আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৯:৪৯

সাবধান! অনলাইনে ফাঁদ পেতেছে প্রতারক চক্র

অনলাইন ডেস্ক
সাবধান! অনলাইনে ফাঁদ পেতেছে প্রতারক চক্র

সাবধান! অনলাইনে ওঁৎ পেতে আছে প্রতারক চক্র। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া লটারি, বিদেশে উন্নত চাকরি ও মূল্যবান সামগ্রী দেয়ার প্রলোভনসহ নানা কৌশলে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছে সংঘবদ্ধ দেশী-বিদেশী চক্র। এ ধরনের প্রতারণার শিকারে পরিণত হয়েছেন ঢাকার এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী কামরুজ্জামান। তার সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় হয় প্রিসকা খালিফা নামে এক বিদেশী নারীর।

ওই বিদেশী নারী জানান, তার বাবা ড. ডেভিড উইলসন খালিফার নামে লন্ডনের একটি ব্যাংক এ্যাকাউন্টে ৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন ইউএস ডলার জমা আছে। এ ডলারগুলো তোলার জন্য বিশ্বস্ত লোক ও কিছু টাকা প্রয়োজন। প্রিসকা খালিফার প্রলোভনের ফাঁদে পা দেন ওই ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ী লিজা ও মহসিন নামে দুই বাংলাদেশীর বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে কয়েক ধাপে জমা দেন ২৫ লাখ ৪৪ হাজার ১৪৪ টাকা। তারপর এই টাকা হাতিয়ে নেয় দেশী-বিদেশী প্রতারক চক্র। শুধু কামরুজ্জামানই নয়, এভাবে শাহনুরসহ অনেকেই দেশী-বিদেশী প্রতারক চক্রের ফাঁদে পা দিয়েছেন। কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে দেশী-বিদেশী ওই প্রতারক চক্র।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশ থেকে মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিতে নতুন ফাঁদ পাতার খবর পেয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে নাইজিরীয় প্রতারক চক্রের সদস্য ও তাদের সহযোগী বাংলাদেশেরই নারী-পুরুষ এজেন্ট পরিচিত প্রতারক চক্রের সদস্য। তাদের যোগসাজশে শক্তিশালী এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা নানারকম প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

এমনই এক প্রতারক চক্রের সন্ধান পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। নাইজিরিয়ার চার নাগরিকসহ এই চক্রের সাতজনকে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ। তারা হলো লিজা আক্তার, তার কথিত স্বামী নাইজিরিয়ার জন আগডি ইউজিও, আফেজ, মাইকেল ইউজিনি ব্রাউন, নামডি কেলভিন, মোঃ মহসিন শেখ ও স্ত্রী তাসমিয়া পারভীন ওরফে শিমু।

রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে দেশী-বিদেশী প্রতারক চক্রের সাতজনকে গ্রেফতারের পাশাপাশি বিদেশীদের প্রতারণার অর্থ লেনদেনে জড়িত বাংলাদেশের বারোটি ব্যাংকও শনাক্ত করেছে ডিবি পুলিশ। জব্দ করা হয়েছে গ্রেফতারকৃতদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, ল্যাপটপসহ বেশকিছু আলামত। ওই সাতজনের বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মামলাও করা হয়েছে। বিদেশী প্রতারকরা তাদের এ দেশের এজেন্টদের (প্রতারক) মাধ্যমে বিভিন্ন ফন্দি এঁটে কৌশলে মানুষকে প্রতারিত করে আসছিল। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ পেয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে এ চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেফতার করে ডিবির পুলিশ। গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় দেশী-বিদেশী প্রতারক চক্রের সাত সদস্যকে। জিজ্ঞাসাবাদে বের হয়ে আসে প্রতারণার ফাঁদ পেতে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার চাঞ্চল্যকর কাহিনী।

গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন ব্যবসার আড়ালে তারা বাংলাদেশী ও বিদেশী নাগরিকদের যোগসাজশে এ ধরনের প্রতারণামূলক কাজ করে বিভিন্ন ব্যাংক এ্যাকাউন্টের মাধ্যমে টাকা আত্মসাত করে আসছিল বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এ জন্য তারা ফেসবুক, ইমেল, হোয়াটস এ্যাপসহ নানা ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। ভুক্তভোগী কামরুজ্জমান ও শাহনুর হোসেন নামের দুজনের অভিযোগ পেয়ে তদন্ত নামে ডিবি পুলিশ। গ্রেফতার হওয়া নাইজিরীয় প্রতারক চক্রের সদস্যরা নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তির সঙ্গে ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রথমে বন্ধুত্ব তৈরি করে। এরপর তার সঙ্গে কিছুদিন কথা বলে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে।

পরবর্তীকালে ইমেল বা মেসেজের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংকের ভুয়া কাগজপত্র পাঠিয়ে বিশ্বস্ততা তৈরি করে। প্রেমিকা কিংবা প্রেমিককে জানানো হয়, সে নাইজিরিয়া বা মালিতে কিংবা আফ্রিকায় থাকে। তার বা তার বাবার মিলিয়ন মিলিয়ন অর্থ আছে ব্যাংকে। তোমাদের দেশে টাকা বিনিয়োগের অনেক সুযোগ রয়েছে এবং এই বিনিয়োগ নিরাপদ। তাই আমি টাকা পাঠাব। তুমি সেটাকে কাজে লাগাবে। তোমার শ্রম আর আমার টাকা। পরবর্তীকালে সেই টাকা তুলতে গেলে বলা হয়, এর জন্য কিছু টাকা দিতে হবে। সরল বিশ্বাসে টাকা দিলে প্রতারণার শিকার হয় প্রতারকের সেই বন্ধু। কিন্তু সেই বাংলাদেশী বন্ধু, প্রেমিক বা প্রেমিকা যখন বুঝতে পারে যে তিনি প্রতারণার ফাঁদে পড়েছেন, তখন তার কিছুই করা থাকে না।

অনেক বাংলাদেশীকে এভাবেই ফাঁদে ফেলে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে দেশী-বিদেশী প্রতারক চক্রের সদস্যরা। প্রতারক প্রত্যেকের একাধিক ব্যাংক এ্যাকাউন্ট রয়েছে। কারও কারও ১০-১২টি এ্যাকাউন্টও রয়েছে। তাদের মধ্যে লিজার একটি এ্যাকাউন্ট থেকে গত এক মাসে কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হয়েছে। এসব টাকা তারা দেশের বাইরে পাচার করতে বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করত। কখনও দামী পণ্য কিনে সেটা বিদেশে নিয়ে বিক্রি করে টাকা নেয়, কখনও হুন্ডির মাধ্যমে টাকা দেশের বাইরে পাচার করে। তাদের সঙ্গে বেশকিছু অসাধু মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীর যোগসাজশ রয়েছে। বিদেশীদের প্রতারণার অর্থ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশের এমন বারোটি ব্যাংক শনাক্ত করা হয়েছে।

শনাক্তকৃত ব্যাংকগুলোয় বিদেশীরা প্রতারণা করে হাতিয়ে নেয়া অর্থ জমা রাখত। বিভিন্ন উপায়ে সেসব ব্যাংকের এ্যাকাউন্ট থেকে বিভিন্ন দেশে টাকা পাঠানো হতো। এ পর্যন্ত এসব ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে গ্রেফতার লিজা আক্তারের নামে প্রায় দেড় কোটি টাকা লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে। এসব টাকা অসাধু মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীদের যোগসাজশে পাকিস্তানী নাগরিক দানেশ রিজভীর কাছে পাঠানো হয়। গ্রেফতার লিজা বাংলাদেশী নাগরিক।

তিনি নাইজিরীয়দের স্ত্রী সেজে তাদের সঙ্গেই থাকেন। তাসমিয়া পারভীন শিমু ও মহসিন শেখ লিজার এ দেশী সহযোগী। বাংলাদেশের কোনও নাগরিকের ব্যাংকের এ্যাকাউন্ট খুলতে হলে ভেরিফিকেশনের জন্য নানা ধরনের ডকুমেন্ট দিতে হয়। প্রতারকরা কীভাবে এসব এ্যাকাউন্ট খুলে ভিকটিমদের টাকা জমা দিয়েছে এ বিষয়ে তদন্ত চলছে।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে