আপডেট : ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ২০:৫৯

ছাত্রদলের ‘খুশি’ কমিটি

এম হাসান, নিজস্ব প্রতিবেদক
ছাত্রদলের ‘খুশি’ কমিটি
বিদ্রোহের আশঙ্কা থেকে  সংগঠনের গঠণতন্ত্রের বাইরে গিয়ে ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এতে সমালোচনার ঝড় বইছে সংগঠনের ভিতরে ও বাইরে। এ কমিটিকে ‘খুশি’ কমিটি বলেও দাবি করছেন কেউ কেউ।
সংগঠনের নেতার্কমীদের দাবি, ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে কেউ বিরাগবাজন হতে চান না। যেকারণে সবাইকে খুশি রাখতে ছাত্রদলে অতীত ঐতিহ্য বির্সজন দিয়ে ৭৩৬ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি অনেুমোদন দেওয়া হয়েছে। যেখানে স্থান পেয়েছে অছাত্র, বুড়ো, বিবাহিত, ধর্ষণ মামলার আসামী, চাকুরীজীবীরা। এমনকি ছাত্রদল কমিটিতে মানা হয়েনি জ্যেষ্ঠতাও।
২০১৪ সালে ১৪ অক্টোবর রাজিব আহসানকে সভাপতি ও মো. আকরামুল হাসানকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের ২০১ সদস্যের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করে বিদ্রোহের মুথে পড়েন দায়িত্বপ্রাপ্তরা। এবার বিদ্রোহের আশঙ্কা থেকে সবাইকে কমিটিতে রেখে গতকাল (শনিবার) রাতে ৭৩৬ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।
তালিকা থেকে দেখা যায়,  এ কমিটির একজনও নিয়মিত ছাত্র নন এবং এর মধ্যে অধিকাংশ নেতাই আবার বিবাহিত। কমিটি গঠনে মানা হয়নি ছাত্রদলের খসড়া গঠনতন্ত্রও। ১২ জন সহ-সভাপতি ও দুইজন যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক থাকার কথা। অথচ  এ কমিটিতে সহ-সভাপতি করা হয়েছে নতুন পুরাতন মিলে ৬৯ জনকে। তাদের মধ্যে অধিকাংশই বিবাহিত। অনেকেই আবার ছাত্রত্বও নেই। আর যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে নতুন পুরাতন মিলে ৬৭ জনকে। এর মধ্যেও অধিকাংশ বিবাহিত।
ছাত্রদলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সহ-সাধারণ সম্পাদকের পদ পাঁচটি। সেখানে  এ কমিটিতে করা হয়েছে মোট নতুন পুরাতন মিলে ৫৪ জনকে। যার মধ্যে অনেকেই বিবাহিত। সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক পদেও একই অবস্থা।
খসড়া গঠনতন্ত্রের ১৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সিনিয়র সহ-সভাপতি, সহ-সভাপতি ১২ জন (কেন্দ্র থেকে ছয় জন, বিভাগীয় ছয় জন), সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সম্পাদক দুইজন, সহ-সাধারণ সম্পাদক পাঁচ জন, সাংগঠনিক, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ছয় জন, প্রচার সম্পাদক, সহ-প্রচার সম্পাদক, দফতর সম্পাদক, সহ-দফতর সম্পাদক ৫৬ জন ও ৯৫ জন সদস্যসহ ১৫১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি থাকবে। কিন্তু দেখা যায় বর্তমানে ৭৩৬ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।
সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীরাই কেবল জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সদস্য হতে পারবেন। কিন্তু নতুন কমিটির একজনও নিয়মিত ছাত্র নন।
ছাত্রদলের গঠনতন্ত্রের ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদে আছে, জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি গঠন করা হবে। অথচ সম্মেলন ছাড়াই প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।
এর আগে ২০১২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আব্দুল কাদের ভূইয়া জুয়েল-হাবীবুর রশিদ হাবীবের কমিটির আকার  ছিল ২৯১ সদস্য বিশিষ্ট।
খসড়া গঠনতন্ত্রের ১৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল’ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের অঙ্গ সংগঠন।

