আপডেট : ২১ নভেম্বর, ২০১৭ ১৯:৫৭

‘ছিনাল’ ‘বেশ্যা’ গালিতে কাঁদে না আর প্রাণ...

শেখ তাসলিমা মুন
‘ছিনাল’ ‘বেশ্যা’ গালিতে কাঁদে না আর প্রাণ...

এমন কোনো নারী পাওয়া যাবে কিনা জানি না যে জীবনে একবারও ‘বেশ্যা’ ডাক শোনেনি। যে শোনেনি সে সৌভাগ্যবান মেয়ে। এমন সৌভাগ্যবানের সংখ্যা খুব কম। তবে এ সৌভাগ্যের পেছনে দাঁড়িয়ে কাঁদে তাঁরা। তাঁদের আর্ত মুখগুলো চেয়ে থাকে। ওরা বেশ্যা।

বেশ্যার আভিধানিক অর্থ গণিকা দেহপসারিনী। অধুনা ‘ছিনাল’। ছিনালের আভিধানিক অর্থ কুলটা, ভ্রষ্টা নারী। নারীকে গাল দিতে বিদেশেও ‘হোর’ও খুব বেশি পিছিয়ে নাই। বেশ্যা। সেই কবে একটি মেয়েকে বাধ্য করা হয়েছিলো তার দেহ বিক্রি করতে। জীবন এবং জীবনের সকল অর্থ যখন চোখের সামনে ডুবে যায়, অন্যরকম মৃত্যুর হাতে সপে দিয়ে যে নারী ধুঁকে ধুঁকে ‘জীবন’ নিয়ে যুদ্ধ করতে থাকে সেই মেয়েটির অসহায়ত্ব জীবন্ত ‘গালি’ হয়ে গেছে। আর একটি ’ভদ্র ঘরের’ মেয়ের জন্য এ শব্দ শোনা হচ্ছে মরে যাবার সামিল। অথচ এ শব্দের পেছনে চেয়ে থাকে কিছু করুন চোখ। রাত জেগে সস্তা পাউডারে মুখ ঢেকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা অসহায় কিছু মুখ। দু’টাকার বিনিময়ে অচেনা কোনো এক পুরুষকে নিয়ে যাবে বিছানায়। জীবনের সবচাইতে অপমানে নিজেকে বিছিয়ে দেবে। সেই ভাঙচুরের শরীরে ছায়া ফেলে যায় একটি জীবন।

কোনো এক বর্ষা রাতে টিমটিম কুপির আগুনে ধাইমা খালাস করে দিয়েছিলো তাকে তার মায়ের কোলে। মেয়ে বলে আনন্দধ্বনি ওঠেনি। তবু দূরে কোথাও একটি জীবন শুয়ে ছিলো। একটি ঘর। একটি গৃহস্থ জীবন। বুকের শিশুকে কোলে নিয়ে গনগনে চুলোয় ভাত রাঁধে। দ্রুত হাতে সালুন চাখে। উঠোনে হাঁক দেয় পুরুষ। ’ভাত দে বউ’। আহা নারী! আহা নারী! সেই জীবনের চৌকাঠ গলে ভেসে গিয়ে কবে তুই ‘বেশ্যা’ হয়ে গেলি। ‘কুলটা’ হয়ে গেলি। ছিনালির গলিতে দাঁড়িয়ে থাকিস তুই সারারাত। তোর কানে কানে বলি, আমি তোর জীবন চাইনি। হেঁশেলে রান্না আর বাচ্চা সামলানোও নয়। উঠোনের মায়া থেকে ছড়িয়ে কানাগলিতে আমাকে দাঁড়াতে হয় নি।

আমি স্কুলে গিয়েছিলাম। ইশকুলের মাঠে ভিরু পায়ে দাড়িয়েছিলাম। যে স্কুলে মেয়েদের নিয়ে খুব আশা করা হয় না। সেখানে যুদ্ধ করতে হয় তাকে একা। সে মেধাবী হলেও কারও চোখ চিকচিক করে না। একটি ছেলের পেছনে পরিশ্রম দিলে বাঁচে পরিবার, সমাজ, দেশ। একটি মেয়ে সেখানে বসে থাকে জায়গা দখল করে। সেই স্কুল পাশ করে, কলেজের প্রাঙ্গণ পাড়ি দিয়ে, বিশ্ববিদ্যালয় পাশ দিয়ে সে যখন মনে করে সে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। কথা বলতে পারে গলা না কাঁপিয়ে। তাকে কি শুনতে হয় জানিস বোন? ’বেশ্যা’। ’ছিনাল’।

একটি সমাজ একজন বারবণিতাকে তৈরি করে পুরুষের প্রয়োজনে। তাদের আয়োজন যজ্ঞে কুরবানি হয় অসহায় মেয়ে। সেই তাকেই গালি দেয় তারা। তাকেই গালির সেরা গালি করে তোলে। জানো মেয়ে, আমাকে যখন ওরা ‘বেশ্যা’ বলে, বলে ‘ছিনাল’ আমার কষ্ট হয় না। অপমান বোধ হয় না। কোথায় যেন মনে হয়, একদিন যে নারীকে তার আপন আঙিনা থেকে নিয়ে নরকের জীবনে বাধ্য করা হলো, তাকে আর তার আঙিনায় আমি ফেরাতে পারি নি। সেই সমাজেই বাস করে যাই আমি বছর বছর। শিক্ষিত হই। বই লিখি। সেমিনারে যাই। টিভি রুমে বসে আলোচনা করি। আমার ঘরে ফেরার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে সে। একবার আমাকে তার নামে ডাকুক! একবার নয় অনেকবার। তবু যদি তার বেদনার কাছে যেতে পারি এতটুকুন! না, আমার ‘ভদ্র মেয়ে’ হবার কোন ইচ্ছে নাই।

যতদিন একটি নারীকেও তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে শরীর বিক্রয় করতে বাধ্য করা থেকে আমি বাঁচাতে পারবো না, হে পুরুষ ততদিন আমি ওদের একজন! আমাকে ডাকো ‘বেশ্যা’! আমাকে ডাকো ‘ছিনাল’! যতখুশি! আমি ওদেরই একজন! যতবার গালি দেবে আমায় ততবার আমি ওদের হবো। আমার কণ্ঠস্বর শক্ত হবে। সকল নারীর মর্যাদা সমান না হওয়া পর্যন্ত আমি ওদের। [লেখকের ফেসবুক থেকে নেওয়া]

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে