আপডেট : ২১ মার্চ, ২০১৬ ০৯:৩৪
সন্দেহের মূলে আরটিজিএস প্রকল্প

তথ্য পাচার হয় অক্টোবরে

বিডিটাইমস ডেস্ক

তথ্য পাচার হয় অক্টোবরে

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ক্লু পেয়েছেন দেশী-বিদেশী গোয়েন্দারা। তাদের ধারণা গত বছরের অক্টোবরেই সুইফট কম্পিউটারের তথ্য পাচার হয়। এই সময়ে ব্যাংকিং খাতের লেনদেন দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একটি সফটওয়্যার ইন্সটল (সংযোজন) করা হয়। এটি হল রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস)। যারা এই সফটওয়্যার সংযোজন করেছে, তাদের ব্যাপারে তথ্য নিয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। বিদেশী এই প্রতিষ্ঠানটি ধারণা করছে, এই সফটওয়্যার ইন্সটল করার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গোপন কিছু তথ্য পাচার হয়। এদিকে বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গোপন তথ্য সুরক্ষা নিয়েও শংকা রয়েছে। বিভিন্ন সংস্থা তদন্তের নামে দফায় দফায় বাংলাদেশ ব্যাংকে যাচ্ছে। তারা বিভিন্ন কাগজপত্র, সার্ভার, কম্পিউটার জব্দ করে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কে কোন তথ্য নিচ্ছে তার কোনো তালিকা করা হচ্ছে না।  
জানা গেছে, গত বছরের ২৯ অক্টোবর আরটিজিএস চালু হয়। এর মাধ্যমে চেক জমা দিলে ১ মিনিটের মধ্যে অ্যাকাউন্টে টাকা ক্রেডিট হয়। পেমেন্টের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক একে বিপ্লব হিসেবে বিবেচনা করছে। তবে রিজার্ভ সংরক্ষণের জন্য যে কম্পিউটারের মাধ্যমে সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টার ব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন (সুইফট) লেনদেন হতো, সেই কম্পিউটারে ইন্টারনেট সংযোগও ছিল না। সুইফট পরিচালনের জন্য বেলজিয়ামে সুইফটের ওই প্রতিষ্ঠানের মূল সার্ভারের সঙ্গে ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক টেকনোলজি ব্যবহার করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্ভারের সংযোগ ছিল। কিন্তু আরটিজিএস সফটওয়্যার ইন্সটল করার পর সুইফটের কম্পিউটারেও ইন্টারনেট সংযোগ দেয়া হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ পদ্ধতি চালুর সময় বিভিন্ন পর্যায়ে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা কাজ করেন। ওই সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুইফট শাখাতেও এসব বিশেষজ্ঞ ঢুকে পড়েন। গোয়েন্দাদের ধারণা, অক্টোবরে এ সিস্টেমে কাজ করতে গিয়ে সুইফট শাখার তথ্য খোয়া গেছে। বিষয়টি নিয়ে চুলচেড়া বিশ্লেষণ চলছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, সন্দেহের মূলে এখন আরটিজিএস। আর এখান থেকেই ঘটনার ক্লু বের হতে পারে। ডিজিটাল আপগ্রেডেশনের যারা কাজ করেছেন এদের মধ্যে চারজনকে গোপনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আরও দু’জনকে আজকালের মধ্যে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই যে তথ্য নিয়েছে- এই সফটওয়্যার ইন্সটল করার সময় কারা এসেছিল। তারা কী কী তথ্য নিয়েছে। কোন কোম্পানি এই সফটওয়্যার দিয়েছে। সংস্থাটি ধারণা করছে, এই সফটওয়্যার ইন্সটল করার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরের তথ্য পাচার হয়েছে।
তবে বিষয়টি অস্বীকার করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক শুভংকর সাহা রোববার বলেন, সুইডেনের কোম্পানি সিএনএ আরটিজিএস সফটওয়্যার সরবরাহ করে। এর অর্থায়ন করেছে এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। আন্তর্জাতিকভাবে টেন্ডার দিয়েই এ সফটওয়্যার নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আরটিজিএসের সঙ্গে টাকা চুরির কোনো সম্পর্ক নেই।  
তথ্য সুরক্ষা নিয়ে শংকা : এদিকে বিভিন্ন সংস্থার নামে বাংলাদেশ ব্যাংকের গোপন তথ্য সুরক্ষা নিয়ে শংকা রয়েছে। বিভিন্ন তদন্ত কমিটি ব্যাংক ছুটির মধ্যে দফায় দফায় বাংলাদেশ ব্যাংকে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন কাগজপত্র, সার্ভার, কম্পিউটার জব্দ করে নিয়ে যাচ্ছে। কে কোন তথ্য নিয়ে আসছে, কেউ তার তালিকা রাখছে না। সন্দেহের তালিকায় নাম চলে আসবে, এই আশংকায় কোনো কর্মকর্তা বাধাও দিচ্ছেন না। ফলে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানটির গোপনীয়তা ভবিষ্যতের জন্য আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।  আর এসব বিষয়ে মুখ খুলতে চাইছেন না বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

