আপডেট : ২৩ জানুয়ারী, ২০১৮ ২০:০৭

যেভাবে ঘুষের টাকা নিতেন নাসির-মোতালেবরা...

অনলাইন ডেস্ক
যেভাবে ঘুষের টাকা নিতেন নাসির-মোতালেবরা...

জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বন্ধ হয়ে যাওয়া লেকহেড গ্রামার স্কুলটি ঘুষের বিনিময়ে খুলে দেওয়ার চুক্তি হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) খালেদ হাসান মতিন ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে রাজি হন। তার সঙ্গে এই চুক্তি করেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গ্রহণ ও বিতরণ শাখার উচ্চমান সহকারী নাসিরউদ্দিন ও শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) মো. মোতালেব হোসেন।

জানা যায়, দফায় দফায় কয়েক কিস্তিতে ঘুষের টাকা সংগ্রহ করেন নাসিরউদ্দিন। সবশেষ লেকহেড স্কুলের এমডির কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা নিতে পেরেছেন তিনি। এই টাকার একটি অংশ পেতেন শিক্ষামন্ত্রীর পিও মোতালেব।

মামলার কাগজে উল্লেখ রয়েছে, লেকহেড গ্রামার স্কুলের এমডির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে তার প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত খুলে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করেন নাসিরউদ্দিন ও মোতালেব। এক্ষেত্রে আদালতের আদেশের শর্ত ভঙ্গ করেছেন তারা। এছাড়া মতিনের কাছে বেআইনিভাবে রাষ্ট্রীয় গোপন নথিপত্র হস্তান্তর করেছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওই দুই কর্মকর্তা।

ঘুষের চুক্তি ১৬ ডিসেম্বর

মামলার এজাহার অনুযায়ী, লেকহেড স্কুল খুলে দেওয়ার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে নাসিরউদ্দিন ও মোতালেবের সঙ্গে মতিনের চুক্তি হয় গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর। এজন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওই দুই কর্মকর্তা ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা ঘুষ চান। মূলত এর বিনিময়ে স্কুলটি দ্রুত আবারও চালুর বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হয়। মতিনের গাড়িতে চড়েই বনানীতে আরএম গ্রুপ অফিসে যান তারা। এ সময় স্কুলটির এমডি আর প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা আসিফ ইশতিয়াকও ছিলেন। ওই আলোচনাতেই অর্থের বিনিময়ে স্কুল খুলে দিতে সহায়তার চুক্তি করেন মোতালেব ও নাসির।

ঘুষের অঙ্ক ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা

লেকহেড স্কুলটি দ্রুত খুলে দেওয়ার কথা বলে এমডি মতিনের সঙ্গে ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার চুক্তি করেন মোতালেব ও নাসির। এই টাকা কয়েক ভাগে নেন তারা। একইসঙ্গে বেআইনিভাবে রাষ্ট্রীয় নথি হস্তান্তর করা হয় লেকহেড কর্তৃপক্ষের কাছে।

শেষ কিস্তির ঘুষ নিতে গিয়ে ধরা

চুক্তিমাফিক বনানীর আরএম গ্রুপের কার্যালয় থেকে ঘুষের ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকার মধ্যে তিন দফায় ৩ লাখ টাকা নেন নাসিরউদ্দিন। এর মধ্যে ১৮ ডিসেম্বর ৫০ হাজার টাকা, ২৫ ডিসেম্বর আরও ৫০ হাজার টাকা ও ১১ জানুয়ারি ২ লাখ টাকা লেনদেন হয়। এজাহার অনুযায়ী, নগদ ৩ লাখ টাকা থেকে একটি অংশ পান মোতালেবও।

চুক্তি অনুযায়ী শেষ কিস্তির ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা নিতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হন নাসিরউদ্দিন। ওইদিনের বিবরণ দিয়ে এজাহারে জানানো হয়, পুলিশ আগেভাগে জানতে পারে, চুক্তির পাওনা ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা লেনদেন হবে বনানী এলাকায়। তাই সোমবার (২২ জানুয়ারি) বিকাল ৪টায় বনানী ডি-ব্লকের রোড নম্বর ১৩/১৫’র ৩৯ নম্বর বাড়ির (আসামি মতিনের অফিস) সামনের সড়কে ওঁৎ পেতে থাকে পুলিশ। তাদের নেতৃত্ব দেন ধানমন্ডি জোনাল টিমের সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. রবিউল আলম। বিকাল ৫টার দিকে এক নম্বর আসামি নাসিরউদ্দিন ওই অফিস থেকে উৎকোচের টাকা নিয়ে বের হন। এ সময় তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ঘুষ নেওয়ার কথা স্বীকার করেন নাসির।

এর আগে গত ২১ জানুয়ারি শিক্ষামন্ত্রীর পিও মোতালেব হোসেন ও লেকহেড গ্রামার স্কুলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খালেদ হাসান মতিনকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গুলশান ও বসিলা এলাকা থেকে ধরার  পর তাদের গ্রেফতার দেখানো হয়।

এদিকে তিন আসামির জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার (২৩ জানুয়ারি) বিকাল ৪টা ৫০ মিনিটে উভয় পক্ষের শুনানি শেষে এ আদেশ দেন ঢাকা মহানগর হাকিম জিয়ারুল ইসলাম।

জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গত বছরের ৫ নভেম্বর ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান লেকহেড গ্রামার স্কুলের গুলশান ও ধানমন্ডির দুটি শাখা বন্ধের নির্দেশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ। প্রতিষ্ঠানটি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না থাকা এবং ধর্মীয় উগ্রবাদ, উগ্রবাদী সংগঠন সৃষ্টি, জঙ্গি কার্যক্রমের পৃষ্ঠপোষকতাসহ স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়। এর দুই দিন পর ৭ নভেম্বর ঢাকা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইলিয়াস মেহেদী স্কুলটির দুটি শাখা বন্ধ করে দেন।

গত বছরের ৯ নভেম্বর লেকহেড স্কুলের দুটি শাখা বন্ধের নোটিশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে স্কুলের মালিক খালেদ হাসান মতিন ও ১২ জন শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের পক্ষে দুটি রিট দায়ের করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্কুলটি খুলে দেওয়ার আদেশ দেন সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু পরে আবারও তা স্থগিত করে দেন হাইকোর্ট।

গত ১২ জানুয়ারি ঢাকা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয় থেকে কর্তব্যরত ম্যাজিস্ট্রেট স্কুলটি খুলে দেন। এর পরদিন ১৩ জানুয়ারি থেকেই স্কুলটি খোলা রাখা হয়।

 বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে