আপডেট : ২১ মে, ২০১৯ ০৯:২১

বেহুলা-লক্ষ্মীন্দরকে হার মানানো সেই রোমানা-রাজীবের মিলনের সমাপ্তি!

অনলাইন ডেস্ক
বেহুলা-লক্ষ্মীন্দরকে হার মানানো সেই  রোমানা-রাজীবের মিলনের সমাপ্তি!

আনোয়ার হোসেন রাজীব, লৌহজং পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০০২ সালে এসএসসি পাস, ২০০৪ সালে লৌহজং মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি পাস করে। ২০০৮ সালে ঢাকা কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে থেকে অনার্স আর ২০০৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এমএ শেষ করেছেন।

মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার বেজগাঁও ইউনিয়নের সুন্দিসার গ্রামে তার বাড়ি। রাজীব পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালে সিনিয়র অফিসার হিসেবে চাকরি করতেন। তিনিই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী।

এদিকে ২৯ বছরের রাজীবের জীবনে হঠাৎ নেমে এলো অন্ধকার। জানলেন দুটি কিডনিই নষ্ট। কিডনি দেওয়ার মতো কেউ নেই, কেনার সুযোগ-সামর্থ্যও নেই। বড় অসময়ে সুন্দর পৃথিবী তাঁকে ছাড়তে হবে—এক নিদারুণ কষ্ট তাঁর। এই কষ্ট পোড়াচ্ছে মা-বাবাকেও। ঠিক তখনই আশার আলো হয়ে এলেন রোমানা নামের এক তরুণী। নিজের আত্মীয়স্বজন যা করে না, তার থেকে বেশি করে বিরল নজির সৃষ্টি করলেন এই মেয়ে। যা যেন এ যুগের বেহুলা লক্ষ্মীন্দরের গল্পকেও হার মানায়। মানবতার এক শ্রেষ্ঠ অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

জানা যায়, রাজীব দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। রাজীবের পরিবার-পরিজন বন্ধুবান্ধব যার যার সাধ্যমতো আর্থিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ইতিমধ্যে রাজীবের দুটি কিডনিই ডেমেজ হয়ে গেছে। ওকে বাঁচতে হলে অন্তত একটি কিডনি লাগবে। কোথায় পাবে রাজীব এই অমূল্য সম্পদ? কারণ কিডনি পরিবর্তন করতে হলে অনেক কিছুই ম্যাচ করতে হবে। আবার যার তার কাছ থেকে কিডনি নেয়াও যাবে না। তারপর আবার আত্মীয়স্বজন বা রক্তের সম্পর্কের কেউ ছাড়া কিডনি দান করতে আইনি বাধা রয়েছে।

যখন কোথাও কোনো কিডনি পাওয়া যাচ্ছে না, রাজীবের বেঁচে থাকার স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে। বড় অসময়ে যখন এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে রাজিবের। সেই সময়ে ফেসবুকের কল্যাণে রাজীবের সঙ্গে পরিচয় হয় রোমানা তাসমিনের। ফেসবুকেই জানতে পারেন, কিডনি রোগী রাজীবের বাঁচার আশা প্রায় শেষ। জানতে পারেন রাজীবের রক্তের গ্রুপ। নিজের কিডনি রাজীবের সঙ্গে ম্যাচ করবে, ভাবতে শুরু করেন রোমানা। নিজেকে প্রশ্ন করেন, অপরের জীবন রক্ষার সুযোগই বা কয়জনের হয়? এই প্রশ্ন তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। একপর্যায়ে তিনি নিজের মাঝে রাজীবকে আবিষ্কার করেন। সিদ্ধান্ত নেন, প্রয়োজন হলে তিনি রাজীবকে বিয়ে করতে চান, তবু মানুষটি বেঁচে যাক।

রোমানার মুখে এ কথা শুনে রাজীব পুনরায় বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন। রাজীবের কাছে যেন এক অকল্পনীয় ব্যাপার। মহৎ হৃদয়ের তরুণী এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের জীবনকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছেন তো? এই প্রশ্নও রোমানাকে করলেন রাজীব। শেষ পর্যন্ত জয়ী হয় মানবতা।

রোমানা পেশায় একজন প্যারামেডিক। কেরানীগঞ্জের সাজেদা হাসপাতালে তিনি বর্তমানে কর্মরত। তার সামান্য আয়ে রাজীবের চিকিৎসা চলছে। রাজীব স্ত্রী পেয়েছেন, কিডনি পাচ্ছেন। কিন্তু এত কিছুর পরও থমকে আছে রাজীবের কিডনি প্রতিস্থাপন। অর্থাভাবে রাজীবের কিডনি প্রতিস্থাপন করা যাচ্ছে না। এখন শুধু প্রয়োজন অর্থ, যা সবার সহযোগিতা ছাড়া সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। রাজীবের কিডনি প্রতিস্থাপন করতে প্রয়োজন প্রায় ৩ লাখ টাকা। কিন্তু এর আগেই কিডনি চিকিৎসায় দেশে-বিদেশে অনেক টাকা খরচ করে ফেলায় রাজীবের পরিবারের পক্ষে এই টাকা জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে রাজীবের চিকিৎসার জন্য এগিয়ে আসতে সমাজের বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন রাজীবের ফেসবুক বন্ধুরা।

এরপর মুন্সীগঞ্জ-২ (লৌহজং-টঙ্গিবাড়ী) আসনের তৎকালীন এমপি অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, দেশের খ্যাতিমান ব্যক্তি, সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে আসেন। হাত বাড়িয়ে দেন সাহায্যের। প্রয়োজনীয় টাকা জোগাড় করে রাজীবকে নিয়ে ২০১৭ সালের ৭ আগস্ট ভারত যান রোমানা। তবে কিছু শারীরিক জটিলতার কারণে রাজীবের শরীরে কিডনি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। সেখানে দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষ দেশে ফিরে আসেন রাজীব-রোমানা।

দেশে ফিরে চিকিৎসকদের পরামর্শে চলে রাজীবের চিকিৎসা। ডায়ালাইসিসের পাশাপাশি নিয়মিত চিকিৎসায় পূর্বে দেখা দেয়া শারীরিক নানা জটিলতা থেকে কেটে ওঠেন রাজীব। এরপর আবারও ভারতে কিডনি প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করতে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন রোমানা তাসমিন। তবে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় না হওয়ায় ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়মিত ডায়ালাইসিস করে জীবন যুদ্ধে টিকে ছিলেন রাজীব। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। সোমবার (২০ মে) ভোর ৫টার দিকে রাজধানীর ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থান শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রাজীব (৩১) (ইন্নালিল্লাহি ওয়া লিল্লাহি রাজিউন)।

এর আগে শারীরিক অবস্থা অবনতি হলে শুক্রবার (১৭ মে) তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শনিবার (১৮ মে) রোমানার সাথে কথা হলে জানান, পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে রাজীবের শরীরে হেপাটাইসিস-সি ভাইরাস ও নিউমোনিয়া ধরা পড়েছে। বর্তমানে ও হাসপাতালেই ভর্তি রয়েছে।

টানা তিনদিন চিকিৎসা চলার পর রবিবার (১৯ মে) দিনগত রাতে অবস্থা আরও খারাপ হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানেই সোমবার (২০ মে) ভোর ৫টার দিকে মারা যান রাজীব। থেমে যায় মানবিক প্রেমিকা রোমানা তাসমিনের যুদ্ধ।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে