আপডেট : ১৭ মার্চ, ২০১৬ ১০:৪৪

মায়া সান্তোসের জন্য আটকানো গেল না চুরির অর্থ!!

অনলাইন ডেস্ক
মায়া সান্তোসের জন্য আটকানো গেল না চুরির অর্থ!!

৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরি হয়। চুরি হওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকিং করপোরেশনের জুপিটার শাখায় ছিল ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সেখান থেকে অর্থের বড় অংশ চলে যায় দেশটির ক্যাসিনোতে। আবার ক্যাসিনোতেও সেই অর্থ ছিল আরও ২০ দিন, ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
অর্থ চুরির পুরো ঘটনাটি বাংলাদেশে গোপন রাখা হয়। আর গোপনীয়তার মধ্যেই অর্থ সরিয়ে ফেলা সহজ হয়। ফিলিপাইনে এ ঘটনা তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্যের ভিত্তিতে সেখানকার সংবাদমাধ্যমে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা থেকে এ চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অর্থ চুরির পরপরই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তা প্রকাশ করা হলে ফিলিপাইনের ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্যে তা আটকে ফেলা যেত কি না—এ প্রশ্নটিও এখন সামনে এসেছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জোরালো নানা ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি চুরি যাওয়া অর্থ আটকানোর জন্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে ব্যবহারের সুযোগটি নেওয়া যেত। কিন্তু আমরা কোনোটিই যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারিনি। এর ফলে অর্থগুলো সহজে হাতবদল হয়ে সরে গেছে। এখন অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ ও জটিলতর হয়ে গেছে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ শুরুতে তৎপর ও কৌশলী হলে এ জটিলতা এড়ানো সম্ভব ছিল। এখন ফিলিপাইন সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সে দেশের অন্য কর্তৃপক্ষগুলো যদি সর্বোচ্চ সহায়তা অব্যাহত রাখে, তারপরও চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত আসতে দীর্ঘ সময় লেগে যাবে। সেই সঙ্গে সব অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা কমে গেছে।’
ফিলিপাইনের দৈনিক ইনকোয়েরার ১৬ মার্চ বুধবার দেশটির সিনেট কমিটির শুনানিতে উপস্থাপিত তদন্ত প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেই তদন্ত প্রতিবেদন ছিল রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) নিজেদের করা। ব্যাংকটির মাকাতি শহরের জুপিটার স্ট্রিট শাখা থেকে চারটি ব্যাংক হিসাব হয়ে চুরির অর্থ বেরিয়ে যায় মূলত ৯ ফেব্রুয়ারি।
ইনকোয়েরার-এর প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আরসিবিসির কাছে একটি বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়, যেখানে ‘অর্থের নগদায়ন বন্ধ ও ব্যাংক হিসাব জব্দ’ করার অনুরোধ করা হয়েছিল। ওই বার্তা হাতে পাওয়ার দিনই আরসিবিসির জুপিটার শাখার চার ব্যাংক হিসাব থেকে ৫ কোটি ৮১ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪৬৫ কোটি ২০ লাখ টাকার সমপরিমাণ অর্থ সরিয়ে ফেলা হয়। অথচ ওই দিন দুপুরের আগেই আরসিবিসির প্রধান কার্যালয়ের নিকাশ (সেটেলমেন্ট) বিভাগ থেকেও জুপিটার শাখায় চারটি ই-মেইলের মাধ্যমে অর্থ ফেরত আনার নির্দেশ পাঠানো হয়েছিল। অর্থ সরিয়ে নেওয়ার জন্য ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ তদন্তে জুপিটার শাখার ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতোকে দায়ী করা হয়েছে।
ফিলিপাইনের ইনকোয়েরার পত্রিকাটিতে ১১ মার্চ আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, ফিলিপাইনে আসা ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলারের মধ্যে ৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার রিজাল ব্যাংক হয়ে দেশটির ক্যাসিনোতে (জুয়া খেলার স্থান) ঢুকেছে। দেশটির বিনোদনকেন্দ্র ও ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রণকারী রাষ্ট্রীয় সংস্থা ফিলিপাইন অ্যামিউজমেন্ট গেমিং করপোরেশনের (পিএজিসিওআর) এক কর্মকর্তার একটি বক্তব্য প্রতিবেদনে যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে ওই কর্মকর্তা বলেছেন, ২০ দিন ধরে ওই অর্থ সেখানেই ছিল, জুয়ার টেবিলে ব্যবহার হয়েছে। মনে হচ্ছিল সবকিছুই স্বাভাবিক। অস্বাভাবিক কিছুই ছিল না সেখানে। যখন ইনকোয়েরার পত্রিকায় প্রথম প্রতিবেদন হলো, তারপরই কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসল।
আন্তর্জাতিকভাবে গণমাধ্যমে এ খবরটি তুলে ধরা হলে তাতে অর্থ আটকে রাখা যেত কি না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেন, এটি নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। তবে কখনো কখনো এ ধরনের ঘটনায় দেশি-বিদেশি মিডিয়াকে ব্যবহার করে ভালো ফলও পাওয়া যায়। আবার কখনো কখনো তাতে বুমেরাংও হয়। এখন এসে তাই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, ঘটনা জানার পরপর গণমাধ্যমের কাছে তা প্রকাশ করা হলে তাতে সুফল পাওয়া যেত কি না।
তবে গোলাম রহমান মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে পুরো ঘটনাটিকে যেভাবে হ্যান্ডেল করা হয়েছে, তাতে পেশাদারত্বের ঘাটতি ছিল।
মূলত ২৯ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের ইনকোয়েরার পত্রিকায় বাংলাদেশ থেকে হ্যাক করে অর্থ চুরির ঘটনাটি প্রথম প্রকাশ করা হয়। এরপরই বাংলাদেশের গণমাধ্যমে তা প্রকাশ পায়। আর এখন এটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংবাদে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই এ নিয়ে অসংখ্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে।

বাংলাদেশেও এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। একই সঙ্গে দুজন ডেপুটি গভর্নরকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে আরও পরিবর্তন করা হবে বলেও সরকার জানিয়ে দিয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক থেকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি (মূলত ৪ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টা) রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনাটি ঘটে।
অর্থ চুরির ঘটনার ৪০ দিন পর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। মামলার এজাহারে বলা হয়, ৫ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার সকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিলিং রুমের (যেখান থেকে লেনদেনের পরামর্শ আদান-প্রদান করা হয়) সুইফট সিস্টেমের ত্রুটি ধরা পড়ে। তবে প্রথমে সেটিকে স্বাভাবিক সমস্যা হিসেবে মনে করা হয়। ৬ ফেব্রুয়ারি শনিবার বিকল্প পদ্ধতিতে সুইফট সফটওয়্যার চালু করে কিছু অননুমোদিত বার্তার বিষয়টি নিশ্চিত হন ডিলিং রুমের কর্মকর্তারা। ওই দিন দুপুরেই ই-মেইল ও ফ্যাক্সের মাধ্যমে অননুমোদিত লেনদেনগুলো স্থগিত রাখার অনুরোধ পাঠানো হয় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকের কাছে। পরে ৮ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনসহ মোট ছয়টি ব্যাংকের কাছে ‘স্টপ পেমেন্ট বা অর্থ পরিশোধ বন্ধ’ অনুরোধ বার্তা পাঠানো হয়।
মঙ্গলবার মামলা দায়েরের পর রিজার্ভের অর্থ চুরি যাওয়ার ঘটনায় আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তকাজ শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গতকাল (১৬ মার্চ) সিআইডির একটি তদন্ত দল দিনভর বাংলাদেশ ব্যাংকে গিয়ে সেখানকার বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। পাশাপাশি আর্থিক লেনদেনের বার্তা আদান-প্রদানকারী আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সুইফটের বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা নেয়।
সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি দল গঠন করা হয়েছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার রায়হান উদ্দিন খান।
এদিকে গভর্নরের পদত্যাগ ও দুজন ডেপুটি গভর্নরের অব্যাহতির পর গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকজুড়ে ছিল একধরনের থমথমে পরিস্থিতি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামগ্রিক পরিবেশে অভিভাবকহীনতার বিষয়টি ছিল সুস্পষ্ট। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আলোচনার বিষয় ছিল শীর্ষ পর্যায়ের ব্যাপক পরিবর্তনের বিষয়টি। তবে গতকাল দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা সাংবাদিকদের বলেছেন, পরিবর্তনের পরও ব্যাংকের নিয়মিত কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল।

সূত্র: প্রথম আলো

উপরে