আপডেট : ৯ জানুয়ারী, ২০১৬ ১৭:১৮

হাসিবের ড্রোন হবে মানুষের বন্ধু

জামিল মাহমুদ
হাসিবের ড্রোন হবে মানুষের বন্ধু

ড্রোন নামটির সঙ্গে এখন সবাই পরিচিত। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো এ ড্রোন দিয়েই করছে বিশ্বকে শাসন। মানববিহীন এই উড়ন্ত যান বর্তমানে বিধ্বংসী কাজেই বেশি ব্যাবহৃত হয়। তবে নানারকম গঠনমূলক কাজেও এটি অদূর ভবিষ্যতে ব্যাবহৃত হবে তা হলফ করেই বলে দেয়া যায়।

মজার ব্যাপার হলো, ড্রোন বানানোর প্রযুক্তি নিয়ে সারা বিশ্বই মেতেছে। মেতেছেন বাংলাদেশের ড্যফোডিল ইউনিভার্সিটির ছাত্র হাসিব মাহমুদও। ক্যাম্পাস ও নিজ অর্থায়নে ইতোমধ্যেই তিনটি কপ্টার ড্রোন বানিয়ে ফেলেছেন তিনি। অনুসন্ধানী জামিল মাহমুদ’র লেখা থেকে আসুন জানি, কি করে তিনি এই অসম্ভবকে করলেন সম্ভব!

গুটি পায়ে স্বপ্নের পথচলা

ছোটবেলা থেকেই বিমান তাকে টানে। ২০০৭ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর খেলনা হেলিকপ্টার বানানোর চেষ্টায় লেগে যন তিনি। এজন্য পুরনো একটি পানি তোলার মোটর সংগ্রহ করেন তিনি। বাতিল প্লাস্টিকের টুকরো কেটে বানালেন পাখা। আকাশযানের শরীরটা বানালেন কাগজ আর পোস্টার মুড়িয়ে। তারপর মোটরের সঙ্গে তারের মাধ্যমে পাখার সংযোগ ঘটালেন। বৈদ্যুতিক তার টেনে ব্যাটারিতে সংযোগ দেওয়া হলো। নিজেই অবাক হয়ে গেলেন, সুইচ অন করতেই পাখা ঘুরছে! তারপর থেকে নেশা বহু গুণে বেড়ে গেল। নিয়মিত নাসার ওয়েবসাইট ঘাঁটেন। ইউটিউবে ড্রোন তৈরির ভিডিও দেখেন। এভাবেই স্বশিক্ষিত হতে লাগলেন হাসিব মাহমুদ।

২০১০ সালে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগে ভর্তি হন হাসিব। শখের বসে ক্যামেরা কিনেছেন, ছবি তুলে বেড়ান। এক বিকেলে ক্যামেরা কাঁধে চলে গেলেন রাজধানীর আফতাবনগরে। সেখানে অবিশ্বাস্য এক দৃশ্য দেখে চমকে গেলেন। দুটি লোক রিমোট কন্ট্রোলে প্লেন ওড়াচ্ছেন। নিজে থেকেই আলাপ করলেন। একজন জোবায়ের হাদি, অন্যজন আরিফ খান। পরের কয়েকটি মাসে তাদের কাছে শিখলেন কিভাবে বিমানের ডিজাইন করা হয়, কিভাবে আলাদা অংশগুলো জোড়া লাগাতে হয় ও বিমানকে আকাশে ওড়ানোর কায়দা-কানুন। পরিকল্পনা-প্রস্তুতি শেষে সিদ্ধান্ত নিলেন, নিজেই ড্রোন বানাবেন।

তবে শুরুতে নানা সমস্যার মুখোমুখি হলেন তিনি। অনেক খুঁজেও পার্টস পাচ্ছেন না, ডিজাইন তৈরি হচ্ছে না বা উড়ন্ত বিমান নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। জোবায়ের, হাদি ভাইয়ের পরামর্শে চীন আর হংকং থেকে অনলাইনে ভিএলডিসি মোটর, পাখা, সার্ভোমোটর, ইএসসি, স্পিড কন্ট্রোলার, রেডিও কন্ট্রোলার কিনলেন। দেশ থেকেও কিছু কিনলেন। ২০১১ সালে চার-পাঁচ মাসের মধ্যে রিমোটের মাধ্যম আকাশে ওড়ার সময় ও গতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়-এমন একটি ফাইটার প্লেন বানিয়ে ফেললেন। এরপর বানালেন সেসনা, আরসি ফ্লোট, স্পোর্টস এয়ার, ট্রেইনার এয়ার প্লেন।

এরমধ্যেই হাসিবের বিমান বানানোর কাহিনী অনেকেরই জানা হয়ে গেছে। ২০১৩ সালের আগস্টে তার বিভাগের চতুর্থ বর্ষপূতি অনুষ্ঠানে বন্ধুরা তার বিমানগুলো দেখার বায়না ধরে। একে একে হাসিব মূল মিলনায়তনে ওড়ালেন বিমান। সেদিনই সারা ক্যাম্পাস ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানতে পারল, তাদের এখানে এমন এক ছাত্র পড়েন, যার ড্রোন বা রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে পরিচালিত চালকবিহীন বিমান তৈরির নেশা আছে।

