আপডেট : ২৪ মার্চ, ২০১৬ ০৯:২৪

ভোটের পর ব্যাপক সহিংসতা

আরো ৩ জন নিহত, আহত সহস্রাধিক, বাড়ি-ঘরে হামলা ভাঙচুর লুটপাট, সংখ্যালঘুরা আতঙ্কে
বিডিটাইমস ডেস্ক
ভোটের পর ব্যাপক সহিংসতা
প্রথম দফার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পর সারাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় গত ২৪ ঘন্টায় কমপক্ষে তিন জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে সহস্রাধিক ব্যক্তি। মঙ্গলবার ভোটের দিন সংঘাত-সহিংসতায় নিহত হয়েছিল ১০ জন। এর আগে নির্বাচনী প্রচারণাকালে সংঘর্ষে  নিহত হয় আরো দশ জন। এ নিয়ে প্রথম ধাপের ইউপি নির্বাচনে ঝরে পড়লো ২৩টি তাজা প্রাণ ।
 
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নির্বাচনের পর ব্যাপক সহিংসতার খবর পাঠিয়েছেন ইত্তেফাক প্রতিনিধিরা। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে প্রতিপক্ষের হামলায় এক বৃদ্ধা নিহত হয়েছেন। এছাড়া বগুড়ায় সহিংসতায় আওয়ামী লীগ নেতা ও চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে এক যুবলীগ নেতা নিহত হয়েছেন।
 
বহু স্থানে পরাজিত ও বিজয়ী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। এক পক্ষ আরেক পক্ষের দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়ি-ঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করেছে। দেশের তৃণমূল পর্যায়ে এ সংঘর্ষের কারণে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো আহতদের চিকিত্সা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। সন্ত্রাসীদের হামলা থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকেরাও রেহাই পাচ্ছেন না।
 
বাগেরহাটের চিতলমারী, ফকিরহাট, বরিশালের বানারীপাড়াসহ বেশ কিছু স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকদের উপর হামলা হয়েছে। ভান্ডারিয়ায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সন্ত্রাসীরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকদের নানাভাবে হুমকি দিচ্ছে। আগৈলঝাড়ায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এখানে বিজয়ী প্রার্থীর সমর্থকরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কয়েকটি বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
 
রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ): উপজেলায় নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় ১ জন নিহত ও ২৪ জন আহত হয়েছে। জানা গেছে, উপজেলার ৬নং ধানগড়া ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের  জয়ানপুর গ্রামে পরাজিত প্রতিপক্ষ মেম্বার প্রার্থী সামিদুল ইসলাম (ফুটবল) ও তার সমর্থকরা ঐ ওয়ার্ডের বিজয়ী মেম্বার নবাব আলীর (বৈদ্যুতিক পাখা) বাড়িতে মঙ্গলবার রাতে হামলা চালায়। এসময় নবাব আলীর শ্বাশুড়ি বিধবা নওনাই বেওয়া (৬০) নিহত হন। আহত হয় অন্তত ৭ জন। নিহত বিধবার লাশ উদ্ধার করে সিরাজগঞ্জ মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ব্যাপারে পুলিশ বাদী হয়ে ইউডি মামলা করেছে।
 
একই ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের নলছিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে  বিজয়ী মেম্বার প্রার্থী শরিফুল ইসলামের সমর্থকদের উপর মাহবুব আলমের (ফুটবল) সমর্থকরা হামলা চালালে ৫ জন আহত হয়। এদিকে উপজেলার সলঙ্গা থানার ৩নং ধুবিল ইউনিয়নের চৌধুরী ঘুঘাট কেন্দ্রে ভোট গণনা শেষে সন্ধ্যায় দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনায় পুলিশ লাঠিচার্জ ও ১০ রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এসময় আরো ৬ জন আহত হয়।
 
এছাড়া ৫নং চান্দাইকোনা ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের পরাজিত মেম্বার প্রার্থী পীর আজমল হোসেন (লাটিম) তার সমর্থকদের নিয়ে ঐ ওয়ার্ডের বিজয়ী মেম্বার জাহাঙ্গীর আলমের (মোরগ) চান্দাইকোনা হালদারপাড়া গ্রামের সমর্থক দরিদ্র হিন্দু জেলেদের মারপিট ও বাড়িঘরে হামলা করে। হামলায় ঐ গ্রামের ভ্যাবল হালদার, সন্তোষ হালদার, কুশীনাথ হালদার ও কৃষ্ণ চন্দ্র হালদার আহত হন। বাধা দিতে গিয়ে ইউনিয়ন সেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি মুকুল হোসেন ও ১নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধরণ সম্পাদক ফিরোজ আহমেদ পান্না গুরুতর আহত হন। হামলাকারীরা চান্দাইকোনা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সাইফুল ইসলামের চান্দাইকোনা বাজারস্থ বসতবাড়িতেও হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর করে। রায়গঞ্জ থানার ওসি রাশেদুল ইসলাম বিশ্বাস ও সলঙ্গা থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন।
 
বগুড়া: জেলার সারিয়াকান্দীতে ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হামলায় জবেদ আলী ভূঁইয়া (৪৫) নামের এক আওয়ামী লীগ নেতা নিহত হয়েছেন। তিনি বোহাইল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং চর শংকরপুর গ্রামের বাসিন্দা। মঙ্গলবার নির্বাচনী সহিংসতায় গুরুতর আহত হওয়ার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় বুধবার ভোরে তিনি মারা যান।
 
সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম): উপজেলায় আওয়ামী লীগের এক প্রার্থীর নির্বাচনী উঠান বৈঠক শেষে বাড়ি ফেরার পথে সন্ত্রাসী হামলায় যুবলীগ নেতা নিয়াজ উদ্দীন নয়ন (২৮) নিহত হয়েছেন।  মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে  বারৈয়ারঢালা ইউনিয়নের মহালঙ্গা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ১০-১৫ জন সন্ত্রাসী  ধারালো অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়ে এলোপাতারী কুপিয়ে তাকে গুরুতর জখম করে। পরে  আশংকাজনক অবস্থায় তাকে চমেক হাসপাতালে পাঠালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় রাত রাত সাড়ে ১০টার দিকে নয়ন মারা যান। নিহত নয়ন বারৈয়ারঢালা ইউনিয়ন যুবলীগের সদস্য ও একই ইউনিয়নের মহালঙ্গা গ্রামের সালেহ আহমদের পুত্র।  সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইফতেখার হাসান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন।
 
বরিশাল:  ইউপি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার পর রাতে ও গতকাল বুধবার গৌরনদী, আগৈলঝাড়া, উজিরপুরসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাংচুর , অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। বেশীর ভাগ হামলার ঘটনা ঘটেছে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি-ঘরে। এ সব হামলায় নারীসহ ৩৫ জনের বেশী আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে বেশীর ভাগই সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্য। হামলা ছাড়াও সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকার ভোটারদের দেশ ত্যাগের হুমকিও দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
 
বানারীপাড়া(বরিশাল): ইউপি নির্বাচনের দিন ও নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় উপজেলায় এ পর্যন্ত নারীসহ শতাধিক আহত হয়েছে। আহতরা বানারীপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও  বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
 
কলাপাড়া (পটুয়াখালী): উপজেলার চাকামইয়া ইউনিয়নের আনিপাড়া  ও নীলগঞ্জের কুমিরমারা গ্রামে নির্বাচনোত্তর সংঘর্ষে ৬০ জন আহত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ জনকে কলাপাড়া হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় ৯ জনকে বরিশাল পাঠানো হয়েছে। বুধবার বেলা ১১ টা থেকে দুপুর পর্যন্ত এ হামলা-তান্ডবের ঘটনা ঘটে। পুলিশ এ ঘটনায় অন্তত ছয় জনকে আটক করেছে।
 
বাগেরহাট: কচুয়া উপজেলার মঘিয়া ইউনিয়নে প্রতিদ্বন্দ্বি দুই সদস্যপ্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় মুন্না ব্যাপারী (১৬) নামে এক স্কুলছাত্র গুলিবিদ্ধ হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে ইউনিয়নের চর সোনাকুড় প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট গণনার সময় কেন্দ্রের বাইরে এ ঘটনা ঘটে। মুন্নাকে বাগেরহাট হাসপাতাল থেকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এদিকে বাগেরহাট সদর উপজেলার বারুইপাড়া ইউনিয়নের কাফুরপুরা গ্রামে পৃথক নির্বাচনী সংঘর্ষে তিন নারীসহ দশ জন আহত হয়েছেন।
 
ফকিরহাট(বাগেরহাট): ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় উপজেলার ৪টি ইউপিতে বিজয়ী ও পরাজিত  মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় সংর্ঘষে ২১জন আহত হয়েছে। আহতরা ফকিরহাট ও খুমেক হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রয়েছেন।
 
পিরোজপুর: ভিটাবাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে সংখ্যালঘুরা কেউ ঘর ছাড়া, কেউ আতঙ্ককে ঘরে লুকিয়ে আছেন। দক্ষিণ ভিটাবাড়িয়ার মুক্তিযোদ্ধা নাথুরাম দত্ত, গুচ্ছগ্রামের শ্যামল, উত্তর শিয়ালকাঠির মনি এদবর, মিঠু চক্রবর্তী, কাপালির হাটের ফার্মেসী মালিক প্রতাপ মজুমদার সন্ত্রাসীদের ভয়ে আত্মগোপন করে আছেন। কাপালির হাটে গতকাল বেলা ১১টার দিকে ওই ইউনিয়নের বিজয়ী মহিলা সদস্য কুরছিয়া বেগমের স্বামী  ইউনিয়ন যুব সংহতির সভাপতি রবিউল ইসলাম সরদারকে বেদম মারধর করা হয়।
 
বরগুনা (উত্তর): ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায়  জেলায়  কমপক্ষে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছে।  বিভিন্ন এলকায় হামলা ও ভাঙচুর করে বিজয়ী প্রার্থীর কর্মীরা। আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
 
পাথরঘাটা(বরগুনা):পাথরঘাটা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই মেম্বার প্রার্থীর  লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষে ৪২ জন আহত হয়েছে। ৩টি বাড়িতে আগুনসহ ২৭টি বাড়িতে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
 
ডুমুরিয়া (খুলনা): নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় উপজেলার শরাফপুর ইউনিয়নের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী অধ্যক্ষ নুর উদ্দিন আল মাসুদ পরাজিত হওয়ার পর শরাফপুর, ভূলবাড়িয়া, আকড়া, সেনপাড়া, আসাননগর, শোভনা ইউনিয়নের গাবতলা, মাগুরখালী ইউনিয়নের খোরেরাবাদ গ্রামে হামলা-হুমকিতে অনেকেই গ্রাম ছেড়ে দূরে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।
সূত্র-ইত্তেফাক
 
বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জেডএম
উপরে