আপডেট : ২৪ মার্চ, ২০১৬ ১৪:৫২

‘সুলতান পদক ২০১৬ ’ পেলেন চিত্রশিল্পী আব্দুল মান্নান

বিডিটাইমস ডেস্ক
‘সুলতান পদক ২০১৬ ’ পেলেন চিত্রশিল্পী আব্দুল মান্নান

‘আলো যখন কমে আসে, আকাশ আর মাটি তখন একাকার হয়ে যায়। নদীপাড়ে দূরদিগন্তের হাতছানিকে মনে হয় মেঘের মায়া। এই মেঘের কত বিচিত্র রূপ! তার রূপে মুগ্ধ শিল্পী আব্দুল মান্নান নিজ ক্যানভাসে সাজিয়েছেন কত-না মেঘের ভেলা। তাঁর সবচেয়ে বড় মুনশিয়ানা এই ল্যান্ডস্কেইপ পেইন্টিং, যেক্ষেত্রে তিনি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা কারিগর। বাংলাদেশের শিল্পীরা নিসর্গকেন্দ্রিক ছবি বেশি আঁকেন। আমাদের প্রকৃতির রূপের ঐশ্বর্য এমন, তাঁকে উপেক্ষা করা যায় না। সে অনিবার্যভাবে চলে আসে শিল্পীর চিত্রপটে রঙের দ্যোতনায়, রেখার স্ফূর্তিতে। তবে বেশি সংখ্যক শিল্পী প্রকৃতিকে পাঠ করে তাঁকে বাঁধেন প্রকাশবাদী বিমূর্ততায়। প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধ তাতে থাকে বটে, তবে বস্তুরূপ থাকে না।’ চিত্রশিল্পী আব্দুন সম্পর্ক এমনই জানালেন নড়াইলের জেলা প্রশাসক ও এস এম সুলতান ফাউন্ডেশন সভাপতি  মো: হেলাল মাহমুদ শরীফ।

শিল্পী আব্দুল মান্নান প্রকৃতির প্রেমে আকুল হয়ে তার রূপ-রস প্রায় বাস্তবানুগভাবে তুলে ধরেছেন দর্শকদের জন্য। এই নদী মেঘলা প্রকৃতি আর আকাশে মেঘের ঘনঘটার রূপ-প্রাচুর্য সেই দূর শৈশবেই শিল্পীর মনে ঢুকে পড়েছে। তাঁর জন্মই তো নদীঘেরা বরিশালের গৌরনদীতে ১৯ জানুয়ারি ১৯৪৭ সালে। পড়াশুনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে।

আশৈশব তিনি দেখেছেন নদী ও নিসর্গের বদলে যাওয়া। বর্ষার নদী বন্ধনহীন রুদ্র, শীতের নদী যেন শান্ত স্নিগ্ধ আঁকাবাঁকা এক শাড়ির আঁচল। ঋতু বদলের সঙ্গে বদলে যায় আকাশ, বদলে যায় মেঘের অবয়ব। নিসর্গের এই বদলে যাওয়া রূপের মুগ্ধ পাঠক জনাব মান্নান চিত্রপটে রঙের মায়ায় নিজের হৃদয় নিংড়ে করেছেন নিসর্গবন্দনা, আর মেঘের সঙ্গে মিতালি। তাঁর আঁকাশ যেন উবু হয়ে নদী ও দিগন্তকে ছোট করে আনে। ভূদৃশ্য আঁকার এই ধরণ তো আজকের নয়। তবু এর পুনরাবৃত্তি বারবার হলেও আমাদের ভালো লাগে। তিনি আমাদের এই ভাললাগাকে গুরুত্ব দিয়েছেন, আমাদের মনকে রাঙিয়েছেন তাঁর অনুভূতির বিচিত্র বর্ণিল রঙে।

নগর জীবনের বাঁধাধরা ছকের ভেতর অকস্মাৎ যদি আমাদের শৈশবের নদী ও মেঘ হুড়মুড় করে চলে আসে, এমনকি শিল্পীর তুলিতেও যদি সে রূপের দেখা পেয়ে যাই, তাঁর হৃদয়কে উদ্বেলিত, আকুল করে। শিল্পী মান্নানের কাজগুলো দর্শক হৃদয়ে সেই ভালোবাসার স্মৃতিতাড়না যুগপৎ উসকে দেয় ও নিবৃত্তি ঘটায়।

