আপডেট : ২২ মার্চ, ২০১৬ ০৮:৫৯
ইউপি নির্বাচন

উৎকণ্ঠার মধ্যে ৭১৭ ইউপিতে ভোট শুরু

বিডিটাইমস ডেস্ক
উৎকণ্ঠার মধ্যে ৭১৭ ইউপিতে ভোট শুরু

প্রার্থীদের মধ্যে সহিংসতা-হানাহানি আর ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার পটভূমিতে আজ মঙ্গলবার শুরু হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) প্রথম ধাপের নির্বাচন। দেশে এবারই প্রথম স্থানীয় সরকারের সর্বনিম্ন স্তরের এই নির্বাচন হচ্ছে রাজনৈতিক দলের পরিচয় ও প্রতীকে। আজ দেশের ৭১৭টি ইউপিতে ভোট গ্রহণ করা হবে। সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত একটানা এই ভোট গ্রহণ চলবে।

এই নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণার পর থেকে গতকাল পর্যন্ত নির্বাচনী সহিংসতায় ১০ জন নিহত হয়েছেন। প্রার্থী, সমর্থকসহ আহত হয়েছেন প্রায় ২ হাজার। নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জমা পড়েছে প্রায় ৬০০। তবে এর প্রতিকার হয়েছে খুবই কম।
আজ যেসব ইউপিতে ভোট হবে, তার মধ্যে ৫৪টিতে চেয়ারম্যান পদের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়ার পথে। এঁরা সবাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনীত। একই পদে ১২১টি ইউপিতে বিএনপির কোনো প্রার্থী নেই। এ ছাড়া প্রথম ধাপের অন্তর্ভুক্ত টাঙ্গাইলের নাগরপুরের ১১টি ইউনিয়নে ভোট হবে আগামীকাল বুধবার এবং কক্সবাজারের টেকনাফের দুটি ইউনিয়নে হবে ২৭ মার্চ।
আওয়ামী লীগ-বিএনপি ছাড়াও এ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি, জাসদ, বিকল্পধারা, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় পার্টি-জেপি, বিএনএফ, সিপিবি, তরীকত ফেডারেশন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও ন্যাপ অংশ নিচ্ছে। আগামী জুনের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ছয় ধাপে দেশের ৪ হাজার ২৭৫টি ইউপিতে ভোট নেওয়া হবে।

নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা ও সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষায় প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে মোট ২০ সদস্যের বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। এর বাইরে পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), র্যাব, বিজিবি ও আনসারের সমন্বয়ে গড়া ভ্রাম্যমাণ ও অপেক্ষমাণ বাহিনী (স্ট্রাইকিং ফোর্স) এবং বিচারিক ও নির্বাহী হাকিমগণ দায়িত্ব পালন করবেন।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিব উদ্দীন আহমদ গতকাল সোমবার বিকেলে কমিশনের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পর্কে গণমাধ্যমকে অবহিত করেন। তিনি বলেন, নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশন সরকারের অন্যান্য বিভাগের ওপর নির্ভরশীল। তাদের ওপর কমিশনের কর্তৃত্বও কম। যে কারণে কমিশন সবার কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পায় না।

নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা দেওয়া, হানাহানি, সহিংসতা, কেন্দ্র দখল ইত্যাদি বিষয়ে সিইসি বলেন, দুঃখজনক হলো, এ দেশের নির্বাচন আগে থেকেই মারপিট ও খুনখারাবির চিত্র বহন করে আসছে। নির্বাচন অর্থকেন্দ্রিক হয়ে গেছে আগেই। যার শক্তি বেশি, সে নিজেকে যোগ্য প্রার্থী মনে করে। যে কারণে হানাহানি ও সহিংসতা থামছে না। এবার তা আগের চেয়ে কিছুটা বেশি হচ্ছে। কমিশন তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এই সংস্কৃতি বদলাতে সময় লাগবে।
সবাইকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে সিইসি বলেন, কেন্দ্রে বেশি ভোটার থাকলে সন্ত্রাসীরা সাহস কম পাবে। তিনি সব দল ও প্রার্থীর সহযোগিতা চেয়েছেন।

নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে কয়েকটি জেলা থেকে প্রতিনিধিরা জানাচ্ছেন সেখানকার খবর:
 

বরিশাল: ইউপি নির্বাচন ঘিরে বরিশালের প্রায় সর্বত্র শঙ্কার পরিবেশ বিরাজ করছে। সরকারি দলের নৌকা প্রতীক পাওয়া প্রার্থীরা ছাড়া অন্য সব প্রার্থী ও অধিকাংশ ভোটার সহিংসতার আশঙ্কা করছেন।

বিএনপির বরিশাল বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক মজিবর রহমান সরোয়ার, বানারীপাড়ার চাখার ইউপিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মজিবুল ইসলাম, বাবুগঞ্জের চাঁদপাশা ইউপিতে ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী আনিসুর রহমান, রহমতপুর ইউপিতে ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী শাহিন হোসেন প্রথম আলোর কাছে নির্বাচনে সহিংসতার আশঙ্কার কথা বলেছেন।
একই আশঙ্কা স্থানীয় প্রশাসনেরও। যে কারণে বরিশালের জেলা প্রশাসক অতিরিক্ত ১৫ প্লাটুন বিজিবি চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। গতকাল মন্ত্রণালয় তা অনুমোদন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিজিবি সদর দপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছে।