সিআইডি-এফবিআই বৈঠক : বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধার ও অপরাধী শনাক্তে মার্কিন তদন্ত সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) সহযোগিতা চেয়েছে সিআইডি। রোববার সিআইডি কার্যালয়ে এফবিআই প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠকে এই সহযোগিতা চাওয়া হয়। বৈঠকে এফবিআইয়ের মাত্র একজন সদস্য ছিলেন। পরে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক পরিদর্শনে যান। বৈঠক শেষে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত সংস্থা সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি মো. শাহ্ আলম উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, এফবিআইয়ের সঙ্গে মূলত দুটি বিষয়ে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। খোয়া যাওয়া অর্থ যেখানে গেছে সেখান থেকে ফেরত আনা ও যারা এই অর্থ হ্যাক বা যে কোনো মাধ্যমেই লুটে নিয়েছে তাদের এবং তাদের সহযোগীদের শনাক্ত করা।
তিনি বলেন, এখানে শুধু আমাদের স্বার্থই নয়, এফবিআইয়েরও স্বার্থ আছে। পাজেলের (ঘটনার) একটি অংশ আমাদের কাছে অপর অংশ তাদের কাছে। যে কম্পিউটার থেকে যে পদ্ধতিতে হ্যাক হয়েছে আমরা সেটা খুঁজে বের করব। যারা চুরির টাকায় লাভবান হয়েছে তাদেরও শনাক্ত করব। লাভবান বিদেশীদের দেশীয় কোনো সহযোগী আছে কিনা বা পরস্পরের যোগসাজশে এই চুরি হয়েছে কিনা সেটার জন্য আমরা এফবিআইয়ের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করব। সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, অতীতে অনেক ঘটনার তদন্তে সিআইডি সহযোগিতা দিয়েছে এফবিআইকে। এই ঘটনা তাদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে পরস্পরের স্বার্থ রয়েছে। কারণ অর্থগুলো গেছে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে। এখানে হ্যাক হয়ে থাকলে আগামীতে এ ধরনের ঘটনা আরেকবার ঘটার আগেই যাতে অপরাধী ও পদ্ধতি চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া যায় সেটি আমরা করছি।
এক প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, আমরা আইটি ফরেনসিক ইস্যুতে কথা বলেছি। যে আইপি থেকে হ্যাক হয়েছে সেটা খুঁজে বের করব। হ্যাকার শনাক্ত ও চূড়ান্ত লাভবান ব্যক্তি ও তার অন্য স্টেকহোল্ডারদের খুঁজে বের করব। তদন্তে আর কারা সহযোগিতা করছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা শুধু এফবিআই নয় ইন্টারপোলেরও সহযোগিতা নিয়েছি। বিভিন্ন দেশের সহযোগিতা ছাড়া এই অপরাধের রহস্য উন্মোচন সম্ভব নয়। মামলার তদন্তের ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা মীর্জা আবদুল্লাহেল বাকী বলেন, ‘এটি ছিল আমাদের প্রথম বৈঠক। ঘটনাটি একটি অর্গানাইজড ক্রাইম। এই অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের কীভাবে শনাক্ত করা যায় এ বিষয়ে এফবিআইয়ের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের পত্রিকা ইনকোয়ারারের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভে গচ্ছিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হাতিয়ে নিতে চেয়েছিল হ্যাকাররা। এ প্রচেষ্টায় দুই ধাপে প্রায় ১০১ মিলিয়ন ডলার লোপাট করা হলেও ৮৭০ মিলিয়ন ডলার পাচারে ব্যর্থ হয় তারা। এতে আরও জানানো হয়েছিল, সুইফট মেসেজিং সিস্টেমে জালিয়াতির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে চুরি করা অর্থ ফিলিপাইন ও শ্রীলংকার ব্যাংকে স্থানান্তরিত হয়। এর মধ্যে ফিলিপাইনের অ্যাকাউন্টে নেয়া ৮ কোটি ডলার ক্যাসিনোর মাধ্যমে হংকংয়ে পাচার করা হয়েছে। তবে শ্রীলংকার ব্যাংকে স্থানান্তরের চেষ্টা করা ২ কোটি ডলার আটকানো সম্ভব হয়েছে। ফেডারেল রিজার্ভের বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ চুরির ঘটনা তদন্ত করবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা কোম্পানি ফায়ারআই। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শক ওয়ার্ল্ড ইনফরমেটিক্সই অর্থ লোপাটের তদন্তে ফায়ারআইকে সম্পৃক্ততার কথা জানায়। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঞ্চিত অর্থ হ্যাকাররা কীভাবে চুরি করল, তা খতিয়ে দেখতে যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই এবং জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে এ ঘটনার এক মাস পর পর্যন্ত অর্থমন্ত্রীকে কিছু জানায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। এ কারণে গভর্নর ও দু’জন ডেপুটি গভর্নরকে বিদায় নিতে হয়।

সূত্র-যুগান্তর

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জেডএম

উপরে