আপডেট : ১৭ মার্চ, ২০১৬ ১১:৫৫

অর্থ চুরির পুরো ঘটনা তদন্তের মাধ্যমে বের করাই প্রথম কাজ

বিডিটাইমস ডেস্ক
অর্থ চুরির পুরো ঘটনা তদন্তের মাধ্যমে বের করাই প্রথম কাজ

যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরেই বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর ফজলে কবির বলেছেন, অর্থ চুরির পুরো ঘটনা তদন্তের মাধ্যমে বের করাই হবে তার প্রথম কাজ।

বৃহস্পতিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কাতার এয়ারলাইন্সের একটি ফ্ল্যাইটে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান তিনি ।

গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় গভর্নর ড. আতিউর রহমান সরে যেতে বাধ্য হন।

ওইদিন দুপুরেই বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পান রাষ্ট্রায়াত্ত সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ফজলে কবির।

তার এ নিয়োগের কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র সফররত নতুন গভর্নর ১৮ মার্চ দেশে ফিরবেন।

তবে একদিন আগেই বৃহস্পতিবার ভোরে দেশে ফেরেন নতুন গভর্নর ফজলে কবির।

দেশের মাটিতে পা রেখেই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বললেন, সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী দুঃসময়ে যে আস্থা রেখে আমাকে এ দায়িত্ব দিয়েছেন, এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, এ দায়িত্ব আমি নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিপালন করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করব।

তবে যে পরিস্থিতিতে গভর্নরের দায়িত্বে এসেছেন তাকেই যে প্রধান্য দিচ্ছেন তাও অকপটে স্বীকার করলেন। বললেন, প্রথম মিশন তো আপনারা জানেন, এখন যে বিষয়টি রয়েছে.. সম্প্রতি যে বিষয়টি (বাংলাদেশ ব্যাংকে অর্থ চুরির ঘটনা) হয়েছে, সেটি... যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা তদন্ত করে খুঁজে বের করাই হবে আমার প্রথম ও প্রধান কাজ।

ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ব্যাংকে এ ধরনের কোন পরিস্থিতির মুখোমুখি না হতে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানান নতুন গভর্নর।

তিনি বলেন, আপনারা দেখবেন,  তদন্ত কমিটি হয়েছে, ধীরে ধীরে রিপোর্টে আসবে। ইতোমধ্যে যে বিপর্যয় হয়ে গেছে, সেজন্য কোনো ড্যামেজ রিপেয়ার করার দরকার আছে কি না... এর পুনরাবৃত্তি যেন না হয় কখনো, সে বিষয়ে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সবাই সচেষ্ট থাকব।

এদিকে বুধবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, আগামী ১৯-২০ মার্চ নতুন গভর্নর দায়িত্ব নেবেন। দায়িত্ব নেয়ার পর নতুন গভর্নর কিছুদিন সময় নেবেন। তিনি আরও অনেক বিষয় খতিয়ে দেখবেন।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে জালিয়াতি করে সুইফট কোডের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি করা হয়।

ঘটনা জানার পরও বিষয়টি গোপন রেখে চুরি হওয়া অর্থ ফেরত আনতে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান ফিলিপাইনের ব্যাংকো সেন্ট্রালের গভর্নর আমান্ডো টেটাংকো জুনিয়রের কাছে সহযোগিতা চেয়ে চিঠি লেখেন।

এরপর গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের দৈনিক  দি ফিলিপিন্স ডেইলি ইনকোয়ারারের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির খবর জানায়। এরপর বাংলাদেশী সংবাদমাধ্যমেও এ খবর এলে তোলপাড় শুরু হয়।

পরে গত ৭ মার্চ অর্থমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক তাকে এ ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানায়নি। তিনি সংবাদমাধ্যম থেকে ঘটনা জেনেছেন।

ওই দিনই বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা চুরির ঘটনা স্বীকারের পাশাপাশি দাবি করে, দেশের বাইরে থেকে হ্যাকাররা অর্থ চুরি করেছে।

কিন্তু,সংবাদমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, যেভাবে টাকা চুরি হয়েছে তাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদেরও সম্পৃক্ততা রয়েছে।

এর মধ্যে ১০ মার্চ চার দিনের সফরে দিল্লি যান গভর্নর আতিউর রহমান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এতবড় ঘটনার পরেও তার এ সফর বিতর্ক উস্কে দেয় এবং তার দায়িত্বহীনতার বিষয়টি জোরেশোরে আলোচিত হয়।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে বিদায়ী গভর্নর আতিউর রহমানের বিরুদ্ধে বিচার দেন অর্থমন্ত্রী। পরে সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আতিউরের ব্যাপার কথা বলেন তিনি।

এরপর মঙ্গলবার সাড়ে ১১টার দিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন গভর্নর আতিউর রহমান।

একই দিন দুই ডেপুটি গভর্নর মো. আবুল কাশেম ও নাজনীন সুলতানাকে অপসারণ করা হয়। ওএসডি করা হয় অর্থমন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এম আসলাম আলমকেও।

তবে এসব পরিবর্তন সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্বিঘ্নে অপকর্ম করে যাওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ায় সমালোচনা শুরু হয়।

এরপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে ব্যাংকের অত্যন্ত প্রতাপশালী একজন ডেপুটি গভর্নর ও দু’জন নির্বাহী পরিচালকসহ চুক্তিতে কর্মরত তিন মহাব্যবস্থাপককে সরিয়ে দেয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দীর্ঘদিন থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে অত্যন্ত প্রভাব বিস্তার করে আছে একজন ডেপুটি গভর্নর। তার কথায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সব সিদ্ধান্ত হয়। গভর্নরকেও পাত্তা দেন না তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ঘুষ ছাড়া ওই ডেপুটি গভর্নরের টেবিল থেকে কোনো ফাইল নড়ে না। বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকসহ আর্থিক খাতের উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে প্রতিটি কাজের জন্য কমপক্ষে দুই লাখ টাকা ঘুষ নেন তিনি। তার ঘুষের নেয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের সব কর্মকর্তাই জানেন। কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না। বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ পদগুলোতে নিজের লোক বসিয়ে তিনি ব্যাংকিং খাতে একচেটিয়া মাফিয়ার রাজত্ব কায়েম করেছেন। পুরো ব্যাংকিং খাতকে ধ্বংস করে দিচ্ছে ওই কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট। অর্থ মন্ত্রাণয়ের কাছেও বিষয়টি অজানা নয়। কিন্তু এতদিন কোনো ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন মহাব্যবস্থাপক বলেন, রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনার মূল নায়ক ওই ডেপুটি গভর্নর। তিনি এসবের নাটের গুরু। ব্যাংক পাড়ায় এখন ওপেন সিক্রেট দুর্নীতিবাজ তিনি।

তবে রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনার পর ওই ডেপুটি গভর্নরসহ অন্য অভিযুক্ত ও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানা গেছে।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও জানিয়েছেন দুই ডেপুটি গভর্নরকে সরানোর মধ্য দিয়ে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে তা অব্যাহত থাকবে।

তিনি বলেছেন, দুই ডেপুটি গভর্নরের অপসারণের মাধ্যমে আমরা প্রসেস শুরু করেছি। এটা লম্বা প্রসেস।দেশে ফিরে নতুন গভর্নরও বললেন, 'ড্যামেজ রিপেয়ার' করবেন।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জেডএম

উপরে