আপডেট : ২৩ মার্চ, ২০১৬ ০৯:১৭
সাতক্ষীরায় পুলিশের গুলিতে আহত ২, শত শত ভোট কেন্দ্র ছিল আ’লীগের দখলে

ভোররাতে নৌকায় ১৫শ’ ভোট!

বিডিটাইমস ডেস্ক
ভোররাতে নৌকায় ১৫শ’ ভোট!

‘তখন ভোর সাড়ে ৩টা কি ৪টা। বাইরে একের পর এক বোমার বিস্ফোরণ। কিছুক্ষণ পরই কেন্দ্রের দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা দরজা খুলে দিতে বললেন। এরপর ওরা কেন্দ্রে ঢুকে নৌকায় অন্তত ১৫শ’ ভোট দিল। আমি ভয়ে আর কোনো কথাই বলতে পারিনি।’ সাতক্ষীরার আঞ্চলিক ভাষায় কথাগুলো বলেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের মাহমুদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মাহবুবুর রহমান। শুধু ওই কেন্দ্রেই নয়, আলীপুর ইউনিয়নের আরও ৩টি কেন্দ্রে একইভাবে প্রিসাইডিং অফিসারদের জিম্মি করে ব্যালট বাক্স বোঝাই করেন নৌকার প্রার্থী মহিউর রহমান ওরফে ময়ূর ডাক্তারের
সমর্থকরা। ভোররাতের এ ভোট ডাকাতিতে নেতৃত্ব দেন তার ছেলে সেলিম।

এদিকে জেলার ৭৮টি ইউনিয়নের ১৪টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হলেও শত শত ভোট কেন্দ্র ছিল আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের দখলে। অনেক কেন্দ্রে বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কোনো এজেন্টই ছিল না। এছাড়া ভোট জালিয়াতি, তাণ্ডব, এজেন্টদের বের করে দেয়া এবং মারধরের প্রতিবাদে অন্তত ৪ চেয়ারম্যান প্রার্থী ভোট বর্জন করেছেন।

ভোররাতের ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সাতক্ষীরা সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের গণিতের ইন্সট্রাকটর মাহবুবুর রহমান মঙ্গলবার দুপুরে যুগান্তরকে বলেন, ব্যালট পেপারসহ ভোট গ্রহণের যাবতীয় সরঞ্জাম নিয়ে শুয়ে-বসে কাটাচ্ছিলাম। রাত গভীর হওয়ার পর থেকেই কেন্দ্রের বাইরে বিকট শব্দে বোমা বিস্ফোরণে এলাকা প্রকম্পিত হয়। এরপর কিছুক্ষণ পরই দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা দরজা খুলতে বলেন।

তিনি বলেন, আমি দরজা খুলে দেই। এরপরই ওরা ১০-১২ জন ভেতরে ঢুকে ব্যালটে সিল মারতে শুরু করে। এভাবে প্রায় চার হাজার ভোটারের এ কেন্দ্রে অন্তত দেড় হাজার জাল ভোট দেয় তারা। ওই প্রিসাইডিং অফিসার আরও বলেন, শুধু নৌকা প্রতীকে নয়, মেম্বার প্রার্থীর পক্ষেও জাল ভোট দেয়া হয়। সকালে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে বিষয়টি জানানোর পর ভোট কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া হয়।

একই অভিযোগ করেন ওই ইউনিয়নের ভারুখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মোস্তাফিজুর রহমান। তিনিও সাতক্ষীরা সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পদার্থের ইন্সট্রাকটর। সাতক্ষীরায় পুলিশের গুলিতে আহত ২ * শত শত ভোট কেন্দ্র ছিল আ’লীগের দখলেতিনি বলেন, গভীর রাতে ভোট গ্রহণের আনুষঙ্গিক কাজ করছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দে কেন্দ্রের বাইরে অনেকগুলো হাত বোমার বিস্ফোরণ শুনতে পাই। এতে আমাদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, ব্যালট পেপারসহ যে কন্ট্রোল রুমে আমি ছিলাম সেখানে দরজায় ছিটকিনি ছিল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই ৮-১০ জন অপরিচিত লোক এসে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে নৌকায় ভোট দিয়ে বাক্স ভরে ফেলে। ২,৪৪৫ ভোটারের ওই কেন্দ্রে অন্তত ৬-৭শ’ জাল ভোট দিয়ে বাক্স বোঝাই করে ফেলে দুষ্কৃতকারীরা। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্যরা ভোট কেন্দ্র ও কন্ট্রোল রুম রক্ষায় এগিয়ে আসেনি বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্ট প্রিসাইডিং অফিসাররা।

একইভাবে আলীপুর চাপারডাঙ্গী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, আলীপুর পূর্ব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, গাংনিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা কেন্দ্র দখল করে জাল ভোট দেয়া হয়। মঙ্গলবার ভোর রাতের এই তাণ্ডবের পর দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেট কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দেন। সেখানে আর ভোট গ্রহণ করা হয়নি।

এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আলীপুর ইউনিয়নের মাহমুদপুর গ্রামের আবদুল মতলেবের। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, স্বাধীনতার পর এমন তাণ্ডব এ অঞ্চলে আর দেখিনি। বোমার বিকট শব্দে সাধারণ মানুষ ঘুমাতে পারেননি। বিষয়টি জানানো হলেও আইনশৃংখলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা কেউ এগিয়ে আসেননি। ভারুখালী গ্রামের যুবক সোহাগ বলেন, ভারুখালী কেন্দ্রে সকালে শত শত ভোটার লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু প্রিসাইডিং অফিসার ভোট গ্রহণের সুযোগ দেননি। কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ এসে ভোটারদের ছত্রভঙ্গ করে ব্যালট পেপারসহ বাক্স নিয়ে চলে যায়।

এ ছাড়া কলারোয়া উপজেলার কুশোডাঙ্গা ইউনিয়নের কলাটুপি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গভীর রাতে সশস্ত্র ক্যাডারদের নিয়ে ঢুকে পড়েন নৌকার প্রার্থী আসলামুল হক। তিনি প্রিসাইডিং অফিসারের কাছ থেকে ব্যালট পেপার নিয়ে নৌকায় সিল মেরে বাক্স বোঝাই করে চলে যান। ভোরে প্রিসাইডিং অফিসার গৌতম ঘোষ জেলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানালে ভোট কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া হয়।

পুলিশ সূত্র জানায়, মঙ্গলবার ভোর রাতে কুমিরা ইউনিয়নের ভাগবাহ ভোট কেন্দ্রে নৌকার প্রার্থীর পক্ষে ভোট কেন্দ্র দখল করতে যান স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস ও তার ছোট ভাই রুহুল আমিনসহ এক দল ক্যাডার। এ সময় তারা ভাগবাহ ভোট কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা প্রিসাইডিং অফিসারকে জিম্মি করে ব্যালট পেপার কেড়ে নিয়ে নৌকায় সিল মারতে শুরু করে। একপর্যায়ে তারা পুলিশের ওপর চড়াও হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ গুলি ছোড়ে। এতে রুহুল কুদ্দুছ ও রুহুল আমিন পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। তাদের সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ছাড়া তালা উপজেলার খলিলনগর ইউনিয়নের হরিশ্চন্দ্রকাটি কেন্দ্রে ভোট কারচুপিতে বাধা দেয়ায় চার আনসার সদস্যকে পিটিয়ে আহত করেছে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। আহতরা হলেন- মিরাজ, কামরুল, ফরিদা ও নারগিস।

