আপডেট : ২৮ মার্চ, ২০১৬ ২১:৪৪

‘লালন ছড়িয়ে যাবে বিশ্বজুড়ে’

অনলাইন ডেস্ক
‘লালন ছড়িয়ে যাবে বিশ্বজুড়ে’

‘লালন ফকিরের সাধনা’ বিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে এসেছিলেন ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার মুচকুন্দ দুবে। ধানমন্ডির বেঙ্গল গ্যালারিতে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেছিল দৈনিক প্রথম আলো। পড়ন্ত বিকেলের এই অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় দুবে বলেন, ‘ভারতের লালনকে প্রয়োজন, ভারতের বৈচিত্র্যে বিভক্ত সমাজ লালনের জন্য অপেক্ষা করছে। বাংলাদেশে লালন যেমন জাগ্রত, সেভাবে ভারতে এমনকি বিশ্বেও লালন ছড়িয়ে পড়বেন বলে আমি বিশ্বাস করি। লালন হিন্দি ভাষায় অনূদিত হয়ে ছড়িয়ে যাবেন, এটাই এখন আমার ইচ্ছা।’

জাঁদরেল কূটনীতিক, বর্ষীয়ান অধ্যাপক ও লেখক দুবে লালনের ১০০ গানের হিন্দি অনুবাদ প্রকাশের কাজ হাতে নিয়েছেন। এ উপলক্ষেই এবার এসেছেন বাংলাদেশে। ‘আমি চাই লালন বাংলাদেশে যেভাবে পুনর্জীবিত হয়েছেন, সেভাবে ভারতে ও বিশ্বে তাঁর শ্রোতার সংখ্যা অনেক গুণ বাড়ুক।’ এই আকাঙ্ক্ষা দুবের। হিন্দি ভাষায় প্রথমবারের মতো লালনের গান অনূদিত হচ্ছে দুবের মাধ্যমে। পারস্যের কবি জালালউদ্দিন রুমির মতো লালনও পাশ্চাত্যে কেন জনপ্রিয় নন—এই বলে আক্ষেপ প্রকাশ করলেন ভারতীয় এই কূটনীতিক। তাঁর কথায়, ফকির লালন বিশ্বে নন্দিত হচ্ছেন, এই স্বপ্ন আমি লালন করে চলেছি।

আয়োজনের শুরুতেই লালনের দুটি দৈন্য গান পরিবেশন করেন ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ির বাউল আবদুর রহমান। এরপরই বক্তৃতা করেন মুচকুন্দ দুবে। আধা ঘণ্টার বক্তৃতায় তিনি বলেন, অবিভক্ত ভারতের সাধু-কবিদের শ্রেষ্ঠদের মধ্যে অন্যতম লালন। তিনি এক মহান সমাজসংস্কারক। বিভিন্ন ধর্মের ঐতিহ্যের মূল বাণী খুবই সরল ভাষায় প্রকাশ করেছেন লালন। আর তা মানুষের মনে অক্ষয় দাগ রেখে গেছে। কেন হিন্দিভাষীরা এই মহামানবের অপূর্ব বাণী থেকে বঞ্চিত হবে? লালনের গানের মানবতাবাদী আবেদনের কথা উল্লেখ করে তিনি জোর দিয়ে বলেন, লালন জাত-পাত, বর্ণ-সম্প্রদায়, উচ্চ-নীচ ভেদাভেদ মানতেন না। আজকের পৃথিবীতে তিনি বিপুলভাবেই প্রাসঙ্গিক। লালনের মর্মবাণী বিষয়ে তিনি বলেন, মানব প্রজাতি যে এক, আমাদের নিজ নিজ দীনতা বিষয়ে সচেতন হওয়া যে উচিত, লালনের এ ধরনের বার্তার জন্য আজকের দুনিয়া আকুল। পৃথিবী এ কথা শুনতে চায়।

সুফি-কবিদের মধ্যে কবি হিসেবে লালনের মহত্ত্বের ওপর খুবই কম মনোযোগ দেওয়া হয়েছে দাবি করে দুবে আরও বলেন, সাহিত্যিক মূল্য ও সৃষ্টিশীল ভাবের সরল ও গভীর প্রকাশের অপার ক্ষমতা দেখিয়েছেন লালন। খুবই গভীর দর্শন তিনি যে সারল্যে প্রকাশ করেছেন, তা অনন্য। নিরক্ষর হলেও তিনি তাঁর সময়ের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীদের একজন। তিনি তাঁর জনগণের মুখের ভাষা, মাটির ভাষাকে রত্নের মতো সুন্দর ও অমূল্য করে তুলেছেন।

লালনের গানের হিন্দি অনুবাদে তাঁর লক্ষ্য, বাংলা ভাষায় যেমন এর সুরেলা আবেদন প্রকাশিত হয়, হিন্দিতেও যাতে তা থাকে। এ জন্য ভাবানুবাদের চেয়ে সাহিত্যিক অনুবাদের পদ্ধতি নিয়েছেন বলে জানালেন দুবে। তাঁর বাছাই করা ১০০ লালনগীতির অনুবাদ দিয়ে তিনি হিন্দি ভাষায় লালনের পূর্ণ পরিচয় তুলে ধরতে চান।

তাঁর মুখ থেকেই জানা গেল, এ বছরের মাঝামাঝি লালনের অনুবাদ ও ভূমিকা রচনা শেষ করার পর দুবে হাত দেবেন বাংলাদেশের কবি শামসুর রাহমানের কবিতার হিন্দি অনুবাদ প্রকাশে। ইতিমধ্যে এই কবির  ৩০-৪০টির মতো কবিতা তিনি অনুবাদও করে রেখেছেন।

প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফের সঞ্চালনায় এই অনুষ্ঠানে আরও বক্তৃতা করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান এবং লালন গবেষক অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী। লোকসংস্কৃতি বিশারদ শামসুজ্জামান খান বলেন, ‘এশিয়ার সুফিবাদী কবিদের ধারা তুরস্কের আনাতোলিয়া থেকে আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতে বিস্তৃত হয়েছে। বাংলাদেশে লালনের মধ্যে এই মরমি লোকবাদী ধারা উৎকর্ষ হয়েছে গভীরভাবে। যখন উনিশ শতকের আধুনিকতা ও নবজাগরণ কলকাতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, তখন লালনের মতো লোকসাধকেরা গ্রামাঞ্চলে মানবতার জাগরণ ঘটাচ্ছিলেন।’ মুচকুন্দে দুবের অনুবাদ কাজের প্রশংসা করে তিনি এর সাফল্য কামনা করেন।

আবুল আহসান চৌধুরী বলেন, ‘লালন বিশ্বময় হয়ে পড়েছেন।’ তিনি বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার খ্যাতিমান লালন গবেষকদের কাজের বিবরণ দিয়ে আরও বলেন, ‘অন্য অনেক মনীষীর মতো মুচকুন্দ দুবে যে লালনের টানে বাংলাদেশে আবার এসেছেন, এটাই লালনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রমাণ।’

উপরে