আপডেট : ২০ নভেম্বর, ২০১৮ ২০:৫২

সুলতান মনসুরের ঘাটি তছনছ করতে চায় বিকল্পধারা

অনলাইন ডেস্ক
সুলতান মনসুরের ঘাটি তছনছ করতে চায় বিকল্পধারা

মৌলভীবাজার-২ আসনের ভোটারদের কথা ভাবুন। অবাধে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলেও তারা এবার মহা বিপদে পড়বেন। এতকাল যে মানুষটি তাদের কাছে ধানের শীষের প্রতিমূর্তি ছিলেন, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে সেই নেতা নৌকা প্রতীকে ভোট চাইবেন। আবার, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার প্রতিবাদে যে মানুষটি অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন, কিছুদিন আগেও যিনি ছিলেন সিলেট বিভাগে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, তিনি এবার ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ভোট চাইবেন। প্রথমজনের নাম যদি হয় এম এম শাহীন, তবে দ্বিতীয়জনের নাম হবে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর!

নির্বাচন দুয়ারে। মনোনয়ন নিশ্চিত করার আশায় সারা দেশে চলছে দল ও জোট বদলের মৌসুম। মৌসুমি এই পালাবদলে মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনের তিন সাবেক এমপিই দলবদল করেছেন। আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর গিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে। সাবেক এমপি ও বিএনপি নেতা এমএম শাহীন যোগ দিয়েছেন বি. চৌধুরীর বিকল্পধারায়। সেখানে গিয়ে রাতারাতি বিলল্পধারার প্রেসিডিয়াম মেম্বারও হয়ে গেছেন। অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের নেতা নওয়াব আলী আব্বাস খান হতাশ হয়ে ফিরে এসেছেন এরশাদের জাতীয় পার্টিতে।

সুলতান মনসুর, নওয়াব আব্বাস ও এমএম শাহীন- তিনজনই জাতীয় রাজনীতিতে কুলাউড়ার পরিচিত মুখ। ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মনসুরকে হারিয়ে মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনে এমপি হন জাপার নওয়াব আব্বাস আলী খান। পরের নির্বাচনে লাঙ্গলের এই প্রার্থীকে হারিয়ে এমপি হন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি নৌকার সুলতান মনসুর। আরও পরে, ২০০১ সালে জোট রক্ষার স্বার্থে আসনটি শরীক জামায়াতকে ছেড়ে দেয় বিএনপি। বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে বিজয়ী হন এমএম শাহীন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তাকে হারিয়ে ফের এমপি হন জাপা (এরশাদ)-এর প্রেসিডিয়াম সদস্য নওয়াব আব্বাস। দ্বিতীয় হন এমএম শাহীন। সেবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাননি সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ‘সংস্কারপন্থী’ বনে যাওয়া সুলতান মনসুর।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন বর্জন করেন তাদের তিনজনই। জাপার মনোনয়ন পেয়েও নির্বাচন করেননি নওয়াব আব্বাস। কাজী জাফরের নেতৃত্বে জাপার যে অংশটি নির্বাচন বর্জন করেছিল তাতে যোগ দেন তিনি। জাপার এ অংশটি পরে জাতীয় পার্টি (জাফর) নামে দল গঠন করে যোগ দেয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলে। আসন্ন নির্বাচনে মৌলভীবাজার-২ আসনে বিএনপি জোটের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন নওয়াব আব্বাস। ধানের শীষ চেয়েছিলেন এমএম শাহীন।

তবে সুলতান মনসুর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেওয়ায় সব হিসাব পাল্টে যায়। বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে ভোটে লড়বে ঐক্যফ্রন্ট। নৌকার টিকিটে তিনবার নির্বাচন করা সুলতান মনসুরের এবার ধানের শীষের টিকিট পাওয়া অনেকটাই নিশ্চিত। বিএনপি জোটের মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কায় ক্ষুব্ধ নওয়াব আব্বাস দ্রুত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাপায় ফেরেন। জাপার দলীয় মনোনয়ন ফরম কেনেন। লাঙ্গলের টিকিটে আসন্ন নির্বাচনে লড়তে চান। আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জোট থেকে ভোটে অংশ নেবে জাপা। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করা নওয়াব আব্বাস এবার আওয়ামী লীগের জোট থেকে মনোনয়ন চান।

ধানের শীষের টিকিট পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকায় এমএম শাহীন একই দিনে যোগ দেন ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারায়। বি. চৌধুরীর বারিধারার বাসায় গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেন। বিকল্পধারার জোট যুক্তফ্রন্ট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে যোগ দিচ্ছে। বিকল্পধারা মহাজোটে যোগ দিলে কিছু আসনে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করবে বলে জানিয়েছে। আসন্ন নির্বাচনে মৌলভীবাজার-২ আসনে নৌকার মাঝি হতে চান এক সময়ের বিএনপি নেতা এমএম শাহীন।

সুলতান মনসুর সিলেট-১ ও ঢাকা-৮ থেকেও নির্বাচনে লড়তে চান। আওয়ামী লীগের এই সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক গণমাধ্যমকে বলেন, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে তিনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিয়েছেন। তবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি থেকে কখনও বিচ্যুত হননি। সময়ই বলে দেবে কোথায় কোন প্রতীকে নির্বাচন করবেন।

এমএম শাহীনের আক্ষেপ, সারাজীবন বিএনপি করেও দলের মূল্যায়ন পাননি। ২০০১ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জয়ী হলেও পরের নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাননি। সেবার দ্বিতীয় হলেও এবারও তাকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এমন একজনকে জিয়াউর রহমানের ধানের শীষের টিকিট দেওয়া হচ্ছে, যিনি `জয় বাংলা` `জয় বঙ্গবন্ধু` বলে বক্তৃতা শেষ করেন। তবে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, এলাকার জনগণের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মনোনয়নের বিষয়টি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মন্তব্য করতে চান না।

এ ব্যাপারে নওয়াব আব্বাসের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জাতীয় পার্টির (জাফর) মহাসচিব মোস্তফা জামাল হায়দার জানিয়েছেন, তিনিও নওয়াব আব্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। জানা গেছে, মৌলভীবাজার-২ আসনে সুলতান মনসুরকে ঐক্যফ্রন্টের মনোনয়ন দেওয়া হবে- এ খবরে ক`দিন ধরেই মন খারাপ ছিল নওয়াব আব্বাসের। রাজনীতি ছেড়ে বিদেশে চলে যাওয়ার কথাও পরিচিতজনদের বলেছিলেন।

মোস্তফা জামাল হায়দার গণমাধ্যমকে বলেছেন, তারা এখনও জানেন না নওয়াব আব্বাস জাপার (এ) মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন কি-না। তাকে বহুবার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল মৌলভীবাজার-২ আসনে জোট থেকে তার মনোনয়ন নিশ্চিত। সুলতান মনসুর প্রয়োজনে মৌলভীবাজার-৩ আসন থেকে নির্বাচন করবেন।

তবে প্রাণের মার্কা `ধানের শীষ` প্রশ্নে দলীয় নেতাদের মিষ্টি কথায় ভুলতে রাজী নন ঝানু রাজনীতিক নওয়াব আব্বাস। আপাতত এরশাদের লাঙ্গলেই ভরসা রাখছেন তিনি।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে