আপডেট : ১৪ আগস্ট, ২০১৭ ২১:৪৪

ছাত্রদলের এক কমিটি ১৪ বছর চালাচ্ছে গাজীপুর

অনলাইন ডেস্ক
ছাত্রদলের এক কমিটি ১৪ বছর চালাচ্ছে গাজীপুর

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ৩৮ বছর আগে ১৯৭৯ সালের পহেলা জানুয়ারি আত্মপ্রকাশ করে। বিএনপির সহযোগী সংগঠন হিসেবে এ ছাত্রসংগঠনটি ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। ডাকসুর ভিপিসহ দেশের ছাত্র সংগঠনে নেতৃত্বদানকারী এ সংগঠনটি এখন প্রায় নিষ্ক্রিয়। গতিশীল নেতৃত্ব ও ছাত্রদের হাতে নেতৃত্বে না থাকার কারণে এ সংগঠনটি রাজপথে পুরনো ভূমিকায় নামতে পারছেন না। 

গাজীপুর জেলা ছাত্রদলের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ২০০৩ সালের ১২ জুলাই। সোমবার (১৪ আগস্ট) যার ১৪ বছর একমাস দুইদিন পূর্ণ হলো। দ্বিবার্ষিক ওই সম্মেলনে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি নির্বাচিত হন মো. শরাফত হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক হান্নান মিয়া হান্নু। সাবেক জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ২০০৩ সালে নির্বাচিত সভাপতি মো. শরাফত হোসেন ওই সময় ঢাকা ল’কলেজের ছাত্র ছিলেন বলে কমিটি অনুমোদনপত্রে উল্লেখ রয়েছে। দলের একাধিক নেতাকর্মী জানান, তখনই তার বয়স ছিল চল্লিশের কোঠায়। সরাফত হোসেন বর্তমানে গাজীপুর জেলা বিএনপি’র ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক এবং টঙ্গী এলাকার প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। প্রায় বিশ বছর ধরে তিনি টঙ্গীতে ক্যাবল টিভি নেটওয়ার্ক (ডিশ), হাউজিসহ নানা ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত।

একই অবস্থা হান্নুরও। দলীয় ব্যানারে হান্নান মিয়া হান্নু ২০১৩ সালের ৬ জুলাই গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ২৬ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। একই সাথে তিনি গাজীপুর পৌর বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। এদের বাইরেও কমিটির অনেকেই ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও প্রবাসে পাড়ি দিয়েছেন। ফলে দলীয় কর্মসূচিতে ছাত্রদল বরাবরই ব্যর্থ। অথচ সেই কমিটি দিয়েই চলছে জেলা-উপজেলা ছাত্রদল। অছাত্রদের হাতে ছাত্রদলের রাজনীতি থাকায় নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন কয়েকটি ভাগে। দলীয় নানা কর্মসূচি পালনে তাই কমিটি ব্যর্থ হচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন পাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা। এই সময়ের মধ্যে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের ৪টি কমিটি গঠন করা হলেও গাজীপুরে সেই এক কমিটিই জোড়াতালি দিয়ে চালাচ্ছে দল। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রায় দেড় যুগের সন্নিকটে থাকা এই কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ৮১ সদস্যের সবারই ছাত্রজীবন শেষ হয়েছে বহু আগে। নামধারী এই ছাত্রনেতারা প্রভাব খাটিয়ে এখন নিজেদের আখের গোছাতে বেশি ব্যস্ত। বেশিরভাগ নেতার চুল-দাঁড়িতে পাক ধরেছে অনেক আগেই। ইতোমধ্যে অভিভাবকের স্থানটিও দখল করে নিয়েছেন এরা। সেই সাথে যুবদলে রাজনীতির সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন তারা। অনেকের বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। কারও কারও সন্তানের স্কুল, কলেজ পাড়ি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখার সময় হয়েছে। আবার কেউ সংসার নিয়ে ব্যস্ত, কেউবা ব্যবসায়ী অথচ দিব্যি তারা এখনও জেলা ছাত্রদলের নেতা। বুড়ো এই ছাত্র নেতাদের কারণে অনেক ছাত্রনেতার স্বপ্ন আজ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। যেন তাদের জন্য থেমে রয়েছে ঘড়ির কাটাটাও। এমন অমর ছাত্রদের নিদ্রা যেনো দিন দিন আরো গভীর হচ্ছে। তবুও জেলা ছাত্রদলের নেতা পরিচয়ে ব্যানার, ফেস্টুন করে সুযোগ বুঝে যেখানে সেখানে টানিয়ে নিজেদের পরিচয় জাহির করছেন তারা। এছাড়া রাজপথে না থেকে স্যোশাল মিডিয়ায়তে এরা প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।

