আপডেট : ২০ মে, ২০১৮ ১১:৫২

দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদানকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশ

অনলাইন ডেস্ক
দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদানকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশ

দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদানকারী ২০ দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ।

সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ট্র্যাকিং এসডিজি ৭’ এর ‘দি এনার্জি প্রোগ্রেস রিপোর্ট ২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সাত বছরে বাংলাদেশে বিদ্যুতের আওতায় আসা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। এ সময়ে বিদ্যুতের গ্রাহক বেড়েছে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে তিন শতাংশ হারে, যা আগের যে কোন সময়ের তুলনায় সবচেয়ে বেশি। এতে বিশ্বে দ্রুত বিদ্যুত সংযোগ প্রদানকারী শীর্ষ ২০টি দেশের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম।
অর্থাৎ গত সাত বছরে দেশের প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষের পরিবার প্রথমবারের মতো বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালের শেষে দেশের ৭৬ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে প্রতিবেদনটি প্রণয়ন করেছে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ), ইন্টারন্যাশনাল রিনিউয়েবল এনার্জি এজেন্সি, ইউনাইটেড ন্যাশনস স্ট্যাটিসটিকস ডিভিশন ও ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গাইনেজশন। ২০১৬ সালের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রণয়ন করা হয়েছে।

তবে বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনটি অনেক পুরনো তথ্যের ভিত্তিতে করা। বিদ্যুত পরিস্থিতি নিয়ে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) একটি জরিপ পরিচালনা করে। গত ২২ জানুয়ারি প্রকাশিত সেই জরিপে দাবি করা হয়েছে, বর্তমানে দেশের ৯০ ভাগ মানুষের ঘরে বিদ্যুতের সংযোগ রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, তারা ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে নতুন এক কোটি ৭৯ লাখ গ্রাহককে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েছে। ২০০৯ সালে সারাদেশে এক কোটি ৮ লাখ গ্রাহক বিদ্যুৎ পেত, যা ২০১৮ সালে এসে বেড়ে দুই কোটি ৮৭ লাখে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে, নির্ভরযোগ্য, টেকসই আধুনিক জ্বালানির যে বৈশ্বিক লক্ষ্য এসডিজি-৭ এ নির্ধারণ করা হয়েছে, তা পূরণের পথে বর্তমান বিশ্বের অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়। এসডিজি-৭ এর অধীনে চারটি টার্গেট রয়েছে। এগুলো হলো: ১. সবার জন্য বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করা ২. রান্নার জন্য অপ্রচলিত (খড়, শুকনো পাতা, কাঠ ইত্যাদি) জ্বালানির পরিবর্তে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো ৩. একই খরচে জ্বালানি সক্ষমতা বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা এবং ৪. নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। প্রতিবেদন বলছে, বৈশ্বিকভাবে পিছিয়ে থাকলেও বেশকিছু দেশ এসব টার্গেটের কোন কোনটি পূরণে ভাল অগ্রগতি দেখাচ্ছে। বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম।

অফ-গ্রিড বিদ্যুৎ সংযোগে তথা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল দেশের প্রায় ৯ শতাংশ মানুষ, বিশ্বে যা সর্বোচ্চ। এরপর রয়েছে মঙ্গোলিয়া ও নেপাল। দেশ দুটির যথাক্রমে আট ও ছয় শতাংশ জনগোষ্ঠী এ বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। তবে রান্নার কাজে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহারে অনেক পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সাত বছরে গড়ে এক শতাংশেরও কম হারে বেড়েছে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার। এতে ২০১৬ সাল শেষে মাত্র ১৮ শতাংশ তথা প্রায় চার কোটি মানুষ পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহার করত। আর ১৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ অপ্রচলিত জ্বালানি রান্নার কাজে ব্যবহার করছে, যা বিশ্বে চতুর্থ। এ তালিকায় বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে ভারত। দেশটির ৭৮ কোটি ১০ লাখ মানুষ অপ্রচলিত জ্বালানি রান্নার কাজে ব্যবহার করছে। তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীনের ৫৭ কোটি ২০ লাখ ও তৃতীয় অবস্থানে থাকা নাইজেরিয়ার ১৭ কোটি ৭০ লাখ মানুষ অপ্রচলিত জ্বালানি রান্নার কাজে ব্যবহার করছে। আর পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান। দেশটির ১১ কোটি মানুষ অপ্রচলিত জ্বালানি রান্নার কাজে ব্যবহার করছে।

প্রতিবেদন মতে, ২০০৫ সালে বাংলাদেশের ৬ কোটি ৩৪ লাখ বিদ্যুৎ সুবিধা পেতেন। পরবর্তী ১১ বছরে এই সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে, যা প্রায় ১২ কোটি ৩৭ লাখ। এর মধ্যে ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল অর্থাৎ আট বছরে বিদ্যুতের আওতায় এসেছেন চার কোটি ৩০ লাখ মানুষ। এর আগের আট বছরে (২০০২ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত) এই সংখ্যা ছিল দুই কোটি ৯৭ লাখ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক দশকে শহরাঞ্চলের মানুষের বিদ্যুতের আওতায় আসার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৬ সালে শহরাঞ্চলের ৯৪ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছেন। ২০০৫ সালে এ হার ছিল ৫০ শতাংশের কাছাকাছি। তখন শহরের ৩ কোটি ১৭ লাখ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পেতেন, এই সংখ্যা ২০১৬ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৩৬ লাখে। একই সময়ে বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়া গ্রামের মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০০৫ সালে তিন কোটি ১৬ লাখ গ্রামীণ জনগোষ্ঠী বিদ্যুৎ সুবিধা পেতেন, যা ছিল মোট গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মাত্র ৩০ শতাংশ। ২০১৬ সালে এই সংখ্যা ও হার দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। এই সময়ে ৭ কোটিরও বেশি গ্রামীণ জনগোষ্ঠী বিদ্যুতের আওতায় এসেছেন, যা মোট গ্রামীণ জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ।
এদিকে দ্রুত বিদ্যুৎ সুবিধা প্রদানকারী দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে কসোভো। দেশটির শতভাগ জনগোষ্ঠী বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় রয়েছে। এ তালিকায় থাকা ভুটান ও কিরিবাটিও শতভাগ জনগোষ্ঠীকে বিদুতের আওতায় এনেছে। এসডিজি-৭ এর চারটি টার্গেট পূরণে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে ভাল অবস্থানে রয়েছে ভুটান। দেশটির শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আছে, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহার করছে ৩৩ শতাংশ মানুষ, ব্যবহৃত মোট বিদ্যুতের ৮৭ শতাংশই আসছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। মালদ্বীপের শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছেন।

অন্যদিকে প্রতিবেদন মতে বর্তমানে বিদ্যুৎ বঞ্চিত দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে কঙ্গো। দেশটির ছয় কোটি ৫২ লাখ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে রয়েছে। এছাড়া ইথিওপিয়ার পাঁচ কোটি ৮৫ লাখ, তানজানিয়ার তিন কোটি ৭৩ লাখ ও কেনিয়ার দুই কোটি ১১ লাখ মানুষ বিদ্যুত সুবিধাবঞ্চিত। এ হিসেবে বিদ্যুৎ সুবিধাবঞ্চিত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ৩ কোটি ৯২ লাখ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে ছিল।

২০২১ সালের মধ্যে শতভাগ মানুষকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে বিদ্যুত সুবিধা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা সেই লক্ষ্য অর্জনেরই প্রয়াস। আর এই লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশ সঠিক পথে আছে বলেই মনে করছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/রুমা

 

উপরে