শিল্পী এস,এম, সুলতানের আঁকা চিত্র হচ্ছে গ্রাম বাংলার প্রতিচিত্র। গ্রাম বাংলার মানুষের সঠিকভাব এবং হৃদস্পন্দনকে নিজের সৃষ্টি নির্মাণে একীভূত করেছেন শিল্পী সুলতান। তিনি বাংলার কৃষককে প্রকাশ করেছেন নিজের সৃষ্টিতে । তিনি বেশ কিছু নৈসর্গিক ছবিও এঁকেছেন। ব্রিটিশ ভূদৃশ্যশিল্পী যোসেফ টার্নারের আঁকা অসাধারণ ভূচিত্র আমাদের মনে আঁচড় কাটে। মেঘের নানা দোলাচল তাঁর চিত্রকর্মে। সেই অভিজ্ঞতা জনাব মান্নান গ্রহণ করেছেন ঠিকই, তবে তাঁর তুলিতে আমাদের বাংলার আকাশের মেঘ হয়েছে আরও ভারী ও জলবতী, একেবারে আলাদা, স্বকীয়তায় ভাস্বর।

ভারী বাতাসের দিগ্বিদিক উড়ালের অনুভব আমরা পেয়ে যাই কোনো কোনো চিত্রকর্মে। সিডরের আগ্রাসী রূপও তুলে ধরেছেন সংক্ষুব্ধ মেঘ আর নদীর ঢেউয়ের আক্রোশে। তবে নদী ও মেঘের আপাত প্রশান্ত রূপটিই যেন শিল্পীকে বেশি টানে। দিঘল নীল আকাশের তলে সাদা মেঘাবৃত প্রায়-বিলীয়মান দিগন্তে নৌকার আভাস, সাদা কাশফুলের বনে বাতাসের বেগ যেন শরৎ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের গানকেই মনে করিয়ে দেয়। ভূদৃশ্য ছাড়াও আব্দুল মান্নান প্রতিকৃতি শিল্পী হিসেবে আমাদের চেনা। মানুষের প্রতিকৃতি সৃষ্টির ক্ষেত্রে তিনি মনোযোগ দেন ব্যক্তির অবয়ব, রং আর অভিব্যক্তির প্রতি। শিল্পী আব্দুল মান্নান যখন ছবি আঁকেন, তখনো রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভরসা। শিল্পী নিজেই বলছেন, বরীন্দ্রনাথ তাঁর ধ্যান, সাধনা। তিনিই প্রথম একসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের শতাধিক পোরট্রেট এঁকেছেন। 'শিল্পী আব্দুল মান্নানের শিল্প সাধনায় কেন্দ্রে রবীন্দ্রনাথ, বাইরেও রবীন্দ্রনাথ। তিনি যখন মেঘের ছবি আঁকেন, আকাশের বিশালতার কথা ভাবেন, তখনও তাঁর ক্যানভাসে ভর করেন রবীন্দ্রনাথ। ফলে তাঁর রংতুলিও হয়ে ওঠে মেঘলা। তাতে থাকে রবীন্দ্রনাথের সুরসুধা।

১৯৯৩ সালে প্রথম একক প্রদর্শনী ‍“রবীন্দ্র প্রতিকৃতি” কিংবা ২০১০ সালে “মেঘের পরে মেঘ” ২য় একক প্রদর্শনীও কিন্তু রবীন্দ্র কেন্দ্রীক। প্রদর্শনীতে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে বাস্তবধর্মী নিখুঁত আলো-ছায়ার প্রয়োগে কবিগুরুর অভিব্যক্তি স্পষ্ট হয়েছে। জনাব মান্নান অসামান্য শৈল্পিক দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। অন্যদিকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ওপর আঁকা তাঁর প্রতিকৃতিগুলো যেন রক্তমাংস নিয়ে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এছাড়াও সেট ডিজাইনিং-এ অসাধারণ কৃতিত্ব রয়েছে যা তাঁর বহুমুখি প্রতিভার অনন্য নিদর্শন। সুলতান ফাউন্ডেশন এই গুণী শিল্পীর হাতে তাঁর কাজের স্বীকৃতি স্বরপ সুলতান পদক ২০১৬ প্রদান করতে পেরে ধন্য এবং গর্বিত। তাঁর কাজের বিশালতার কাছে এ পুরস্কার নিতান্তই ক্ষুত্র। তাঁর শিল্পীজীবন আরও দীর্ঘ, বর্ণাঢ্য ও কর্মময় হোক, তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি বেঁচে থাকুন অনন্তকাল - এই কামনা করি।

গুণী এই চিত্রশিল্পীকে সুলতান পদক পাওয়ায় খুবই আনন্দিত বলে জানিয়েছেন

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জেডএম

 

উপরে