আপডেট : ১৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০৯:৫০

মির্জা ফখরুল মূলত কার? কি চান তিনি?

অনলাইন ডেস্ক
মির্জা ফখরুল মূলত কার? কি চান তিনি?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান একটি রাজনৈতিক দল বিএনপি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে তিনবারের ক্ষমতাসীন দলটি। বিএনপির শীর্ষ নেতা বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে এবছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারান্তরীন। বিএনপির দ্বিতীয় প্রধান নেতা তারেক রহমান দশ বছরের বেশি সময় ধরে পলাতক অবস্থায় লন্ডনে অবস্থান করছেন। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই বিএনপির নেতৃত্বের কেন্দ্রে চলে এসেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বর্তমানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অতিতে বিএনপির তেমন কোনও আলোচিত নেতা ছিলেন না। এমনকি প্রধান নেতাও ছিলেন না। ২০০১ সালে যখন বিএনপি ক্ষমতায় আসে, তখন তিনি একজন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। ২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেনের সময় বিএনপির যখন থেকে সংকটের সূচনা হয়, সেই সময় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রথম পাদপ্রদীপে চলে আসেন। এরপর থেকে তিনি দিনে দিনে বিএনপির দীর্ঘদিনের পরিক্ষিত সিনিয়র নেতাদের টপকে দলের নেতৃত্বের কেন্দ্র বিন্দুতে চলে আসেন। বেগম খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর মির্জা ফখরুল হয়ে ওঠেন বিএনপির অন্যতম মূল ব্যাক্তি। যদিও দলের মধ্যে তাঁর অবস্থান খুব বেশি শক্ত নয়। দলের মধ্যে তিনি ততটা জনপ্রিয়ও নন। তিনি খালেদা জিয়া এবং তারেক জিয়ার বলয়ের মধ্যে থেকে বিএনপিতে শুধুমাত্র একজন ম্যানেজারের মর্যাদাই পান। তারপরেও বিএনপির সকল গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও নীতি নির্ধারণের কেন্দ্রে তিনি চলে এসেছেন বর্তমান সময়ে।

বিএনপির মধ্যেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে নানা ধরণের কানাঘুষা চালু আছে। বিএনপির অনেক নেতাকর্মী মনে করেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারের একজন এজেন্ট। বিএনপিকে দুর্বল করতে, বিএনপিকে নির্বাচনে নিয়ে গিয়ে সরকারের বৈধতা দেওয়ায় তাঁর যে এজেন্ডা, সেই এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্যে তিনি সরকারের পক্ষে কাজ করছেন বলেও বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতারা তাকে সন্দেহ করেন। তারপরেও ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন, ব্যরিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, মওদুদ আহমদের মত বিএনপির হেভি ওয়েট এবং প্রভাবশালী নেতাদের পিছনে ফেলে, তিনি বর্তমানে বিএনপির প্রকাশ্য নেতা। বিএনপির অনেক নেতাই চেয়েছিলেন, এবারের সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করতে, নির্বাচন বর্জন করে সরকারকে বিপদে ফেলতে। তবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আগ্রহ এবং উদ্যোগেই প্রথমে যুক্তফ্রন্ট, তারপর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যোগ দেয় বিএনপি এবং শেষ পর্যন্ত বিএনপি জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। তবে বিএনপির মধ্যে প্রশ্ন আছে, কার এজেণ্ডা বাস্তবায়নের জন্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপিকে নির্বাচনে নিয়ে যাচ্ছে? তিনি কি সরকারকে সুবিধা দেওয়ার জন্য, সরকারকে বৈধ্যতা দেওয়ার জন্য নির্বাচনে যাচ্ছেন, নাকি মির্জা ফখরুলের হাত ধরেই বিএনপির পুনর্জন্ম হবে? যদিও বিএনপির মধ্যে তাকে কেউ বিশ্বাস করে না। তারপরেও বিএনপি নেতারা স্বীকার করেন যে, বিএনপির ঐক্যের প্রতীক হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। 