কোয়ার্ড কপ্টার বা চার পাখার ড্রোন

মাসখানেক পরে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তা সৈয়দ রায়হানুল ইসলাম তাকে নিয়ে গেলেন বিশ্ববিদ্যালয় বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ও ড্যাফোডিল গ্রুপের প্রধান সবুর খানের কাছে। সবুর খান সেদিন প্রিয় ছাত্রকে বলছিলেন, 'যুগোপযোগী তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য আমি তোমাদের সব সময় উদ্বুদ্ধ করি এবং এসবের জন্য যেকোনো ধরনের সাহায্য করতে আমি প্রস্তুত।' পরে প্রশাসন বিভাগের পরিচালক ইমরান হুসেইন হাসিবকে ডেকে বললেন, দেখ তো আমরা এমন কিছু বানাতে পারি কি না, যেটি উড়ন্ত অবস্থায়ও স্থির থাকবে এবং তাতে ভিডিওগ্রাফির সুবিধা থাকবে। হাসিব বললেন, হ্যাঁ পারব।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া ৬০ হাজার টাকা খরচে 'ড্যাফোডিল হেলিক্যাম' নামের প্রজেক্টের মাধ্যমে কোয়ার্ড কপ্টারের কাজ শুরু হলো। এসময় তার সহকারী ছিলেন ইইই ইভিনিং সপ্তম সেমিস্টারের নাহিদ ফেরদৌস। কোয়ার্ড কপ্টার তৈরি করতে তিন মাস লাগে। চারটি পাখায় চারটি মোটর ও পাখা আছে। এক থেকে দেড় কেজি ওজনের বিমানটি ১২ থেকে ১৫ মিনিট উড়তে পারে। ঘণ্টায় গতি ২৫-৩৫ কিলোমিটার। রিমোট নিয়ন্ত্রিত বিমানটিকে রাতে চালানোর জন্য নাইট ইন্ডিকেটরও আছে। গেল বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১তম জন্মদিনে বিমানটি প্রদর্শন করা হয়।

ট্রাইকপ্টার বা তিন পাখার কপ্টার ড্রোন

একের পর এক বিমান বানালেও হাসিবের ভিডিওগ্রাফির নেশা কিন্তু মরেনি। নিজের পকেট থেকেই ২৫ হাজার টাকা খরচ করে ভিডিওগ্রাফির জন্য তিন পাখার ট্রাকপ্টার ড্রোন বানালেন। তিনটি পাখায় আছে তিনটি ভিএলডিসি মোটর। প্রতিটি মোটর আলাদা স্পিড কন্ট্রোলারের মাধ্যমে চলে। নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজনে মোটর ঘোরানোর জন্য কন্ট্রোলিং বোর্ড আছে। হাসিবের এই ট্রাইকপ্টার আট থেকে ১০ মিনিট উড়তে পারে। সামনের দিকে মিনি ক্যামেরা আছে। সেটি ভিডিও করে এবং সেটা সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে। রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে পরিচালিত এই বিমান ৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজন বহন করতে পারে। উড়ন্ত অবস্থায়ও ভিডিও আউটপুট পাওয়া যায়।

অক্টোকপ্টার বা আট পাখার কপ্টার ড্রোন

'ড্যাফোডিল হেলিক্যাম' প্রজেক্টের মাধ্যমে এরপর হাসিব 'অক্টোকপ্টার' নামে একটি কপ্টার ড্রোন বানালেন। শক্তিশালী এই অক্টোকপ্টারে আছে আটটি মোটর, আটটি পাখা। সঙ্গে জিপিএসও আছে। ২০ থেকে ২৫ মিনিট উড়তে পারে, দুই থেকে আড়াই কেজি ওজন বইতে পারে। এই ড্রোনটি ওড়াতে তিনি হালকা ও অনেকক্ষণ চার্জ থাকে এমন লিথিয়াম পলিমার ব্যাটারি ব্যবহার করেন। হালকা ও উড়ন্ত অবস্থায়ও ভিডিও সম্প্রচার করতে পারে এমন এসজে ৪০০০ নামের ড্রোন ক্যামেরা সংযুক্ত করলেন। অটোকপ্টার বানাতে প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে।

সাফল্যের পুরস্কার

ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে ২০১৪ সালের ৩০ জুন 'ফার্স্ট ন্যাশনাল হোভার এক্সিবিশন অ্যান্ড কম্পিটিশন'-এ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০টি দলের মধ্যে হাসিবের 'ড্যাফোডিল ড্রোন স্কোয়াড' প্রথম হয়। পরের বছরের ৬ মার্চ একই ক্যাম্পাসে অ্যারো ফেস্টে ২৫টি দলের মধ্যে দ্বিতীয় হয় ড্যাফোডিল ড্রোন স্কোয়াড। এ বছর ১১ জুলাই ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং ইনোভেশন সামিটে ৩২টি দলের মধ্যে দ্বিতীয় হয়। ভবিষ্যতে হাসিব দেশে কপ্টার ড্রোন তৈরির একটি প্রতিষ্ঠান দিতে চান, যাতে দেশি প্রযুক্তিতে আবিষ্কার করে অন্যান্য দেশে বিক্রি করা যায়।

হাসিবের কপ্টার ড্রোনগুলো চোরাচালান, মানবপাচারসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা নজরদারিতে খবর সংগ্রহ, অগ্নিকাণ্ডের সময় উঁচু ভবনে উড়ে গিয়ে সর্বশেষ পরিস্থিতি জানানো, সিনেমার ভিডিওগ্রাফিতে অনেকটা উঁচুতে উড়ে ভিডিওগ্রাফি করা, বন্যা বা দুর্যোগকবলিত বা দুর্গম এলাকায় খাদ্য, পণ্য ও ওষুধের মতো জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া ছাড়াও সেতু ভাঙনের চিত্র, ট্রাফিক ব্যবস্থা গবেষণায়ও ব্যবহার করা যাবে।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/পিএম

 

উপরে