আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ২১:৪৫

মালয়েশিয়ায় যেতে মালয় বা ইংরেজি জানতে হবে

বিডিটাইমস ডেস্ক
মালয়েশিয়ায় যেতে মালয় বা ইংরেজি জানতে হবে

মালয়েশিয়া যেতে হলে ইংরেজি বা মালয় ভাষা জানতে হবে। আগে যাঁরা মালয়েশিয়া থেকে ফেরত এসেছেন তাঁদের মধ্যে যাঁদের ক্রিমিনাল রেকর্ড রয়েছে তাঁরা আর দেশটিতে শ্রম বিক্রির জন্য যেতে পারবেন না। দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরের জন্য প্রস্তুত খসড়া সমঝোতা স্মারকে এসব শর্ত রয়েছে। এই স্মারকে বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সির দায়িত্বও সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এসব এজেন্সির কোটাভিত্তিক বরাদ্দের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়েছে মালয়েশিয়া সরকার।

গত সোমবার বাংলাদেশের মন্ত্রিসভায় জিটুজি (গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট) প্লাস নামের এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত ২২ ডিসেম্বর মালয়েশিয়ার মন্ত্রিসভায় এই সমঝোতা স্মারকটি অনুমোদিত হয়েছে। এর পর থেকে তারা দ্রুত সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরের জন্য বাংলাদেশকে তাগাদা দিচ্ছে। এ কারণে চলতি মাসের মধ্যেই এ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হতে পারে বলে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে জানা গেছে।

জিটুজি প্লাসের সমঝোতা স্মারকে কয়েকটি কাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, বাংলাদেশিরা ওই দেশে গিয়ে সেখানকার রাজনৈতিক কার্যক্রমে কোনোভাবেই অংশগ্রহণ করতে পারবে না। ওই দেশে বিয়ে করা যাবে না। চাকরি বদলানো যাবে না। এমনকি চাকরির পাশাপাশি অন্য কোনো ব্যবসাও চালানো যাবে না। কোনো অপরাধ করলে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হবে এবং নিজ খরচে দেশে ফিরে আসতে হবে। নিয়োগকর্তা তাঁদের কাছে পাসপোর্ট জমা রাখতে পারবেন না। যাঁর পাসপোর্ট তাঁর কাছে থাকবে। কিন্তু মেডিক্যাল সুবিধা নিতে হলে নিয়োগকর্তার কাছে পাসপোর্ট দিতে হবে। এমনকি টেম্পোরারি ভিজিট পাস করা বা নবায়ন করার সময় ফরেন ওয়ার্কার্স আইডেনটিটি কার্ড সংগ্রহের সময় পাসপোর্ট নিয়োগকর্তার কাছে জমা দিতে হবে। এসব কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়োগকর্তা কর্মী বা শ্রমিকের কাছে তাঁর পাসপোর্ট ফেরত দেবে।

শ্রমিকের মজুরির বিষয়ে বলা হয়েছে, এক মাসের মজুরি তার পরের মাসের ৭ তারিখের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। শ্রমিকের ব্যাংক হিসাবে এসব পারিশ্রমিক জমা হবে। শ্রমিকের কাজের সময় হবে আট ঘণ্টা। ওভারটাইম করার জন্য নিয়োগকর্তা অনুরোধ করতে পারেন। এটা করা না করার বিষয়টি শ্রমিকের ওপর নির্ভর করবে। ওভারটাইমের মজুরি পরিশোধ হবে মালয়েশিয়ার শ্রম অইন অনুযায়ী। সাত দিনে এক দিন বিশ্রাম পাবেন, মালয়েশিয়ান শ্রম অইন অনুযায়ী মিলবে বার্ষিক ছুটি। মেডিক্যাল ও দুর্ঘটনার জন্য বিমা সুবিধা পাবে শ্রমিক। শ্রমিকের থাকার জায়গার ব্যবস্থা করবেন নিয়োগকর্তা। মালয়েশিয়ায় অবস্থানের সময় বাংলাদেশি শ্রমিক তাঁর পরিবারের কোনো সদস্যকে সে দেশে নিতে পারবেন না। নিয়োগকর্তা দুই মাসের নোটিশ দিয়ে যেকোনো শ্রমিককে চাকরি থেকে বাদ দিতে পারবেন। অথবা দুই মাসের মজুরি দিয়ে যখন তখন চাকরি থেকে বাদ দিতে পারবেন।

জিটুজি প্লাস সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। এজেন্সিগুলো নিয়োগকর্তার চাহিদা অনুযায়ী শ্রমিক সরবরাহ করবে। শ্রমিকদের ট্রাভেল ডকুমেন্ট সংগ্রহ করবে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অনুমোদিত মেডিক্যাল সেন্টার থেকে শ্রমিকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাবে। এজেন্সিগুলো নিয়োগকর্তার চাহিদা অনুযায়ী শ্রমিক সরবরাহ না করার জন্য এবং আনফিট শ্রমিক সরবরাহের জন্য দায়ী থাকবে। নিয়োগের বিভিন্ন শর্ত শ্রমিক কতটুকু বুঝেছে তার দায়িত্বও বর্তাবে এজেন্সির ওপর। এজেন্সিগুলো বাংলাদেশ সরকারকে নিয়োগকর্তা, শ্রমিক ও শ্রম বিভাগের সর্বশেষ তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করবে। স্বাস্থ্যগতভাবে আনফিট শ্রমিকের স্বদেশে ফিরিয়ে আনার দায়ও এজেন্সিকে নিতে হবে। এজেন্সিগুলোকে আনফিট শ্রমিকের বদলে শ্রতিক দিতে হবে। মালয়েশিয়া সরকার যেসব শর্ত নির্ধারণ করবে তার সবই পূরণ করতে হবে এজেন্সিগুলোকে।

বাংলাদেশ সরকার যথাযথ যোগ্যতাসম্পন্ন রিক্রুটিং এজেন্টের তালিকা মালয়েশিয়া সরকারের অনলাইন সিস্টেমে পাঠাবে। এই তালিকা থেকে অভিজ্ঞ, উপযুক্ত ও পরিচ্ছন্ন ইমেজের রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন করবে মালয়েশিয়া। এসব রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যক্রমের জন্য বাংলাদেশ সরকার দায়বদ্ধ থাকবে। মালয়েশিয়া সরকারের দায়িত্বও নির্ধারণ করা হয়েছে সমঝোতা স্মারকে। পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনের মাধ্যমে করা হবে। বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন এবং তাদের মাধ্যমে কোটাভিত্তিক বরাদ্দের বিষয়ে স্বচ্ছতার জন্য মালয়েশিয়া দায়ী থাকবে। এ ছাড়া নিয়োগকারী এ দেশটির সরকার সে দেশের নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে যদি কোনো শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ ওঠে তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে সে দেশের প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। রিক্রুটিং এজেন্সি ডাটাবেইস থেকে কর্মী সংগ্রহ, কর্মীদের বায়োমেডিক্যাল, নিরাপত্তা যাচাই, চুক্তি সম্পাদন, ভিসা প্রক্রিয়াকরণ, প্রশিক্ষণ ও বহির্গমন কার্যক্রমে সহায়তা দেবে। অনলাইন সিস্টেমে কর্মী নির্বাচন তথ্য নিয়োগকর্তা জানতে পারবেন। নিয়োগকর্তা চুক্তিপত্র বাংলাদেশ দূতাবাসে পাঠাবে। এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করার পর বাংলাদেশের মালয়েশিয়ান হাইকমিশনের মাধ্যমে কর্মীদের পাসপোর্টে ভিসা স্ট্যাম্পিং করা হবে।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন অন্য যেকোনো চুক্তির তুলনায় জিটুজি প্লাসের সাফল্য পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ নিয়োগপ্রক্রিয়ার শুরুতেই মালয়েশিয়ার সরকার দেশটির নিয়োগকর্তার চাহিদা ও সক্ষমতা যাচাই করে কোটা নির্ধারণ করবে। নিয়োগকর্তা প্রাপ্ত কোটার বিপরীতে লেভি প্রদান করবে। পরে কোটার তথ্য সরাসরি অনলাইন সিস্টেমের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের কাছে পাঠানো হবে। এ কারণে বাংলাদেশি কর্মীর চাকরির নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে এবং মধ্যস্বত্বভোগীর সংশ্লিষ্টতা থাকবে না। নিয়োগ চুক্তিপত্র মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশন সত্যায়ন করবে। এ কারণে চুক্তিপত্র জালিয়াতি করে প্রতিস্থাপনের সুযোগ থাকবে না। জিটুজি প্লাস প্রক্রিয়ায় দুই দেশের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ শ্রমিকদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার বিষয় নিশ্চিত করবে।  

বাংলাদেশ সরকার মনে করছে, জিটুজি প্লাসের মাধ্যমে আগামী তিন বছরে ১৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়া যেতে পারবেন। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, অভিবাসন ব্যয় হবে শ্রমিকপ্রতি ৩৪ থেকে ৩৭ হাজার টাকা, যার পুরোটাই বহন করবেন কর্মী নিয়োগকারী বা সংশ্লিষ্ট কম্পানির মালিক।

মালয়েশিয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের অন্যতম শ্রমবাজার। বর্তমানে প্রায় ছয় লাখ বাংলাদেশি সেখানে বিভিন্ন পেশায় রয়েছেন।

 

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/আইএম

উপরে