আপডেট : ১৩ মার্চ, ২০১৬ ২০:৪৪

বিএনপির স্বীকৃতি পেতে ভূঁইফোড় সংগঠনগুলোর দৌড়ঝাঁপ

এম হাসান
বিএনপির স্বীকৃতি পেতে ভূঁইফোড় সংগঠনগুলোর দৌড়ঝাঁপ

বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে দলটির রাজনীতির ছায়ায় ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছিল ভূঁইফোড় সংগঠন। সংগঠনগুলো মুলত দলটির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও জাতীয়তাবাদের নাম ব্যবহার করে গড়ে উঠেছিল।এক পর্যায়ে এসব সংগঠনের সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে যায়। দলের বিভিন্ন ইস্যুতে সভা-সমাবেশ, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করে তারা।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক দল, সম্মিলিত সমন্বয় পরিষদ, জিয়া সেনা, স্বদেশ জাগরণ পরিষদ, দেশনেত্রী সাংস্কৃতিক পরিষদ, দেশপ্রেমিক ফোরাম, জিয়া স্মৃতি সংসদ, জিয়া নাগরিক ফোরাম, জিয়া আদর্শ একাডেমী, তৃণমূল দল, জিয়া পরিষদ, জিয়া ব্রিগেড, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সেবা দল, জাতীয়তাবাদী বন্ধুদল, খালেদা জিয়া মুক্তি পরিষদ, তারেক রহমান মুক্তি পরিষদ, তারেক রহমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তন সংগ্রাম পরিষদ, শহীদ জিয়াউর রহমান আদর্শ বাস্তবায়ন পরিষদ, জাতীয়তাবাদী কৃষি আন্দোলনসহ প্রায় শতাধিক সংগঠন রয়েছে। ২০০৬ সালে ক্ষমতা ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উধাও হয়ে যায় এসব সংগঠন। তবে কিছু সংগঠন রাজপথে সক্রিয় ছিল। আন্দোলন-সংগ্রামেও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে তারা। বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে ভূঁইফোড় সংগঠনগুলো। গত ১১ মার্চ রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মেধাবী অনলাইন এক্টিভিস্টদের সম্মাননা প্রদান উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ‘জিয়া সাইবার ফোর্স’ নামের একটি সংগঠন।

এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একইদিন সংগঠনের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে জিয়াউর রহমানের মাজারে ঘটা করে শ্রদ্ধা জানানোর অনুষ্ঠানের আয়োজন করে কর্মজীবী দল।

শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ১০ম কারাবন্দি দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করে ওই সংগঠনটি। ভূঁইফোড় ওই সংগঠনটির সভাপতি মো. লিটন বিডিটাইমস৩৬৫ডটকমকে জানান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রায় সব সদস্যের সঙ্গেই আমার ভাল সম্পর্ক রয়েছে। কর্মজীবী দলের অনুমোদনের জন্য বিভিন্ন জায়গায় প্রোফাইল জমা দিয়েছি। আশা করছি কাউন্সিলে বিএনপির অঙ্গসংগঠন হিসেবে কর্মজীবী দলকে অনুমোদন দেয়া হবে।

এদিকে জিয়া মঞ্চের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বিএনপির অর্থবিষয়ক সম্পাদক আবদুস সালাম। ওই সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মো. ফয়জুল্লাহ ইকবাল বিডিটাইমসকে বলেন, ‘আমাদের সংগঠনের ঢাকা মহানগরসহ বিভিন্ন জেলায়ও কমিটি রয়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে জিয়াউর রহমানের শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে নয়াপল্টনে পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের হুইল চেয়ার ও দুস্থ মহিলাদের সেলাই মেশিন দেয়া হয়েছে। এছাড়া আন্দোলন-সংগ্রামেও আমাদের সংগঠনের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। তাই বিএনপির অনুমোদনের জন্য কাউন্সিলের গঠনতন্ত্র সংশোধন উপ-কমিটির আহ্বায়ক তরিকুল ইসলামের কাছে জিয়া মঞ্চের প্রোফাইল জমা দিয়েছি।

বিএনপি চেয়ারপারসনের দপ্তরেও সংগঠনের আরেকটি প্রোফাইল ও সাংগঠনিক কর্মকান্ডের তথ্য-উপাত্ত জমা দিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম দলের সভাপতি শামা ওবায়েদ বিডিটাইমসকে বলেন, এটি ১৭ বছরের পুরনো সংগঠন। রাজধানীসহ ৩৫টি জেলায় কমিটি রয়েছে। এছাড়া ২০১০ সালে আমি দায়িত্ব নেয়ার পর জনস্বার্থমূলক সব ধরনের ইস্যুতেই কর্মসূচি পালন করে আসছি।

সীমান্ত হত্যা, ফেলানী হত্যা, শেয়ার মার্কেট লুট, গুম-খুন-ধর্ষণসহ সব ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছি। তাই অনুমোদনের জন্য গঠনতন্ত্র সংশোধন উপকমিটির কাছে একটি প্রস্তাব দিয়েছি। বিএনপির সহযোগী সংগঠন হিসেবে যদি কোন সময় অনুমোদন দেয়ার সিদ্ধান্ত হয় তাহলে আমার সংগঠনটি প্রথমদিকেই থাকবে আশা করছি।

বিএনপির অনুমোদনের জন্য গঠনতন্ত্র সংশোধন উপ-কমিটির কাছে প্রোফাইল জমা দিয়েছে জাতীয়তাবাদী তরুণ দল। সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য ও সাবেক কমিশনার মো. হারুণ আর রশিদ।

তিনি বলেন, ঢাকা মহানগরসহ সারা দেশে ৫৩টি জেলায় আমাদের কমিটি রয়েছে।  

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির অনুমোদনের জন্য একটি ভুঁইফোড় সংগঠনের এক নেতা প্রোফাইল জমা দিতে যান তরিকুল ইসলামের কাছে।

ওই নেতার উদ্দেশে তরিকুল ইসলাম বলেন, বিএনপির যে ১১টি অঙ্গসংগঠন রয়েছে আন্দোলন-সংগ্রামের সময় সেগুলোর খোঁজ থাকে না। আরও সংগঠনের অনুমোদন দিয়ে লাভ কি হবে।

এদিকে প্রচার ও প্রকাশনা উপকমিটির আহ্বায়ক ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় জানান, ওয়ান-ইলেভেনের সময় যখন রাজনীতির সুযোগ ছিল না তখন প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠান আয়োজন করে এসব সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এসব সংগঠন বিএনপির স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল নয়। তারা নিজস্ব গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চলবে।

২০১৩ সালে এসব ভুঁইফোড় সংগঠনের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ হয়ে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

তিনি বলেছিলেন, বিএনপির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন রয়েছে। এর বাইরে আর কোন সংগঠনের সঙ্গে বিএনপির কোন সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা নেই। দলীয় অনুমদিত ১১টি সংগঠন হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল, জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দল, জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস), জাতীয়তাবাদী কৃষক দল, জাতীয়তাবাদী মৎস্যজীবী দল, জাতীয়তাবাদী তাঁতী দল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ওলামা দল।

এ বিষয়ে জেড ফোর্সের সভাপতি ও জাসাস ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর শিকদার বিডিটাইমসকে বলেন, দলের মধ্যে কিছু লোক আছে যারা সুযোগ-সন্ধানী। তারা রাজনীতিতে আসে হালুয়া-রুটির ভাগের জন্য। ক্ষমতায় আসলেই তারা সক্রিয় হয়ে ওঠে। ক্ষমতা চলে গেছে তাদের দেখা যায় না। এটা বাংলাদেশের রাজনীতির একটা কালচার হয়ে গেছে।

জিয়া শিশু-কিশোর মেলার এই আহ্বায়ক বলেন, দলের কিছু নেতা এসব সংগঠনকে মদদ দেন। পরবর্তীতে তারা দল থেকে সুবিধা নেন। কিন্তু দলের প্রকৃত কর্মীরা কাউকে তোষামোদি করেন না। এ জন্য তাদের মূল্যায়ন করা হয় না।

এ বিষয়ে স্বাধীনতা ফোরাম সভাপতি আবু নাসের মো. রহমতুল্লাহ বিডিটাইমসকে বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে অনেক সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল যেগুলোর এখন আর অস্তিত্ব নেই। কারণ দলের মধ্যে অনেক সুবিধাবাদী নেতা থাকেন। তারা দল থেকে সুবিধা নেয়ার জন্য ক্ষমতায় ছায়ায় এসব ভুঁইফোড় সংগঠন করেন। এসব ভুঁইফোড় সংগঠন করে অনেকে মন্ত্রীও হয়েছেন। তবে দলের দুঃসময় এলে সুযোগ বুঝে তারা কেটে পড়েন। জাতীয় পার্টি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেয়া এই নেতা বলেন, জাতীয় রাজনীতিতে এসব সংগঠন ভূমিকা না রাখলেও জনমত তৈরিতে তারা ভূমিকা পালন করেন।

উল্লেখ্য, দীর্ঘ নয় বছর পর আগামী ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সবশেষ ২০০৯ সালেল ৮ ডিসেম্বর বিএনপির কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/আরকে 

উপরে