গাজীপুর জেলা ছাত্রদলের কমিটি না হওয়ার কারণে মহানগর, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন, কলেজ ও ওয়ার্ড শাখার কমিটি হচ্ছে না। ফলে ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্বও সৃষ্টি হচ্ছে না। তরুণ, মেধাবী অনেকেই দলে মূল্যায়ন না পেয়ে বিদায় নিয়েছেন এক সময়কার সবচেয়ে বড় এই সংগঠনটি থেকে। এছাড়া গাজীপুর জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠন না হওয়ার কারণ হিসেবে পাওয়া গেছে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। এদিকে পদ বঞ্চিত দলের ত্যাগী তরুণ নেতারা নতুন কমিটি গঠনের চেষ্টায় একাধিকবার ব্যর্থ হয়েছে। ‘বুড়ো’ পদধারী ছাত্রদল নেতারা কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রভাবিত করে কমিটি গঠন বারবার পেছাচ্ছেন। এভাবে পুরনো এই কমিটি দিয়েই চলছে গাজীপুর জেলা ছাত্রদলের সংকটময় সংসার।

অভিযোগ রয়েছে, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের গাজীপুর জেলা শাখার মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। কেন্দ্রীয় নেতারাসহ সর্ব পর্যায়ে কেউ কারো নিয়ন্ত্রণে নেই। সম্প্রতি সংগঠনটির একাধিক দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। দলটির নেতারা মনে করেন মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দায়িত্ব পাওয়ার পর পুরো মেয়াদে সাংগঠনিক কার্যক্রম ছিল সুপার ফ্লপে। কোথাও কোনো সংগঠনের কার্যক্রমকে গতিশীল করতে পারেনি। একইভাবে সরকারবিরোধী সব আন্দোলনেও শক্তি অর্জনে ব্যর্থ হতে দেখা গেছে কমিটির দায়িত্বশীল নেতাদের। জেলা ছাত্রদলের পরিচয়ে ফেস্টুন টানিয়ে নিজেদের প্রচার করলেও এসব নেতার অনেকেই রাজপথে নেই। আন্দোলন আসলেই সিঙ্গাপুর, মালেশিয়ায় ভ্রমণে চলে যান শরাফত ও হান্নুরা। ২০১৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর গাজীপুরের চান্দনায় ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ মাঠে খালেদা জিয়ার জনসভা হওয়ার কথা ছিল। ছাত্রলীগের বাধার কারণে পরে হয়নি। অভিযোগ রয়েছে ২৫ ডিসেম্বর সভার দুইদিন আগে আওয়ামী লীগের সাথে আতাঁত করে মালেশিয়ার ভ্রমণে যান গাজীপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী ছায়েদুল আলম বাবুল ও হান্নান মিয়া হান্নু।

অপরদিকে অনেকের নামে নাশকতার মামলা থাকায় রয়েছেন আত্মগোপনে। এছাড়া সংগঠনটির দায়িত্বশীল অনেকে পুলিশি হামলা, গ্রেফতার ও ক্রসফায়ারের শঙ্কাকে বেশি গুরুত্ব দিতে গিয়ে বর্তমান মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির কার্যক্রম একবারেই লেজে গোবরে। কোথাও কোনো উল্লেখযোগ্য আন্দোলন ও সংগঠনকে শক্তিশালীকরণের কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় নতুন কমিটিও গঠিত না হওয়ার ফলে বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের কার্যক্রম বাম ঘরনার ছাত্র সংগঠনগুলোর অবস্থানের দিকে যাচ্ছে বলে অনেকে অভিমত প্রকাশ করেন।

ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা বলেন, দলীয় কোন্দল আর ক্ষমতা ধরে রাখার কারণেই ওই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সামনে নির্বাচন, দ্রুত নতুন কমিটি গঠন করা না হলে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের আর দেখাই যাবে না। টঙ্গী থানা ও পাঁচটি উপজেলাতেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। 

ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা-কর্মী জানান, গাজীপুর জেলা ছাত্রদলের কমিটি গঠন করার জন্য কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা কয়েকবার উদ্যোগ নেন। কিন্তু বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা, জেলা বিএনপি ও ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির নেতাদের মধ্যে কোন্দলের কারণে সেসব উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যায়। জেলার বিভিন্ন ইউনিট নিয়ে পর্যালোচনা ও প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই-বাছাই করে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের কাছে প্রতিবেদন দেয়া হলেও কমিটি গঠনের কার্যক্রম থেমে রয়েছে।

ছাত্রদলের এক নেতা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, কয়েকবার গাজীপুর জেলা ও মহানগর কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও জেলা বিএনপি ও কেন্দ্রীয় নেতাদের হস্তক্ষেপের কারণে তা হয়নি। জেলা ও মহানগরে, কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেরই নিজেদের পছন্দের প্রার্থী রয়েছেন। তাদের পছন্দের একাধিক প্রার্থী থাকার কারণে কমিটি গঠনের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

জেলা ছাত্রদলের একাধিক পদবঞ্চিত ছাত্রদল নেতা বলেন, দলের চরম দুঃসময়ে যারা দলের পাশে, রাজপথে থেকেছেন, তাদের নিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা হলে দল অনেকটা প্রাণ ফিরে পাবে।

অন্যদিকে, গাজীপুর সিটি করপোরেশন গঠনের ৪ বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও গাজীপুর মহানগরীতে গঠন করা হয়নি কোনো কমিটি। তাই জেলার পাশাপাশি মহানগর ছাত্রদলের প্রথম কমিটি গঠন নিয়ে মাঠ পর্যায়ে নেতাকর্মীদের মাঝে ব্যাপক কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুর জেলা ছাত্রদল ও মহানগরের নতুন কমিটি হবে হচ্ছে করে দিন পার হচ্ছে। সিটি গঠনের শুরুতে মহানগর ছাত্রদলের কমিটি গঠন নিয়ে ব্যাপক তোড়জোড় লক্ষ্য করা গেলেও গত চার বছরে তা নিঃশেষ হয়ে গেছে। মূলত বয়সের ভাড়ে নুয়ে পড়েছে এমন সদস্য দিয়েই চলছে এক সময়ের প্রভাবশালী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের গাজীপুর জেলা শাখা।

এদিকে গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর প্রয়াত বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) আ স ম হান্নান শাহর মৃত্যুতে অভিভাবক সংকট তৈরী হয়েছে এ জেলায়। অপর দিকে আরেক অভিভাবক অধ্যাপক এম এ মান্নানকে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অবরোধ ও হরতালকালে গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, হত্যা, নাশকতা, বিস্ফোরক ও সরকারি কাজে বাধা দেয়াসহ বিভিন্ন আইনে মামলা করে ধমিয়ে রাখা হয়েছে। একই সাথে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম নগর পিতার চেয়ার নিয়ে টানাটানি করছে ক্ষমতাসীন দল। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ছাত্রদল নেতা বলেন, ২০০৩ সালের কমিটির সহ-সভাপতি মনিরুল ইসলাম মনির তখন এমএ শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। রেজাউল করিম খোকন ১৯৯৪ সালে বিএ পাস করেন। অথচ এখনও তারা ছাত্রদলের পদ নিয়ে বসে আছেন। জেলা ছাত্রদলের কমিটি না হওয়ার কারণে বিভিন্ন উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও কলেজ শাখার কমিটি গঠন করা হচ্ছে না। ফলে ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্বও সৃষ্টি হচ্ছে না।

জেলা ছাত্রদলের নেতৃত্বে যারা আসতে পারেন:
সংগঠনের নিয়ম অনুযায়ী ২০০০ সালের পূর্বে এসএসসি পাশ করা কোন ব্যক্তি ছাত্রদলের নতুন কমিটিতে স্থান পাবেনা। যার কারণে ত্যাগী অনেক নেতা ইচ্ছা থাকলেও পদে আসতে পারবে না। গাজীপুর জেলা ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ এখনও দৃষ্টিগোচর না হলেও নতুন কমিটি হতে পারে এমন সম্ভাবনাকে সামনে রেখে ছাত্রদলের মহানগর শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে কাজী আজিম উদ্দিন কলেজের জিএস সোহেল রানা, মহানগর ছাত্রদল নেতা মারজুক আহমেদ আল-আমিন, সাইদ মন্ডল, ইমরান রেজা, ফারহাজ প্রবাল, পারভেজ জাকির ভূঁইয়া পাপনা ও ইমরান হোসেনের নাম শোনা যাচ্ছে।