কাজেই ছাত্রদল মূল দলের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করবে। চেয়ারপারসন বিশেষ কোনো প্রয়োজনে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি বাতিল কিংবা কেন্দ্রীয় কার্যক্রম স্থগিত করে নতুন পূর্ণাঙ্গ/আহ্বায়ক কমিটি গঠন করতে পারবেন। তিনি যে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন। চেয়ারপারসন ছাত্রদলের সংবিধানের যে কোনো অনুচ্ছেদ, ধারা-উপধারা স্থগিত, সংযোজন, বিয়োজন এবং প্রয়োজনে সংবিধান বাতিল করতে পারবেন।

বিএনপি চেয়াপারসনের উপদেষ্টা সাবেক ছাত্রনেতা শামসুজ্জামান দুদু বিডিটাইমসকে বলেন, ‘ত্যাগী অনেক নেতা কর্মীকে সুযোগ করে দিতে এত বড় কমিটি করা হয়েছে। সাফল্য কিংবা ব্যার্থতার কথা এখনই বলা যাবে না। দলের জন্য কে কেমন কাজ করেন তা দেখেই সাফল্য নির্ধারণ হবে।’

বিগত কমিটির পদবঞ্চিত বর্তমান কমিটির সহ সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রয়েল রবিবার তার ফেসবুক স্ট্যাস্টাসে লিখেছেন ‘সংগঠন মনে হয় সার্কাসে পরিনত হইসে,, চলিতেসে সার্কাস,,, কেউ খালি হাতে যাবেন না,,, তবে মানোত করতে হবে,,,, আশা করি সামনের কমিটি যেন ১০০১ হয়।’
ছাত্রদল বর্তমান কমিটির যুগ্ম সম্পাদক বায়েজিত আরেফিন  ক্ষোভ প্রকাশ করে বিডিটাইমস ৩৬৫ডটকমকে বলেন, ‘ সবাইকে খুশি রাখতেই এত বড় কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যারা ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদন করিয়েছে তাদের নিজেদের স্যান্ডার্ড নেই, তারা ছাত্রদলের স্যান্ডার্ড বুঝবে কিভাবে? সিন্ডিকেট কমিটি দিয়ে ছাত্রসংগঠনের মর্যাদা ক্ষুন্ন করছে।’
তিনি বলেন, ‘এখন মাছের বাজার, মুরগির দোকানে গেলেও ছাত্রদল নেতা পাওয়া যাবে। যা হয়েছে অনেক এখন আর থেকে আর নিজেকে ছাত্র নেতা বলে পরিচয় দিয়ে ঘৃণা লাগবে।’
ছাত্রদল দফতর সম্পাদক মো. আবদুস সাত্তার পাটোয়ারি বিডিটাইমসকে বলেন, ‘আগের ১৫৩ জনের সঙ্গে ৫৮৩ জনকে নতুন করে ছাত্রদলে আনা হয়েছে। এটা ছাত্রদলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কমিটি।’
এছাড়া ছাত্রদলের বেশ কয়েক জন সহ সভাপতির সঙ্গে কথা হয়। তাদের দাবি, বড় কমিটি দিয়ে আন্দোলন সংগ্রামে কোনো লাভ হবে না। ১৫৩ জনের মধ্যে বিগত দিয়ে কয় জন মাঠে ছিল তা দেখা দরকার। তাছাড়া অনেক ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে দোকানী, ধর্ষক, চাকুরীজীবী, অকেনকে জোরে করে কমিটিতে রাখা হয়েছে। এদের দিয়ে কমিটি বড় করা যায়, আন্দোলনে মাঠে পাওয়া যাবে না। যা ভবিষ্যতে প্রমান পাওয়া যাবে।
ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম রোববার সকালে সামাজিক যোগাযোগের জনপ্রিয় মাধ্যম ফেসবুকের এক স্ট্যাটাসে লিখেন ‘দেশের ছাত্র রাজনীতি ও শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংসের জন্য খালেদা জিয়া ছাত্রদলের এ কমিটি করেছেন। স্ট্যাটাসে অসম্পূর্ণ বাক্যে নাজমুল আলম লেখেন, 'চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারী, মাদকসেবী, হত্যা মামলার আসামী, বোমাবাজ, ধর্ষণ মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামীদের এক চমকপ্রদ কমিটি তথাকথিত ছাত্রদলকে ৭৬৩ জনকে দায়িত্ব দিয়েছে খালেদা জিয়া দেশের ছাত্র রাজনীতি ও শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংসের জন্য।'
উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/এমএইচ

উপরে