আপডেট : ২২ জানুয়ারী, ২০১৬ ২২:০১
আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে বিজ্ঞানমেলা

আবিষ্কারের নেশায় মত্ত ক্ষুদে বিজ্ঞানীরা

দেখাচ্ছেন নানা সমস্যার সমাধান
রেজা করিম
আবিষ্কারের নেশায় মত্ত ক্ষুদে বিজ্ঞানীরা

জীবনকে সহজ ও উন্নত করতে বিজ্ঞানীদের বসে থাকার ফুসরত নেই।পৃথিবীকে সহজ ও বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন তারা।অক্লান্ত গবেষণার মাধ্যমে আবিষ্কার করছেন নানা পদ্ধতি, ভিন্ন ভিন্ন যন্ত্র।

আধুনিক জীবন-যাপনে দিনদিন বাড়ছে নানা সমস্যা। তাতে কি? সমস্যা মোকাবিলার হাতিয়ারও খুব সহজে চলে আসছে আমাদের কাছে।

বিজ্ঞানের এ অগ্রযাত্রায় ইতোমধ্যেই মানুষ আধুনিক যুগের পাঠ চুকিয়ে অত্যাধুনিক যুগে পদার্পন করেছেন। হয়তোবা অদূর ভবিষ্যতে আরও বড় কিছু অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।

চন্দ্রাভিযান করেছে অনেক আগেই। শুধু তাই নয়, ভিন্ন গ্রহে বসবাসের প্রক্রিয়া চলছে। অদূর ভবিষ্যতে মানুষ বসবাস শুরু করবে মঙ্গল বা অন্য কোন গ্রহে।

বিজ্ঞানের এই অগ্রযাত্রায় বসে নেই ক্ষুদে বিজ্ঞানীরাও। তারাও সমান তালে কাজ করে যাচ্ছেন; সভ্যতার এই অগ্রযাত্রাকে আরেকটু এগিয়ে নিতে।

তার প্রমাণ পাওয়া গেল রাজধানীর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ ক্যাম্পাসে। সেখানে শুরু হয়েছে তিনদিন ব্যাপি বিজ্ঞান মেলা।

৫০টিরও বেশি স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রদর্শন করছেন তাদের উদ্ভাবিত নানা আবিষ্কার।

রোবট, ড্রোনের মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান থেকে শুরু করে ভূমিকম্প, বাসাবাড়ি, অফিসের নিরাপত্তা, গ্রীণহাউজ ইফেক্ট থেকে বাঁচার উপায়, সড়ক দূর্ঘটনা রোধ, পারমাণবিক বোমা নিষ্ক্রিয়করণ প্রভূত বিষয়কে তুলে এনেছেন এই ক্ষুদে বিজ্ঞানীরা।

একটি দেশের স্বাভাবিক পরিবেশের জন্য মোট আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা দরকার। কিন্তু বাংলাদেশে রয়েছে মাত্র ১৭ ভাগ। যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। তারপরেও যতটুকু আছে সেটুকুও কিছু দূর্বৃত্তের করাল গ্রাসে চলে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। শিকারীরা শিকার করছে বাঘসহ বনের অন্য সব পশু, অন্যদিকে গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে দস্যুরা। এদিকে বন কর্মকর্তারাও এসব সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন।

ফলে বাংলাদেশের বনাঞ্চল এখন পুরোপুরি হুমকির সম্মুখিন এসব নেতিবাচক কর্মকান্ডের জন্য।

যদি এমন হয়, একটি যন্ত্র অতন্দ্র প্রহরীর মত টহল দিবে বন। শিকারীরা পশু শিকারে আসলেই বন কর্মকর্তার অফিসে সংকেত পাঠাবে এই যন্ত্র। এর মাধ্যমে রক্ষা পাবে আমাদের অমুল্য বনজ সম্পদ।

আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী এমনই এক ‘ইকো ড্রোন’ তৈরি করেছে যা দেশের বিভিন্ন বনাঞ্চলকে দুষ্কৃতিকারীদের থেকে রক্ষা করবে।টিমের নেতা মোহাইমিনুল হাসান পরশ জানান, তাদের এই ইকো ড্রোন বনাঞ্চল রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় কাজ করবে।ড্রোনটি বনাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াবে।ড্রোনের সঙ্গে সংযুক্ত একটি ডিটেক্টর মেশিন বন কর্মকর্তার অফিসে সংকেত পাঠাবে।

বনে আগুন লাগলে, কেউ গাছ কাটলে, পশু বা পাখি চুরির ঘটনায় আলাদা আলাদা সংকেত পাঠাবে যার ফলে খুব সহজে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা সময়মত প্রতিরোধ গড়তে পারবেন।

অ্যাভয়ডিং রোবট তৈরি করেছেন রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের শিক্ষার্থীরা।যা আমাদেরকে সড়ক দূর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা করবে। টিমের প্রধান জুবায়ের জানান, রোবটটিতে বেশ কয়েকটি সেন্সরযুক্ত যার মাধ্যমে যখন দুটি গাড়ি মুখোমুখি সংঘর্ষের উপক্রম হবে ঠিক তখনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ীর স্টার্ট বন্ধ হয়ে যাবে।ফলে দূর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পাবে বাসের যাত্রীরা।