জেলা প্রশাসকের ওই চিঠিতে চারটি উপজেলা ও একটি থানার ২১টি ইউপির নামোল্লেখ করে বলা হয়, এসব ইউপিতে প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হতে পারে। ওই ইউপিগুলো হচ্ছে বাকেরগঞ্জের দাঁড়িয়াল, দুদল, ফরিদপুর, কবাই, নলুয়া, গাড়ুলিয়া, ভরপাশা ও নিয়ামতি; বানারীপাড়ার সৈয়দকাঠি, চাখার, বাইশারি ও বানারীপাড়া; বাবুগঞ্জের জাহাঙ্গীরনগর, কেদারপুর, দেহেরগতি ও রহমতপুর; মেহেন্দীগঞ্জের সদর, জাঙ্গালিয়া, দাড়িচর-খাজুরিয়া ও চানপুর এবং কাজীরহাট থানার ভাসানচর ইউপি।
 

সাতক্ষীরা: আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বেশ তৎপর। তবে তাঁদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে আছেন দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। জেলার ৭৮টি ইউপিতে নির্বাচন হচ্ছে। আওয়ামী লীগের ৭৮ জন প্রার্থীর বিপরীতে বিদ্রোহী প্রার্থী ৭৯ জন। এর মধ্যে দলের পদ-পদবিধারীর সংখ্যা ৫৮। যদিও স্থানীয়ভাবে তাঁদের বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু অনেক ইউপিতে তাঁদের অবস্থান বেশ শক্ত।
অন্যদিকে জামায়াতের ওপর ভর করে বিজয়ের আশা করছে বিএনপি। নীরব ভোটই তাঁদের ভরসা। একই কৌশলে সাতক্ষীরা সদর ও কলারোয়া পৌরসভার নির্বাচনেও বিএনপির প্রার্থীরা জয়ী হয়েছিলেন। এবারও তার পুনরাবৃত্তির আশা করছে বিএনপি। অবশ্য শ্যামনগর ছাড়া অন্য কোনো উপজেলায় প্রকাশ্যে বিএনপি-জামায়াত সমঝোতা হয়নি।
সাতক্ষীরায় বিএনপি প্রার্থী দিয়েছে ৬৮টি ইউপিতে, আর জামায়াত ১৮টিতে। কলারোয়ার সোনাবাড়িয়া ইউপিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।
 

ভোলা: ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হামলা-সংঘর্ষে একজন নিহত ও আরেকজন প্রার্থীর হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর ভোটারদের মধ্যে ভোটের দিনও সংঘাত-হানাহানির ভয় ঢুকেছে। অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা ভোট দিতে যাওয়ার ব্যাপারে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছেন। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় থেকে গতকাল পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে শতাধিক হামলা ও সংঘর্ষ হয়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভোটের আগের দিন বিএনপির একাধিক প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
এই পরিস্থিতিতে আজ জেলার সাতটি উপজেলার ৪১টি ইউপির নির্বাচনে ৪৮১টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচনী কর্মকর্তারা এর মধ্যে ৪৬৫টি কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছেন।
ঝালকাঠি: সহিংসতামুক্ত সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে সন্দিহান ঝালকাঠির চারটি উপজেলার ৩১টি ইউপির অধিকাংশ ভোটার। তাঁদের এই আশঙ্কার প্রতিফলন ঘটেছে প্রশাসনের সিদ্ধান্তেও। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন জেলার মোট ২৮০টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৩৯টিকে ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৫১টিকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে।
অবশ্য নলছিটির উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম গতকাল দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত সব কেন্দ্রই ভালো দেখছি। থানা কেন এতগুলো কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে বুঝতে পারছি না। তবে নির্বাচনের সময় একটি কেন্দ্রে সমস্যা হলে অন্যগুলোও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে, সেটা বুঝি।’
ঝালকাঠির অন্যতম উপজেলা রাজাপুরের বিভিন্ন ইউনিয়নে ভোটারদের মধ্যে টাকা বিলির খবর জানা গেছে। এই খবরের সত্যতা জানার জন্য সদর ইউপির আঙ্গারিয়া গ্রামে খোঁজ নেওয়া হয়। ওই গ্রামের এক বৃদ্ধা ফুলবানু প্রথম আলোকে বলেন, ভোট দিতে যাওয়ার জন্য তাঁর বাড়ির লোকদের খরচ দেওয়া হয়েছে। সেখানকার আরও কয়েকজন গ্রামবাসী জানান, মাথাপিছু ৫০ থেকে ১০০ টাকা দেওয়া হয়েছে।
বাগেরহাট: জেলার প্রায় অর্ধেক ইউপিতে চেয়ারম্যান প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে যাওয়ায় ভোটের আমেজ ধরে রেখেছেন সদস্য প্রার্থীরা। তারপরও নির্বাচনে সহিংসতার আশঙ্কা আছে ভোটারদের মধ্যে। তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা নাকচ করে দিয়ে বলা হয়েছে, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
জেলার ৭৩টি ইউপির মধ্যে ৩২টিতে চেয়ারম্যান প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে আছেন। এর মধ্যে রয়েছে বাগেরহাট সদরের ১০টি ইউপির মধ্যে ৯টি। ফলে স্থানীয় ব্যক্তিদের ভাষায় ‘ভোটের আমেজ পাইনসে হইয়ে গেইছে।’

সূত্র-প্রথম আলো

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জেডএম

উপরে