বাধা দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ২৬ জুলাই এ আইন সংশোধনের আগে ৪৬ ও ৫৭ ধারা কেন অবৈধ নয়, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট। তাতে বলা হয়েছিল, ‘আইনের ৫৭ ধারায় ইলেকট্রনিক ফর্মে লেখা অশ্লীল অথবা মানহানিকর তথ্য প্রকাশ-সংক্রান্ত অপরাধ ও দন্ডের বিষয়ে বলা আছে।’ এ ধারামতে, ‘ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ইলেকট্রনিক বিন্যাসে কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যা মিথ্যা, অশ্লীল বা যে প্রকাশনা দেখলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ উদ্দেশ্য মনে জাগতে পারে, তার জন্য জরিমানার বিধান আছে। কিন্তু ব্যক্তি যে নীতিভ্রষ্ট বা তার মনে যে অসৎ উদ্দেশ্য জেগেছে, তা মাপার কোনো মানদ- নেই।‘ যদিও পরে আর ওই রিটের রুলের শুনানি হয়নি।

 

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/আইএম

 

 

উপরে