জেলা রিটার্নিং অফিসার কামরুল হাসান জানিয়েছেন, জাল ভোট দেয়া, ব্যালট ছিনতাই এবং বিশৃংখলা সৃষ্টির অভিযোগে তালার ভাগবহা, দাদপুর ও অভয়তলা কেন্দ্র, সাতক্ষীরা সদরের মাহমুদপুর সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয়, গাংনিয়া, ভাড়–খালি ও আলীপুর, শ্যামনগরের জয়াখালি মহাজাবিন স্কুল, পূর্ব কৈখালি স্কুল এবং শৈলখালি মাদ্রাসা, কলারোয়ার কুশোডাঙ্গার কলাটুপি, শাকদাহ ও কেরালকাতার বলিয়ানপুর এবং দেবহাটার পারুলিয়া ইউনিয়নের খেজুরবাড়িয়া কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে।

শ্যামনগরের কৈখালির সরকারদলীয় প্রার্থী রেজাউল করিমের হাতে প্রহৃত হয়েছেন প্রিসাইডিং অফিসার লিয়াকত আলী। এ উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের চাঁদনিমুখা ছাড়া বাকি ৮টি কেন্দ্র দখল করে নেন সরকারদলীয় প্রার্থী গোলাম আযম টিটো। প্রার্থীরা অভিযোগ করেছেন, কালীগঞ্জের ধলবাড়িয়া এবং মৌতলা ইউনিয়নের বিভিন্ন কেন্দ্রে বেলা ১১টার পর থেকে শুধু সদস্য পদে দুটি করে ব্যালট ভোটারদের হাতে দেয়া হয়েছে। চেয়ারম্যানের ব্যালট আগেই শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে। আশাশুনির বুধহাটার কলেজিয়েট কেন্দ্র এবং প্রতাপনগরের ৭টি কেন্দ্র দখল করে নেয় সরকারদলীয় সন্ত্রাসীরা। কালীগঞ্জের বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের আনারস প্রতীকধারী স্বতন্ত্র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম অভিযোগ করে বলেন, নীলকণ্ঠপুর মাদ্রাসা, বন্দকাটী প্রাথমিক বিদ্যালয়, এলেমপুর ও বেজুয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র সরকারদলীয়রা জোর করে দখল করে নেয়। সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের বিএনপিদলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী আবদুর রউফ অভিযোগ করে বলেন, তার ইউনিয়নের বেশিরভাগ কেন্দ্রে জাল ভোট দিয়ে বাক্স ভর্তি করা হয়েছে। ভোটাররা চেয়ারম্যান পদে ভোট দিতে না পেরে ফিরে গেছেন।

কালীগঞ্জের তারালি ইউনিয়নের বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী শরীফ আবদুর রাজ্জাক জানিয়েছেন, তিনি ও তার এজেন্টরা জাল ভোটের প্রতিবাদ করতে গেলে অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন। এরা হলেন রাজু, সেলিম, এবাদুল, হাফিজুল, করিম, বাবু, শাহিন, আমির ও সাইফুল। তিনি বলেন, জাল ভোট দেয়ায় দুপুর ১২টার মধ্যে চেয়ারম্যানের ব্যালট শেষ যাওয়ায় ভোটাররা ভোট দিতে পারেননি। তিনি সংবাদ সম্মেলন করে এ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছেন। তালার জাতপুর কেন্দ্রে জাল ভোট দেয়ার সময় যুবলীগ কর্মী ফিরোজ বিশ্বাসকে গ্রেফতার করেও পুলিশ অজ্ঞাত কারণে ছেড়ে দিয়েছে। সোমবার মধ্যরাত থেকে আশাশুনির শ্রীউলার নাকতাড়া কালীবাড়ি কেন্দ্র দখলে নেয়ার চেষ্টা করেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবু হেনা শাকিল ও তার সমর্থকরা। এ সময় জাল ভোটের মজমা বসে। তালার খলিলনগর ইউনিয়নের হরিশচন্দ্রকাটী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সরকারদলীয় প্রার্থী প্রণব ঘোষ বাবলু তার বাহিনী নিয়ে ব্যালট হাতিয়ে নেন। এ দুটি কেন্দ্রে চেয়ারম্যানের ব্যালটে সিল মারেন তারা।

সূত্র-যুগান্তর

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জেডএম

 

উপরে