বিএন কলেজের ক্ষুদে বিজ্ঞানীরা ‘গ্রীন বিল্ডিং’র ধারণা দিয়েছেন।সায়মা সাদিয়া নিশাত জানান, বর্তমানে আমাদের বাসা-বাড়িতে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির সমস্যায় ভোগতে হয় প্রতিনিয়ত।কিন্তু আমরা একটু পরিকল্পিতভাবে মাল্টি বিল্ডিং তৈরি করলে এ সমস্যা থেকে রেহাই পাবো।বহুতল বিল্ডিংয়ের উপরে থাকবে সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট যার মাধ্যমে আমরা বিদ্যুতের সমস্যা সমাধান করতে পারব।ভবনের ছাদকে কাজে লাগিয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে সারা বছরের পানির চাহিদা মেটাতে পারব।তাছাড়া বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট তৈরি করে ভবনের ময়লা, আবর্জনা ও বিভিন্ন বর্জ্য দিয়ে গ্যাসের চাহিদাও মেটানো সম্ভব।

সড়ক দূর্ঘটনায় প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ প্রাণ হারান দেশের বিভিন্ন রেলক্রসিং গুলোতে। এ সমস্যা সমাধানে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ক্ষুদে বিজ্ঞানীরা প্রদর্শন করেছেন ‘স্মার্ট ক্রসিং রেলওয়ে সিস্টেম’ প্রজেক্ট।যেখানে তারা দেখিয়েছেন একটি ট্রেন সড়ক পার হওয়ার সময় কিভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গেট বন্ধ ও খোলা যায়।এ ব্যবস্থায় খুব সহজেই দূর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পাবো আমরা।টিমের সদস্য শাহেদ জানান, দেশীয় উপাদান ব্যবহার করে এই প্রযুক্তি খুব অল্প খরচে রেল ক্রসিংগুলোতে ব্যবহার করা যাবে।যার মাধ্যমে দূর্ঘটনা যেমন কমবে তেমনি অকাল মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাবে মানুষের জীবন।

বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজের ক্ষুদে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন কিভাবে খুব সহজে বাড়িকে নিরাপত্তার চাদরে মোড়া যায়।এজন্য তারা বেশ কিছু সেন্সর ব্যবহার করেছেন যার মাধ্যমে বাড়িতে না থাকলেও দূর্বৃত্তের আগমণে আপনি সংকেত পাবেন যেকোন স্থান থেকেই।দরজা, জানালা যেদিক দিয়েই প্রবেশ করুক না কেন পাল্টা প্রতিরোধ গড়ার মাধ্যমে রক্ষা করতে পারবেন আপনার মুল্যবান সম্পদ।এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দরকার হবে দুটি মোবাইল ফোন, একটি সেন্সর আর বেশ কিছু তার।

আজকাল অনেকেই বাড়ী থেকে বের হওয়ার সময় ফ্যান, বৈদ্যুতিক লাইট ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সুইচ বন্ধ করতে হরহামেশাই ভূলে যান।তাদেরকে সহায়তা করতে ও বিদ্যুতের অপচয় রোধে বিএএফ শাহীন কলেজের ক্ষুদে বিজ্ঞানীরা নিয়ে এসেছেন ‘ইলেক্ট্রোনিক ডোর’ যার মাধ্যমে আপনি বাড়ীর দরজা বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘরের সকল বৈদুতিক সুইচ বন্ধ হয়ে যাবে।

শহীদ আনোয়ার গার্লস কলেজের ক্ষুদে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন স্পিড ব্রেকারের সাহায্যে কিভাবে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা যায়।শুধু তাই নয়, একই সঙ্গে একটি সবুজ শহরের ধারণা দিয়েছেন তারা।বাস্তবমুখী এ পদ্ধতি বাস্তবায়িত হলে যেমন সবুজে ভরে যাবে শহর তেমনি বিদ্যুতের চাহিদাও মেটানো যাবে বিনা জ্বালানিতে।

শহরের যানজট নিরসনেও ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের গবেষণার অন্ত নেই।নটরডেম কলেজের ক্ষুদে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন রাস্তায় সিগনাল ব্যবস্থা বন্ধ করে কিভাবে মহানগরীকে যানজট মুক্ত করা যায়। ‘ইনটারসেকশন উইদাউথ সিগনাল’ নামের ওই প্রকল্পে বহুমুখী ওভারব্রীজের ধারণা দিয়েছেন তারা।অল্প জায়গায় তৈরি একমুখী এ রাস্তায় কোন রকম সিগনাল থাকবেনা।এ কারণে যানজটের করাল গ্রাসের মুখোমুখী হতে হবেনা নগরবাসীকে।দলের প্রধান আইমান জামান বলেন, ‘নগরীর দূর্বিষহ যানজট থেকে মুক্তি পেতে আমাদের এই পদ্ধতি নিশ্চয়ই কাজে লাগবে।শুধু দরকার পরিকল্পনা ও কাজ।’

বর্তমান সময়ের মানববিধবংসী পারমানবিক বোমার ধবংস লীলার পরিণতি ভাবিয়ে তুলেছে ভিকারুননেসা নুন স্কুলের ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের।পারমানবিক বোমা নিষ্কৃয়করণের পদ্ধতি দেখালেন তারা।অতি অল্প খরচে ও খুব সহজে ভিনেগার ও ক্যালসিয়াম কার্বনেটের মিশ্রণ প্রয়োগের মাধ্যমে বিধবংসী বোমা নিষ্কৃয় করা যায়।দলের প্রধান জারিন তাসনিম জানান, পারমানবিক বোমার ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পেতে বোমা নিষ্কৃয় করার কোন বিকল্প নেই।এক কেজি পরিমানের বোমাকে নিষ্কৃয় করার জন্য ১৪৩.৫৯ গ্রাম ক্যালসিয়াম কার্বনেট ও দেড় চামুচ ভিনেগার ব্যবহার করে এ বোমা নিষ্কৃয় করা যায়।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/আরকে

উপরে