আপডেট : ২০ মে, ২০১৮ ১৪:০৫

সৌদিতে বাড়ছে গৃহকর্মী নির্যাতন, ৫০ শতাংশ দেশে ফেরত

অনলাইন ডেস্ক
সৌদিতে বাড়ছে গৃহকর্মী নির্যাতন, ৫০ শতাংশ দেশে ফেরত

ভাগ্যের চাকা পরিবর্তনে প্রতিবছর অনেক নারী বিদেশে পাড়ি জমান। তাদের স্বপ্ন থাকে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত আর পরিবারের সুখের জন্য শ্রমের মূল্যে সামান্য কিছু টাকা। কিন্তু  এখন ঘটছে তার ঠিক উল্টোটা। শ্রম যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তার বিনিময়ে ভাগ্যে জুটেছে নির্মম অত্যাচার। কখনো কখনো তারচেয়েও বেশি কিছু। সৌদি আরবের শ্রমবাজারে গৃহকর্মী হিসেবে গিয়ে নিয়োগকর্তার নির্যাতনের শিকার হয়ে নিঃস্ব হয়ে ৭৮ জন নারী শ্রমিক দূতাবাসের সহযোগিতায় বাংলাদেশে ফেরত এসেছেন। এর আগে গত শুক্রবার নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশি পাঁচ নারী দেশে ফিরেছেন।

গত শুক্রবার এবং শনিবার  মোট ৮৩ জন নারী  ঢাকায় পৌঁছান। নিয়োগকর্তার বাড়ি থেকে পালিয়ে রক্ষা পাওয়া এই নারীরা আশ্রয় নিয়েছিলেন দূতাবাসের সেফহোমে । সেখানে দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে আরও চার বাংলাদেশি নারী।

কিন্তু এর আগেও গত এপ্রিলে সৌদি আরব থেকে প্রায় অর্ধশত নারীকে একই কারণে ফিরিয়ে আনা হয়। অবশ্য এ ধরনের ঘটনা শুধু সৌদি আরবেই নয়, আরব আমিরাত, জর্ডান, লেবানন ও কাতারের মতো মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে নারী কর্মীরা যাচ্ছেন, তার প্রতিটিতেই কমবেশি ঘটছে। সরকারের পক্ষ থেকে নানা ব্যবস্থা নেওয়ার পরও থামানো যাচ্ছে না মধ্যপ্রাচ্যের নিয়োগকর্তাদের নির্যাতন।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চলতি বছরের শুরুতে বিভিন্ন সময়ে সৌদি আরবে যাওয়ার পর ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, ভোলা, নওগাঁ, বরিশাল, সাতক্ষীরা, গাইবান্ধা ও ময়মনসিংহের নয় নারী নিয়োগকর্তার নির্যাতনের শিকার হন। এর মধ্যে ময়মনসিংহের দুই নারী সম্পর্কে মা ও মেয়ে। গত আড়াই মাসে তারা বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সহায়তায় দূতাবাসের তত্ত্বাবধানের পরিচালিত দাম্মামের খোবার এলাকার একটি সেফ হোমে নিয়ে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।

বিরূপ পরিস্থিতির শিকার এই নারীরা সৌদি আরবে আর অবস্থানে রাজি না হওয়ায় দূতাবাস তাদের ফেরত আনার ব্যবস্থা করে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরির পর শুক্রবার রাত ১১টায় ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, ভোলা, নওগাঁ ও ময়মনসিংহের বাসিন্দা মোট পাঁচ নারী এমিরেটস এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হেল্প ডেস্ক থেকে তাদের বাড়ি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়।

রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সিলর (শ্রম) সারওয়ার আলম জানিয়েছিলেন, ক্যাম্পে থাকা বাকি চার নারীকেও আগামী তিন থেকে চার দিনের মধ্যে বাংলাদেশে পাঠানো হবে।

জানা যায়, সৌদি আরবে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে প্রায় লক্ষাধিক নারী গৃহকর্মী পাঠানো হয়েছে। এরমধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশকেই দেশে ফেরত আনা হয়েছে। এদের একটি বড় অংশ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

বাংলাদেশি দূতাবাসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, মূলত তিনটি কারণে নারী গৃহকর্মীরা তাদের কাজ ছেড়ে পালাচ্ছেন। কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে, গৃহকর্তার কাছ থেকে নানা দুর্ব্যবহার ও নির্যাতনের শিকার হওয়া, গৃহকর্মীদের দিয়ে অত্যন্ত কঠিন কাজ করানো এবং গৃহকর্মীদের নিজের বাড়ির প্রতি দুর্বলতা।

সৌদি ফেরত এক নারী বলেন, ‘তোদের টাকা দিয়ে কিনে আনছি। এরকম ভাষায় কথা বলেছে। এছাড়া অন্য ভাষায়ও কথা বলেছে।নির্মমতার গল্প কতটা ভয়াল হলে, চোখের পানিতে ভেসে ওঠে সেই চিত্র।

সৌদি ফেরত আরো নারী বলেন, ‘আমরা সহ্য করোতে না পেরে অ্যাম্বাসিতে আশ্রয় নিয়েছি।’ দু’বেলা দু মুঠো ভাত আর পরিবারের সুখের জন্য মরুভূমির দেশে যাত্রা। উদ্দেশ্য শ্রমের মূল্যে সামান্য কিছু টাকা। কিন্তু ঘটছে তার ঠিক উল্টোটা। শ্রম যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তার বিনিময়ে ভাগ্যে জুটেছে নির্মম অত্যাচার। কখনো কখনো তারচেয়েও বেশি কিছু।

আরো এক নারী বলেন, ‘টাকা-পয়সা সব নিয়ে গেছে। আমি আর কিছু জানিনা।’

আরেকজন বলেন, ‘বলে নিয়েছিল, প্রতি মাসে ২২ হাজার টাকা দিবে। বলেছিল পরিবার অনেক ভাল। কিন্তু গিয়ে যখন এরকম দেখলাম, তখন দালাল হুমায়ুনকে ফোন দিলে অ আমার নাম্বার ব্লক করে দিয়েছে।

সৌদি আরবে নিয়োগকর্তার নির্যাতনের শিকার হয়ে শনিবার রাতেও দেশে ফেরেন ৭৮ নারী শ্রমিক। বর্বরতার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে তার প্রতিকারে সরকারকে উদ্যোগী হওয়ার আহবান জানান তারা।

একজন বলেন, ‘একটা কোম্পানিতে বিক্রি করে আমাকে। তারা আমাদের এক জায়গায় ১৫ দিন আটকে রাখে।’ আরেকজন বলেন, ‘ নারীদের জন্য সৌদির ভিসা বন্ধ করে দেয়া হোক।’

অবশ্য শুধু বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীরাই নয়, সৌদি নাগরিকদের বিরুদ্ধে গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগ সব দেশের গৃহকর্মীদেরই আছে এবং ছিল। এর মধ্যে ২০১৫ সালে সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মীর ওপর যৌন নির্যাতনের একটি খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে নিন্দার ঝড় তুলেছিল। সেবার গৃহকর্মীর ওপর যৌন নির্যাতন চালাতে গিয়ে স্ত্রীর কাছে হাতেনাতে ধরা পড়েন এক সৌদি নাগরিক। স্বামীর আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে সেই নারী ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।

২০১৬ সালে এক ভারতীয় গৃহকর্মী মুক্তি চাইলে সৌদি গৃহকর্তা তার ওপর হামলে পড়েন। কেবল তাই নয়, ক্ষুব্ধ হয়ে গৃহকর্তা একটি ছুরি দিয়ে ওই গৃহকর্মীর হাত কেটে ফেলেন। ২০১৭ সালের শেষার্ধে রোমহর্ষকভাবে নির্যাতিত বাংলাদেশি এক নারী কর্মীর সাক্ষাৎকারের ভিডিও বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলে। ভিডিওতে চুয়াডাঙ্গার ওই নারীর এক হাতে ক্ষতচিহ্ন, আরেক হাতে গোটা গোটা ফোস্কা দেখা যায়। প্রতিদিন তাকে ছয় থেকে সাতবার গরম লোহা দিয়ে ছেঁকা দেওয়াতেই এসব ফোস্কার সৃষ্টি হয়েছিল।

এ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রায় ৮০ হাজারের মত নারী শ্রমিক নিয়েছে সৌদি আরব। নির্যাতনের শিকার হয়ে এদের অনেকেই সম্প্রতি দেশে ফেরা শুরু করেছেন।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/রুমা

উপরে