অপরদিকে গাজীপুর জেলা ছাত্রদলের নতুন কমিটি হলে তাতে সভাপতি ও সম্পাদক হিসেবে সম্রাট হোসেন, বেলায়েত হোসেন মোড়ল, কামরুজ্জামান শামীম, রাজিব, ফখরুল ইসলাম প্রধান, মাজাহারুল ইসলাম, হারুন অর রশীদ, আতাউর মোল্লা, মতিউর রহমান মতি, জসিম, জাকির হোসেন, শরিফুল ইসলাম প্রার্থী হতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে। 

জেলা ও মহানগর থেকে বয়সের ভাড়ে বাদ যাওয়া প্রার্থীরা হলেন- ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম মনির, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক সাবেক জিএস জিয়াউল হাসান স্বপন, সদস্য সাবেক ভিপি মামুন সরকার ও কাজী আজিম উদ্দিন কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সদস্য মাহমুদ হাসান রাজু। এছাড়া নূরে আলম, নাজমুল খন্দকার সুমন, নাসির উদ্দিন, আমিনুল ইসলাম, জাহাঙ্গীর আলম, মোবারক হোসেন, জিএস মাসুম ও খায়রুল ইসলাম মোল্লা রয়েছেন এ তালিকায়। 

এদিকে ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্বে সিনিয়র-জুনিয়র মিলে যোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে কমিটি গঠণ করতে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের দাবি। অপরদিকে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কেবলমাত্র যাদের ছাত্রত্ব আছে তাদের দিয়েই কমিটি গঠন করার দাবি জোরদার হচ্ছে।

গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ও জেলা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান এলিস পূর্বপশ্চিমকে বলেন, আমি ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলাম আট বছর। ২৫ বছর আগে আমি ছাত্র রাজনীতি ছেড়েছি। তখন যাদেরকে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়েছিলাম তারা এখনও জেলা ছাত্রদলের নেতৃত্বে আছে।

গাজীপুর জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মো. শরাফত হোসেন পূর্বপশ্চিমকে বলেন, গাজীপুর সিটি করপোরেশন গঠনের পর জেলার বেশ কিছু অংশ মহানগর এলাকায় হওয়ায়তে নানা কারণে কমিটির মেয়াদ দীর্ঘায়িত হয়েছে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, গাজীপুর সিটি করপোরেশন গঠন হওয়ার পর জেলা পুলিশ কি মেট্রোপলিটন করতে পেরেছে? এদিকে আরেকটা নির্বাচন সন্নিকটে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কমিটি খুব শিগ্রই হয়ে যাবে। এটার প্রক্রিয়া প্রায় এক বছর ধরে চলছে। সামনের কুরবানীর ঈদের পরই হয়তো নতুন কমিটি হবে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি উত্তেজিত হয়ে বলেন, সিনিয়র হয়ে গেছি তাই বলে কি আকাশে উড়াল দিব নাকি। পদ ছেড়ে কার কাছে দিব দায়িত্ব? কে কি বললো তাতে কিছু যায় আসেনা। মানুষ আমাদের নিয়ে কোন খারাপ ধারণা করবে না। আমরা তো আর সন্ত্রসী, চাঁদাবাজ বা ইয়াবা ব্যবসায়ীও না, আমরা ভদ্রলোক। এই কমিটি কি আপনারা কখনো বিলুপ্ত করার চিন্তা করেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি উচ্চস্বরে বলেন, আমরা পদত্যাগ করবো কার কাছে? আর কেনোই আমরা পদত্যাগ করবো। আমাদের কি আওয়ামী লীগের সাথে আঁতাত আছে নাকি? যে পদত্যাগ করে তাদের সাথে যোগ দিব। আমরা পদত্যাগ করে কোন বিতর্ক সৃষ্টি করতে চাইনা। বর্তমান দলে অনেক সংকট রয়েছে। আমি বৈধ উপায়ে পদ পেয়েছি, তাহলে কেন পদত্যাগ করবো। এখন ছাত্রদল আমাদের কথায় চলে না, আমরা ছাত্রদল করতে পারিনা। আমাদের কমিটির কারোই ছাত্রত্ব নেই, তাতে কি হয়েছে। অন্য একটি প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আপনার সাথে কথা বলতে আমি বাধ্য নই। যা করার করেন, এতো সময় নেই আমার হাতে, বলেই ফোন কেটে দেন।

ডাকসুর সাবেক (১৯৮৯ সাল) এজিএস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের জিএস (১৯৯০ সাল) ও বর্তমান গাজীপুর জেলা বিএনপির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক ৯০ এর ৪ ডিসেম্বরের আন্দোলনের মূল হোতা আনোয়ারুল ইসলাম পূর্বপশ্চিমকে বলেন, আমি পরীক্ষিত কর্মী ছাত্রদলের। সে সময়ের রাজনীতি এখন আর নেই। আসলে সারা দেশেই বিএনপির রাজনীতির চর্চার অভাব। গাজীপুরেও তার ব্যতিক্রম নয়। মহানগর ও জেলার কমিটি গঠনের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। গাজীপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। ইতোমধ্যে মুন্সিগঞ্জেও কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমি মনে করি দলের চরম দুঃসময়ে যারা দলের পাশে থেকেছেন, রাজপথে থেকে ডজন ডজন মামলার আসামি হয়েছেন তাদের কমিটিতে এনে নতুন কমিটি গঠন করা হলে দল নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবে। তাই নতুন নেতৃত্ব জরুরী। না হলে দুঃসময় কাটিয়ে ওঠা কোনভাবেই সম্ভব না। আমার বিশ্বাস নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রকৃত ছাত্র ও ত্যাগী নেতাদের কমিটিতে রাখবেন। কারন দল অনেক ভুল করেছে, নতুন কোন ভুলের জন্ম আর দিবে বলে মনে হয়না। তাই আমিও চাই রাজনৈতিক চর্চা বৃদ্ধি হোক, সংগঠন শক্তিশালী হোক এবং যোগ্য ও মেধাবীরা নেতৃত্বে আসুক। গুরুত্বপূর্ণ সময় দলের পেছনে ব্যয় করেছে অনেক নেতাকর্মী, তাদের মনে না পাওয়ার অনেক ক্ষোভ রয়েছে। তাই মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করে অভিলম্বে গাজীপুরের সকল কমিটি গঠন করা হোক এটাই আমার প্রত্যাশা।

গাজীপুর জেলা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বর্তমান জেলা বিএনপির সদস্য ও শ্রীপুর উপজেলা বিএনপির সদস্য মো. আব্দুল মোতালেব পূর্বপশ্চিমকে বলেন, মূলত জেলা বিএনপিতে যারা দায়িত্বে আছে আমি বলবো এটা তাদের ব্যর্থতা। মূল সংগঠনই ঝিমিয়ে আছে, ৮-৯ বছর এক কমিটিতেই চলছে। তাই অঙ্গ সংগঠনের করুণ অবস্থা। যারা এতোদিন ধরে ছাত্রদলের দায়িত্বে আছে তারা একেবারে নিষ্ক্রিয়। হাত পা গুটিয়ে বসে আছে। তারা দায়িত্বে থেকে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা, কলেজসহ কোন কমিটি করতে পারেনি। আন্দোলনের সময় এরা সিঙ্গাপুর, মালেশিয়ায় ভ্রমণে চলে যায়। কেন্দ্রীয় কমিটিও এর দায় এড়াতে পারেনা। আমরা দলের জন্য যতটুকু ত্যাগ স্বীকার করেছি এখন আর তা নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা যায়না। ছাত্রদলের এই কমিটির সদস্যরা নিজেরাও পদত্যাগ করছেনা, নতুনদেরও সুযোগ দিচ্ছেনা। ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনের আশায় সকল কমিটি ঝুঁলে আছে। আমরা দায়িত্বে থাকাকালীন কাজ করেছি। এখন আমি তো আর মূল দায়িত্বে নেই, যার কারণে চাইলেও কিছু করতে পারছিনা।

মহানগর ছাত্রদল নেতা মারজুক আহমেদ আল-আমিন বলেন, দলের জন্য কাজ করতে গিয়ে বিগত কয়েক বছরে ডজন খানেক মামলার আসামি হয়েছি। শুধু ছাত্রদল নয়, বিএনপির সব অঙ্গ সংগঠনের একই অবস্থা। 