বিএনপির অনেক নেতাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সন্দেহ করেন। তাকে সন্দেহ করার একাধিক কারণও রয়েছে, যেমন এক সময় সরকার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে বহু মামলা দিয়েছিল এবং তাকে গ্রেপ্তার করেছিল। দীর্ঘদিন তিনি কারাগারেও ছিলেন। পরবর্তীতে মির্জা ফখরুলের প্রতি সরকারের বদান্যতা চোখে পড়ার মতো। এরপর বিএনপির অনেক নেতা কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হলেও, তাঁর বিরুদ্ধে আর কোনও মামলা দেওয়া হয় নাই এবং তাঁর আগের মামলাগুলোর বিষয়েও ধীর নীতি গ্রহণ করা হয়। সরকারের অনেক মন্ত্রী এবং প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে মির্জা ফখরুলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের খবরও পাওয়া যায়। বর্তমানে সরকার তাঁর বিরুদ্ধে দমন নীতির পরিবর্তে তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং তাঁর সঙ্গে সরকারের সখ্য গড়ে ওঠার এই বিষয়টা বিএনপির অনেক নেতাই সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখেন।

অন্যদিকে সরকারের মধ্যেও বিএনপিকে নিয়ে নানা ধরণের সন্দেহ দানা বেধেছে। সরকারের অনেক প্রভাবশালী নেতাই মনে করেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যদি মহাসচিব না থাকতেন, ৮ ফেব্রুয়ারি বেগম জিয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি যদি বিএনপির মূল দায়িত্ব গ্রহণ না করতেন, তাহলে বিএনপি সহজেই এতদিনে ভেঙ্গে কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে পরতো। কারণ খালেদা জিয়া বিহীন বিএনপিতে নানা মত এবং পথের অনুসারী ছিলেন। বিএনপির অনেকে নেতারই নানা রকম অভিপ্রায় ছিল। বিএনপির এমন অবস্থায় মির্জা ফখরুল সকলের সঙ্গে মধ্যস্তকারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে এখন পর্যন্ত বিএনপিকে ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষা করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর এই উদ্যোগ ও প্রয়াসের ফলেই বিএনপি এখন পর্যন্ত ভাঙ্গেনি।

দ্বিতীয়ত সরকারের অনেকেই মনে করেছিলেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে বিএনপিতে ভাঙ্গন অনিবার্য হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বিএনপি এখনও ভাঙ্গেনই। বিএনপি না ভাঙ্গার ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে সরকারের অনেকে মনে করছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সরকারের অনেকেই পছন্দ না করলেও, তাঁর সঙ্গে কথা বলা এবং দরকষাকষি করা সহজ বলে মনে করেন এবং  রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে সহজ সমীকরণের মাধ্যমে সমাধান করতে চান এমন মন্তব্য সরকারের অনেক আওয়ামী লীগ নেতার। সেই কারণে আওয়ামী লীগ বিভিন্ন বিষয়ে দরকষাকষির জন্য তাঁর সঙ্গে কথা বলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সম্প্রতি সময়ে সংলাপের সময়েও দেখা যায় যে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অনেকটাই নমনীয় থেকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং বিএনপিকে নির্বাচনের মহাসড়কে নিয়ে যান। একারণে আওয়ামী লীগের মধ্যেও মির্জা ফখরুলকে নিয়া নানা সংশয় ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে। আওয়ামী লীগের কেউ কেউ মনে করেন মির্জা ফখরুল সরকারকে সহায়তা করছেন, এই জন্যেই তাঁর বিরুদ্ধে মামলাগুলোকে স্তিমিত করে রাখা হয়েছে। আবার আওয়ামী লীগের কেউ কেউ মনে করছেন, সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে, সরকারের সঙ্গে একধরনের সখ্যতার ভাব করে বিএনপিকেই শক্তিশালী করছেন তিনি এবং বিএনপিকে শক্তিশালী করে আগামী নির্বাচনে একটা চমক দেখানোর পরিকল্পনা নিয়েই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এগুচ্ছেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রকৃত ভূমিকা কি তা ভবিষ্যতই বলে দিবে। তবে বিএনপির ইতিহাস বলে, জিয়া পরিবারের বাইরে থেকে বিএনপিতে যারাই মুখ্য চরিত্রের ভূমিকায় আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টা করেছে, তাদেরই অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে পতন হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিএনপির সাবেক মহাসচিব কে. এম. ওবায়দুর রহমান এবং আব্দুল মান্নান ভুঁইয়ার কথা অনেকেই স্মরণ করেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বিএনপির লোকজন সরকারের এজেন্ট মনে করেন, অন্যদিকে আবার সরকারের লোকজন মনে করেন, বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে তাঁর ভূমিকাই প্রধান। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আসলে কার লোক? তা এখন পর্যন্ত রাজনীতির অঙ্গনে একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন। তবে এই অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি কি ভূমিকায় অবতীর্ণ হন তাঁর উপর। 

উপরে