আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৭:০৬

বাংলাদেশকে মিয়ানমারের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর উস্কানি

এখলাসুর রহমান
বাংলাদেশকে মিয়ানমারের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর উস্কানি

মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। ওদের দায়িত্ব নেয়ার কথা ছিল জাতিসংঘ, ওআইসি, সার্কসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের।

কোন গ্রামে ডাকাত পড়লে শান্তিশৃংখলা বাহিনী ও প্রতিবেশী গ্রাম আক্রান্তদের পালিয়ে অন্যগ্রামে চলে যেতে বলেনা। তারা ডাকাতদের প্রতিরোধ করতেই উদ্যোগ নেয়। আক্রান্ত গ্রামবাসীকে অন্য কোন গ্রামের পক্ষে আশ্রয় প্রদান করাও একেবারেই অসাধ্য।

এই অসাধ্য কাজটিই করে চলেছে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদেরকে আশ্রয় দিয়ে।এই আশ্রয় না দিলে উদ্বাস্তু রোহিঙ্গারা সাগরে ভাসতে ভাসতে মারা যেত। এই মৃত্যুর দায় কি বাংলাদেশের হতো ? মোটেই না। বাংলাদেশ মানবতা দেখাতে গিয়ে নিজেকে ছুঁড়ে ফেলেছে যুদ্ধের হুমকিতে। চলছে নানা চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র, অজ্ঞতা, হঠকারিতা ও কান্ডজ্ঞানহীন অপতৎপরতা।

কতিপয় ইসলামপন্থী দল ব্যস্ত রয়েছে মানবতাকে সাম্প্রদায়িকীকরণে রূপ দেয়ার তৎপরতায়। ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন মিয়ানমারে রোহিঙ্গা হত্যা বন্ধ না হলে মিয়ানমারে হামলার হুমকি দিয়েছে। হেফাজতে ইসলাম যুদ্ধের জন্য অস্ত্র চাচ্ছে। বিএনপি নেতারা বলছে, নাফ নদীতে নৌকা ভিড়ার সাথে সাথে প্রত্যেক রোহিঙ্গা পরিবারের কাছ হতে ২০,০০০ টাকা করে নিচ্ছে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা। টাকা না দিলে অসহায় রোহিঙ্গা নারী-শিশুদের নৌকা নাফ নদীতেই ঠেলে দিচ্ছে তারা। সরকারি দল বলছে, বিএনপি ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাচ্ছে ।

বাংলাদেশের নামী চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বললেন, মিয়ানমারের নির্যাতনের চিত্র দেখলে আমি ঘুমাতে পারি না। একাত্তরের যুদ্ধ আমি দেখেছি। সেসময় হানাদার বাহিনী যে ভয়াবহ তান্ডব চালিয়েছিল তা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নির্যাতনের তুলনায় নগণ্য। এক্ষেত্রে খ্যাতিমান নির্মলেন্দু গুণের বক্তব্য জানা আবশ্যক। তিনিও একাত্তর দেখেছেন ও স্বাধীনতার কবিতা লিখেছেন ।এবার তিনিও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন ।

স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, যে কবি একাত্তরের যুদ্ধটা করলেন না আর এবার মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাইছেন? এক্ষেত্রে তিনিও কি ইলিয়াস কাঞ্চনের বক্তব্যের সঙ্গে একমত? একাত্তরের গণহত্যাটা তত ভয়াবহ ছিল না বলেই কি তার কবি সত্তা যুদ্ধকামী হয়ে ওঠেনিৱ? আরও খবর বেরিয়েছে, সাইবার একাত্তর নামের একটি গ্রুপ বার্মার কিছু সরকারি ওয়েবসাইট হ্যাক করে বলছে, বার্মিজরা আমাদের আকাশসীমা লংঘন করেছে, আমরা তাদের সাইবার স্পেসের সীমা লংঘন করলাম। এই সাইবার একাত্তর এর হ্যাকিংয়ে রোহিঙ্গাদের কি কোন উপকার হল ? রোহিঙ্গাদের মিত্র দাবীদার আরাকান সালভেশন আর্মি(আরসা) ২৪ আগস্ট বার্মায় পুলিশ ফাঁড়ি ও সেনাক্যাম্পে হামলা করল।এই হামলাই কি রোহিঙ্গা নির্যাতনের ক্ষেত্র সৃষ্টি করেনি ?এই আরসা কি স্বাধীনতা চায় নাকি রোহিঙ্গাদের মানব ঢাল ও ইস্যু করে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায় ?

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ভিড়ে যে আরসা’র কেউ নেই তার কি নিশ্চয়তা আছে ?তারা বাংলাদেশে অবস্থান করে যদি বার্মায় চোরাগোপ্তা হামলা চালায় এতে কি বাংলাদেশও আক্রান্ত হওয়ার পরিস্থিতিতে পড়বে না ?আরও শোনা যাচ্ছে রোহিঙ্গা নারীদের নিকট হতে কমদামে স্বর্ণ কিনে ব্যবসায় মত্ত রয়েছে একশ্রেনীর অসাধু বাঙালি ।একজন পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করল কতিপয় স্থানীয়রা।রোহিঙ্গা যুবতী ধর্ষণের খবরও শোনা যায় ।এসব ঘটনা কি বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্টের কারণ হচ্ছেনা ?ইতোমধ্যেই রোহিঙ্গারা দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে ।তাদের ব্যাপারে স্থানীয় সরকারের কাছে কোন তথ্য নেই ।রোহিঙ্গারা অনেকেই বাংলাদেশে মাসিক ২০০০ টাকা করে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকছে ।ভাড়া থাকে চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীরা ।রোহিঙ্গাদের ভাড়া পরিশোধ ও অন্ন-বস্ত্রের সামর্থ্য অর্জনের উপায় কী হবে ?পৃথিবীর কোন শরণার্থী বাসাভাড়া নিয়ে থাকছে ?

আরও একটি ভয়াবহ খবর হল: জাপানের একটি খ্যাতনামা কোম্পানী uni qlo এর প্রধান নির্বাহী তাদাশি জনাই রোহিঙ্গা মুসলিমদের জন্য ১ হাজার মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশী মুদ্রায় ৮ কোটি ২২ লাখ) অনুদান দিয়েছেন জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক এজেন্সীতে ।তাদাশি জনাই মুসলিম বিশ্ব ও বিভিন্ন দেশের জিহাদী সংগঠনগুলোকে মিয়ানমারকে ধ্বংস করতে এগিয়ে আসার আহ্বানও জানান।তিনি জিহাদী সংগঠনগুলোকে সাহায্য করার ঘোষণাও দেন ।ঠিক এমনই সময়ে আন্তর্জাতিক জিহাদী সংগঠন আল কায়েদা বাংলাদেশ, ভারত ও ফিলিপাইনের তাদের মুজাহিদ ভাইদেরকে রোহিঙ্গা মুসলিম ভাইদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান ।এক্ষেত্রে বাংলাদেশে অবস্থানরত তথাকথিত মুজাহিদরা যে ইস্যুবাজদের সহায়তা নিয়ে নাশকতা করবেনা আর নাশকতা করে রোহিঙ্গাদের ভিড়ে লুকাবেনা এর কি নিশ্চয়তা আছে ?

বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায় পেশি শক্তিতে দুর্বল গ্রামের মানুষেরা তাদের শক্তি বাড়াতে পেশি শক্তিতে সবল গাঁয়ে বৈবাহিক আত্মীয়তা করে থাকে ।সবল গাঁয়ের ঘরজামাই হয়ে দুর্বল গ্রামের লোকটি তখন সবল শশুর বাড়ির পরিচিতিটাকেই সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত করতে চায় ।রোহিঙ্গারাও এদেশে এসে সে কৌশলটাও গ্রহণ করে চলছে ।তারা বাংলাদেশিদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক করে চলছে।সরকারের নিষেধ সত্ত্বেও তা গোপনে গোপনে চলে আসছে ।১৯৭৮ সাল হতে বাংলাদেশে প্রবেশকৃত রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নজীর হতে দেখা গেছে ।

জাতিসংঘের দেয়া তথ্য মতে প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে পারে ।এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে বাংলাদেশ ?এই রোহিঙ্গাদের মানবঢাল বানিয়েই চক্রান্তের জাল বুনছে বাংলাদেশকে চরম বিশৃংখলার দিকে ঠেলে দিতে চাওয়া চক্রান্তকারীরা ।যুদ্ধ বাঁধলে আমাদের কী লাভ ?আমরা কেন অন্যের দায় নিজেরা বহন করতে যাব ?