গাজীপুর জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হান্নান মিয়া হান্নু বলেন, আসলে অনেক আগেই সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। আন্দোলন, সংগ্রাম ও মামলা-মোকদ্দমায় ছাত্রনেতারা জর্জরিত। রাজনৈতিক কিছু কারনও রয়েছে, কমিটি না হওয়ার পেছনে। আবার কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের কমিটিতে সভাপতি দায়িত্বে নেই। কেন্দ্রের কিছু নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। ছাত্রদলের কমিটি করার কিছু নিয়ম আছে, তা মেনেই নতুন কমিটি করতে হবে। গাজীপুরে বিএনপির পাঁচজন সিনিয়র নেতা আছে। এর মধ্যে আ.স.ম হান্নান শাহ প্রয়াত। বাকী চারজন জেলা বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক মিলন, সাধারণ সম্পাদক কাজী ছায়েদুল আলম বাবুল, হাসান উদ্দিন সরকার ও অধ্যাপক এমএ মান্নান। এই পাঁচজনের সাথে সমন্বয় করে কমিটি করার কথা। আলোচনায় বসলে পাঁচজনই বলে তাদের গ্রুপের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক দিতে হবে। এই দুইটি পদ তো আর পাঁচজনকেই দেয়া সম্ভব নয়। মূলত তাদের মধ্যে সমস্বয় না থাকাকেই কমিটির মেয়াদ দীর্ঘ হওয়ার প্রধান কারন হিসেবে দায়ী করেছেন হান্নান মিয়া হান্নু। 

তিনি আরো বলেন, সাধারণ সম্পাদক পদে থাকার কোন ইচ্ছে আমার নেই, আর তা অনেক আগে থেকেই। আমরা জেলার দায়িত্বে আছি, কেন্দ্র চাইলে মেয়াদ উর্ত্তীণের পরই কমিটি বিলুপ্ত করতে পারতো। কিন্তু কেন্দ্র তা করেনি, এমনকি নতুন কমিটিও দিচ্ছেনা। বিষয়টি কেন্দ্রের নেতারা ভালো বলতে পারবে। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সাথে সভায় আমি বলেছি আমার চুল-দাঁড়ি সব সাদা হয়ে গেছে এখনও ছাত্রদল নেতা পরিচয় দেয়াটা খুবই লজ্জার বিষয়। তাই আমি ছাত্র নেতার পরিচয় দেইনা। আমার ছেলেরই ছাত্রদল করার সময় হয়েছে। আমি গাজীপুর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক, গাজীপুর পৌর বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর। ছাত্রদল করার কোন প্রয়োজন আমার নেই। 

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, গত ১৪ বছরে নিয়ম অনুযায়ী জেলায় ৭টি কমিটি হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। এই সময়ে ১৪ জন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পেতাম। সেই সাথে অনেক নতুন নেতা-কর্মী তৈরী হতো এতোদিনে। ছাত্রদল আরো শক্তিশালী হতো। আমি নিজেও চাই খুব দ্রুত নতুন কমিটি হোক। শুধু ছাত্রদলের নয় যুবদলের কমিটির বয়স আরো বেশি। 

তিনি বলেন, ঈদুল আযহার পরে বা আগে কমিটি হওয়ার জোর সম্ভাবনা রয়েছে। কমিটি নেত্রীর নির্দেশে মেনেই হবে, তিনি দেশে না থাকায় দেরিও হতে পারে। লন্ডন থেকে মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের খোঁজ নেয়া হচ্ছে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদেরই জেলার নতুন কমিটিতে রাখা হবে। কমিটি বিলুপ্তি করার চিন্তা কখনো করেননি স্বীকার করে তিনি বলেন, চাইলে আসলে বিলুপ্তি করা যেতো। কিন্তু আমি চাইলেও তো কমিটির অন্য সদস্যরা চায় না। কেউ কেউ নিজেরা এখনও ছাত্রদলের নেতা পরিচয় দেয়, এমনকি আরো সময় কমিটিতে থাকতে চায়। 

এবিষয়ে জানতে গাজীপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী ছায়েদুল আলম বাবুলের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে তার মোবাইল নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে জেলা বিএনপির সভাপতি ও কালীগঞ্জ উপজেলার বিএনপির সাবেক সাংসদ ফজলুল হক মিলনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তার মেয়ে রাজধানীর স্কয়ার হাসপালে ভর্তি রয়েছে বলে জানায়। এখন মাথায় অন্য টেনশন কাজ করছে জানিয়ে তিনি এ বিষয়ে পরে কথা বলবেন বলে পূর্বপশ্চিমকে আশ্বস্ত করেন।

উপরে