আপডেট : ১৭ আগস্ট, ২০১৮ ০৮:৫৭

'চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়'

অনলাইন ডেস্ক
'চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়'

`চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়- বিচ্ছেদ নয় চলে যাওয়া মানে নয় বন্ধন ছিন্ন-করা আর্দ্র রজনী চলে গেলে আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে আমার না-থাকা জুড়ে‘।’ রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র ‘চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয় কবিতার’ কটি লাইন। আসলেই চলে গেলেও মানুষের কৃতকর্ম থেকে যায়। থেকে যায় মানুষের ভালোবাসা-মহানুভবতা। আর এই চলে গিয়েও থেকে যাওয়া মানুষেরই একজন ভারতের দশম প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী। তাঁর বিদায়ী অকৃত্রিম এক বন্ধু হারাল বাংলাদেশ। একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে বাজপেয়ীর নাম যেমন সারা বিশ্বে পরিচিত, তেমনি বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু এই মানুষটি। মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগের কথা, তখনও নয়া দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্স (এআইআইএমএস) হাসপাতালে ‘লাইফ সাপোর্টে’ ছিলেন তিনি। হঠাৎ করেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম তাদের প্রতিবেদনে জানাতে শুরু করল, অটল বিহারী বাজপেয়ী আর নেই। চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন ভারতের এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশও এই মৃত্যুর খবরে গভীর শোকাহত হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অকৃত্রিম এক বন্ধুকে হারিয়েছে। ভারত হারিয়েছে ইতিহাসের একটি অধ্যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অটল বিহারী বাজপেয়ীর অবদান অবিস্মরণীয়। তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিলেন। সেসময় ভারতের রাজনৈতিক মহলকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে ভারতীয় জনসংঘ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দিয়েছিল। বাংলাদেশের মানুষ ভারতকে পাশে পেয়েছিল। ভারত বাংলাদেশী শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছিল। শুধু স্বাধীনতা যুদ্ধে নয়, বাংলাদেশ বাজপেয়ীর কাছ থেকে সব সময় সহমর্মিতা ও সহযোগিতা পেয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে তিনি সহযোগিতার অজস্র স্বাক্ষর রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার জন্য ভারতের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকার বিশেষ সম্মাননা প্রদান করেন। তিনি পুরষ্কার গ্রহণের জন্য আসতে না পারলেও, তাঁর হয়ে এই সম্মাণনা গ্রহণ করে ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সহযোগিতা ছাড়াও অটল বিহারী বাজপেয়ীর রয়েছে দীর্ঘ জীবনাতিহাস। ১৯২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর গোয়ালিয়রে কৃষ্ণ বিহারী বাজপেয়ী ও কৃষ্ণা দেবীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন অটল বিহারী বাজপেয়ী। ছাত্র জীবনের শুরুতে গোয়ালিয়রের সরস্বতী শিশু মন্দির থেকে পড়াশোনা করেন। পরে গোয়ালিয়রের ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়েছেন। হিন্দি, ইংরেজি ও সংষ্কৃতে ডিস্টিংশন নিয়ে পাশ করেন তিনি। এরপর কানপুরের ডিএভি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণি সহ স্নাতকোত্তর পাশ করেন। আর্য সমাজের যুব শাখা আর্য কুমার সভা থেকে সমাজসেবায় অংশ নেওয়া শুরু হয় বাজপেয়ীর। ১৯৪৪ সালে তিনি আর্য সমাজের সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন। এসবের মাঝে ১৯৩৯ সালে আরএসএসে যোগ দেন এবং ১৯৪৭ সালে পূর্ণ সময়ের আরএসএস কর্মী হন বাজপেয়ী। ১৯৪২ সালে ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলন তথা রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয় বাজপেয়ীর। সেইসময়ে ২৩ দিন গ্রেপ্তার করে রাখা হয়েছিল বাজপেয়ী ও তাঁর দাদা প্রেমকে। পরে মুচলেকা দেন যে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে তাঁরা থাকবেন না। সেই শর্তে ছাড়া পান। ফলে স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁদের বেশি উজ্জীবিত হয়ে দেখা যায়নি। মহাত্মা গান্ধীর হত্যার অভিযোগে আরএসএস’কে নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর ১৯৫১ সালে নতুন তৈরি হওয়া ভারতীয় জন সংঘের হয়ে কাজ শুরু করেন বাজপেয়ী। ১৯৫৭ সালে প্রথমবার লোকসভা নির্বাচনে অংশ নেন তিনি। মথুরা থেকে দাঁড়িয়ে রাজা মহেন্দ্র প্রতাপের কাছে হেরে যান। তবে অন্য একটি আসনে বলরামপুর থেকে জিতে সংসদে যান। শোনা যায়, তাঁর ভাষণ এতটাই জোরদার ছিল যা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকেও প্রভাবিত করেছিল। সাংগঠনিক দিক থেকে অত্যন্ত প্রভাবশালী ও দক্ষ প্রশাসক অটল বিহারী খুব তাড়াতাড়ি জনসংঘের মুখ্য হয়ে ওঠেন। দীনদয়াল উপাধ্যায়ের মৃত্যুর পরে ১৯৬৮ সালে তিনি দলের জাতীয় সভাপতি হন। ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থার সময়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৭৭ সালে ছাড়া পাওয়ার পর জনসংঘ নিয়ে কংগ্রেস বিরোধী জোট বা জনতা পার্টিতে যোগ দেন তিনি। ১৯৭৭ সালে লোকসভা নির্বাচনে জিতে জনতা পার্টি জোটের সরকার হলে প্রধানমন্ত্রী হন মোরারজী দেশাই। তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রী নির্বাচিত হন অটল বিহারী বাজপেয়ী। ১৯৮৪ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজেপি মাত্র ২টি লোকসভা আসনে জয়ী হয়। তারপরও সংসদে কংগ্রেসের বিরোধী নেতা বলতে সবার আগে বাজপেয়ীর নাম লোকের মুখে মুখে ঘুরত। ধীরে ধীরে গুজরাত ও মহারাষ্ট্রে জয়ের পরে বিজেপি অনেক শক্তিশালী হয়ে যায়। ততদিনে বাজপেয়ীকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী ঘোষণা করে দেয় বিজেপি। ১৯৯৬ সালের লোকসভা নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়ে জয়ী হয় বিজেপি। দশম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন অটল বিহারী বাজপেয়ী। তবে অন্য দলগুলো বাজপেয়ীকে সমর্থন না করায় মাত্র ১৩ দিনের সরকার ছিল এসময়। ১৯৯৮ সালের নির্বাচনেও বিজেপি জেতে। সেবারও প্রধানমন্ত্রী হন বাজপেয়ী। তবে ১৯৯৯ সালে এআইএডিএমকে নেত্রী জয়ললিতা সরকারের উপর থেকে সমর্থন সরিয়ে নিলে বাজপেয়ীর সরকার পড়ে যায়। মাত্র ১৩ মাসের সরকার হয়। এরপর ১৯৯৯ সালে ফের লোকসভা নির্বাচন হয়। কার্গিল যুদ্ধ ও পোখরানে পরমাণু নিরীক্ষণের পরের এই ভোটে বিজেপি ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ৩০৩টি আসনে জেতে। ১৯৯৯ সালের অক্টোবর মাসে বাজপেয়ী তৃতীয়বারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৪ সাল পর্যন্ত পূর্ণ সময়কাল সরকার চালান। ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি বিপুল আসনে হেরে যায়। সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস তখন সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এসময় বাজপেয়ী বিরোধী দলের নেতৃত্বের ভার অন্যের ওপর ছেড়ে দেন। ২০০৫ সালে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন তিনি। ২০১৫ সালে ভারত সরকার অটল বিহারী বাজপেয়ীকে ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ সম্মান ভারত রত্ন সম্মানে ভূষিত করে। ১৯৯২ সালে তিনি পদ্মবিভূষণ পান। এরপর ১৯৯৪ সালে লোকমান্য তিলক পুরস্কার, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ‘মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ পান তিনি। এছাড়াও বহু দেশি-বিদেশি সম্মাননা পেয়েছেন এই মহান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। শুধুই দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বা একজন বাগ্মী রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি একজন সুদক্ষ কবিও ছিলেন। ২০০৯ সালে স্ট্রোকের পর থেকেই স্মৃতিশক্তি হ্রাস পেতে থাকে বাজপেয়ীর। চিকিৎসাধীন ছিলেন দীর্ঘদিন। আজ বৃহস্পতিবার ৯৩ বছর বয়সে বিদায় নিলেন ভারতীয় রাজনীতির এই অবর্ণনীয় চরিত্র।

উপরে