আপডেট : ১৯ মার্চ, ২০১৬ ১৩:৫৮
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি

টাকা উদ্ধারে তোলপাড় ফিলিপাইনে, ‘গভীর ঘুমে’ বাংলাদেশ!

অন্ত:কলহ তুঙ্গে
পরাগ মাঝি
টাকা উদ্ধারে তোলপাড় ফিলিপাইনে, ‘গভীর ঘুমে’ বাংলাদেশ!

টাকা লুট হয়েছে বাংলাদেশের। তা নিয়ে তোলপাড় এখন ফিলিপাইনে। রিজার্ভচুরির ঘটনায় দারুণ তৎপরতা শুরু করেছে দেশটির বিচার বিভাগ।

ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরও এ বিষয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, ইতোমধ্যেই তদন্ত শুরু করে দিয়েছে দেশটির সিনেট কমিটি ব্লু রিবন।

এ নিয়ে দেশী ও আন্তর্জাতিক মহলে নানারকম প্রশ্ন  উঠছে, ঘটনার শিকার বাংলাদেশের দায়িত্ববোধ আর কর্তব্যবোধ নিয়ে। অনেকেই মনে করছেন, এদেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা একে অপরের সঙ্গে কলহ-বিবাদ করে নিজেদের পশ্চাৎদেশ বাঁচিয়ে চলেছেন অবিরাম।

বাংলাদেশের দিক থেকে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় দৃশ্যমান পদক্ষেপগুলো অনেকটা এরকম- চুরির ৪০ দিন পর নৈতিক দায় স্বীকার করে পদ ছেড়েছেন গর্ভনর ড. আতিউর রহমান। সেদিনই থানায় মামলা হয়েছে। ঘটনা তদন্তে সাবেক গর্ভনর ড. ফরাসউদ্দিনকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। রোববার এই কমিটি কাজে নামবে বলে জানা গেছে। আর ঘটনা তদন্তে  ইতোমধ্যেই সাহায্য চাওয়া হয়েছে এফবিআই’র। মামলা হাতে নিয়ে মাঠে নেমেছে সিআইডিও। এ সবই সহজ স্বাভাবিকভাবেই হচ্ছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে কি?

জানা যায়, টাকা চুরির ঘটনাটি বাংলাদেশে প্রকাশিত হওয়ার আগেই ফিলিপাইনের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে এ বিষয়ে খবর প্রকাশ করে। পরবর্তীতে বাংলাদেশী অখ্যাত এক সংবাদ মাধ্যমে সে খবর প্রকাশ করলে চাঞ্চল্যকর তথ্যটি জনসম্মুখে আসে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশের চেয়ে ফিলিপিনোরাই বরং বেশি তৎপর। বাংলাদেশী রিজার্ভ চুরি ঘটনার খবর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম প্রকাশের পাশাপাশি ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠা দেশটির রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) জুপিটার স্ট্রিটের শাখা ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতোসহ পাঁচজনকে তলব করেছে দেশটির বিচার বিভাগ। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির ঘটনায় দেশটির অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিলের করা মামলায় তাদের তলব করা হয়।

বাকি চারজন হলেন মাইকেল ফ্রান্সিসকো রুজ, জেসি খ্রিস্টফার লেগরোরাস, আলফ্রেড সান্তোস ভারগারা ও এনরিকো তেয়োদরো ভাসকোয়েজ। এই চারজন সন্দেহজনক বলে মনে করছে দেশটির অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কর্তৃপক্ষ।

আগামী ১২ ও ১৯ এপ্রিল মায়াসহ পাঁচজনকে বিচার বিভাগে হাজির হতে বলা হয়েছে। আদেশে বলা হয়েছে, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় নথি ও স্বাক্ষীসহ হাজির হতে হবে।

বৃহস্পতিবার মায়াকে শুনানিতে ডাকে দেশটির সিনেট কমিটি। শুনানিতে তিনি অল্প কথায় সিনেটরদের জিজ্ঞাসাবাদের জবাব  দেন। প্রায় ক্ষেত্রে শুধু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-তে জবাব দেন তিনি। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন দেগুইতো।

বাংলাদেশের টাকা ম্যানিলায় পাচার হওয়ার ঘটনায় ঝুঁকির মুখে পড়েছে ফিলিপাইনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আমান্দো তেতাংকো শুক্রবার সাংবাদিকদের কাছে এ আশঙ্কার কথা জানান।

আমান্দো বলেন, ‘ফিলিপাইনের অর্থবাজারের গত কয়েক দিনের গতিপ্রকৃতি দেখলে কোনো নেতিবাচক প্রভাবের আভাস পাওয়া যাবে না। তবে ঝুঁকি যে আছে, তা আমাদের মেনে নিতে হবে।’

তিনি মনে করেন, এ ধরনের আন্ত:সীমান্ত অর্থপাচারের ঘটনা ফিলিপাইনে এটাই প্রথম। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এরকম ঘটনা যাতে আর না ঘটে, এ জন্য স্থানীয় আইনের ফাঁকফোকর বন্ধে গুরুত্ব দেয়া হবে।

ফিলিপাইনের গভর্নরের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আমান্দো অর্থপাচার রোধ কাউন্সিলেরও (অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল) সভাপতি। তিনি বলেন, ‘আইনপ্রণেতাদের সাহায্য নিয়ে কাউন্সিল অর্থপাচার আইন জোরদার করার চেষ্টা চালাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকার ক্যাসিনো ও রিয়েল এস্টেট বিক্রেতাদেরও এই আইনের আওতায় আনা হবে।

গভর্নর আমান্দো আরও বলেন, ‘ফিলিপাইন অর্থপাচারের কেন্দ্র হতে চায় না। এ ঘটনায় অর্থপাচার রোধ-সংক্রান্ত কর্মপরিকল্পনা জোরদার করার সুযোগ এসেছে।’

চুরি ও অর্থপাচারের ঘটনা তদন্ত করছে ফিলিপাইনের সিনেট কমিটি ব্লু রিবন। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চুরি যাওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলারের মধ্যে ৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংক হয়ে ক্যাসিনোয় ঢুকেছে।

এদিকে, রিজার্ভ চুরির ঘটনা নিয়ে বিডিটাইমস’র সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার মুস্তাহিদ। বাংলাদেশের বর্তমান তৎপরতায় চুরি যাওয়া টাকা উদ্ধার সম্ভব কি-না প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, ফিলিপাইনে যাওয়া টাকা উদ্ধার একেবারেই অসম্ভব। তবে শ্রীলংকায় যে পরিমান টাকা গেছে তার থেকে কিছু পরিমাণে উদ্ধার করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। তবে, চুরির ঘটনাটি যে প্রকৃয়ায় হয়েছে তাতে নি:সন্দেহে হ্যাকারদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে। কারণ, ঘটনাকালীন সময়ে সিসি ক্যামেরা বন্ধ থাকার ব্যাপার এবং আমেরিকার ফেডারেল ব্যাংক থেকে টাকা সরানোর বিষয়টি অবহিত করা হলেও সেসময় ফ্যাক্স বন্ধ থাকার বিষয়টি অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ দেশি-বিদেশী বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে রিজার্ভচুরির ঘটনায় বাংলাদেশী তৎপরতা সমালোচনার মুখে পড়েছে। অন্যদিকে নিজেদের সতর্ক তৎপরতার মাধ্যমে বাহবা কুড়িয়ে নিচ্ছে ফিলিপাইন।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/মাঝি

উপরে