১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ শাসন হতে বার্মা স্বাধীন হওয়ার পর বিভিন্ন সরকারের আমলে বার্মা তার সীমানাভূক্ত রোহিঙ্গাসহ সব জাতি গোষ্ঠীকে পূর্ণ নাগরিক বলে স্বীকার করে নেয় ।রোহিঙ্গারা সেদেশের সংসদে নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছে ।আজকের এই রোহিঙ্গা নির্যাতনে সেদেশীয় রোহিঙ্গা নেতাদের কী ভূমিকা ?মিয়ানমারে কি এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার মত কোনই বিবেকবান নেতৃত্ব নেই ?আর আজকে যারা মুসলমান মুসলমানের পাশে দাঁড়ান বলে মানবতাকে সাম্প্রদায়িকীকরনের রূপ দিচ্ছেন তাদের কাছে প্রশ্ন ১৯৪৮ সালে আরাকান মুসলিম লীগ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে যেতে চাইলে তৎকালীন মুসলিম নেতারা তাদের কেন নিলো না?

রোহিঙ্গা ইস্যু দিয়ে কেউ হতে চাচ্ছে জিহাদী, কেউ মুসলিম দরদী, কেউ প্রতিবাদী, কেউ মানবতাবাদী, কেউ দানবীর, কেউ আবার চাচ্ছে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে ।কেউ চাচ্ছে বিশৃংখলার আগুন জ্বললে সে আগুনে আলু পুড়া খেতে ।দেশি-বেদেশী জঙ্গিবাদের সমর্থক, পৃষ্ঠপোষক ও পরামর্শকরা মুখিয়ে আছে রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র জঙ্গীবাদে উস্কে দিতে ।জাপানি ব্যবসায়ী তাদাশি জনাই আত্মপ্রকাশ করল, আরও যারা আছে তারাও সময়ে ঠিকই আত্মপ্রকাশ করবে ।তাদাশি জনাইয়ের জিহাদী গোষ্ঠীর প্রতি আহ্বানকে কিভাবে দেখছে জাতিসংঘ ?মিয়ানমার নেত্রী অং সান সু চি জাতিসংঘে গেলনা ।জাতিসংঘ সম্পর্কে সূচীর বক্তব্য: আমরা প্রয়োজনে জাতিসংঘের আনান কমিশনকে গুরুত্ব দেব ।’এ কথার অর্থ কি তা নয় যে সু চি’র প্রয়োজন না হলে জাতিসংঘের নির্দেশনা মানবেনা ।এটা কি জাতিসংঘের প্রতি সু চি’র চরম উপেক্ষা নয় ?

বিশ্বের প্রধানতম আন্তর্জাতিক সংস্থাটি এই উপেক্ষায় কী ভূমিকা নেবে ?রোহিঙ্গাদের দায়িত্ব গ্রহণের দায় তার নয় কি ?মানবিক দৃষ্টিতে তাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ কেন তার ভূমিকে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার হুমকিতে ফেলবে ?মিয়ানমার নিজেও যুদ্ধের উস্কানি দিচ্ছে ।তাদের হেলিকপ্টারের আকাশসীমা লঙ্ঘনই তার প্রমাণ ।কারণ তারা চায় রোহিঙ্গা মুক্ত মিয়ানমার ।রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়ার দাবী উচ্চকিত হোক সেটা তারা চায় না ।বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সংঘাত বেঁধে গেলে রোহিঙ্গা ইস্যু ভিন্নখাতে প্রবাহিত হতে পারে ।তখন আর তাদের ফেরৎ নেয়ার প্রশ্নটা আসতে পারবেনা।

বাংলাদেশের রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানকে ধন্যবাদ দিচ্ছে জাতিসংঘ ।কিন্তু রোহিঙ্গাদের কেন্দ্র করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও শান্তিশৃংখলা বিনষ্ট হলে বাংলাদেশের জন্য কী ভূমিকা রাখতে পারবে জাতি সংঘ ?তখন হয়তো তারা নিন্দা জানাবে আর নিন্দনীয় কর্মকাণ্ডের ভয়ারণ্য হয়ে উঠবে বাংলাদেশ ।রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবতা প্রদর্শন তখন কুফল হয়ে কেড়ে নেবে আমাদের মানবিক শান্তি, শৃংখলা ও স্থিতিশীলতা ।আমরা কি এমনই একটি বিপদসঙ্কুল উত্তপ্ত সময়ের দিকে ছুটছিনা ?

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে