আপডেট : ১৬ মার্চ, ২০১৬ ১১:২৯

রিজার্ভ চুরির টাকা ফিলিপিন্সে গেল কীভাবে?

বিডিটাইমস ডেস্ক
রিজার্ভ চুরির টাকা ফিলিপিন্সে গেল কীভাবে?

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক’-এ সংরক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ কোটি ডলার লোপাটের ঘটনা এখন বিশ্ব গণমাধ্যমের গরম খবর। গোড়ার দিকে অর্থ জালিয়াতির এ খবর বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটু একটু আঁচ করতে পারলেও ফিলিপিন্সের পত্রিকা ইনকোয়ারারে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক হ্যাকিং’-এর তথ্য ফাঁস হওয়ার পরেই মূলত বিষয়টি নিয়ে সরব হয় দেশী-বিদেশী গণমাধ্যম। কীভাবে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে এই অর্থ ফিলিপিন্সের ব্যাংকিং সিস্টেমে ঢুকল, সেখান থেকে কীভাবে নানা হাত বদল হয়ে সেটা বিভিন্ন জায়গায় চলে গেল- মঙ্গলবার তা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে ফিলিপিন্সের পত্রিকা র‌্যাপলার।

র‌্যাপলারের রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশ ও ফিলিপিন্স- দু’দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে এত বড় মানি লন্ডারিংয়ের ঘটনা এটাই প্রথম। এ অর্থ কেলেংকারি তদন্তে ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স (এফএটিএফ) কাজ করছে।

অর্থ লোপাটের কাহিনী: যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে সংরক্ষিত অ্যাকাউন্ট থেকে ১০ কোটি ডলার খোয়া যাওয়ার ব্যাপারটি ওই ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে অবগত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইন্টার ব্যাংক মেসেজিং সিস্টেম (সুইফট) ব্যবহার করে অবৈধভাবে ওই অর্থ তুলে নেয় হ্যাকাররা। ফিলিপিন্সের ব্যাংক রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং সিস্টেম (আরসিবিসি) এই অর্থ লেনদেনের ঘটনায় জড়িত বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ওই ব্যাংকের মাকাতি শাখায় ফেব্র“য়ারি মাসের ৫ তারিখে প্রথম ৮১ মিলিয়ন ডলার ট্রান্সফার করা হয়। নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে প্রথম অর্থ যায় যুক্তরাষ্ট্রের ৩টি ব্যাংকে। এই ব্যাংকগুলো হল : ব্যাংক অব নিউইয়র্ক, সিটি ব্যাংক এবং ওয়েলস ফার্গো ব্যাংক। এই তিন ব্যাংক থেকে অর্থ যায় ফিলিপিন্সের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকে।

ফিলিপিন্স থেকে চারবার টাকা ট্রান্সফার করে নেয়ার পর পঞ্চমবার টাকা ট্রান্সফার করতে গিয়ে হ্যাকাররা ছোট্ট একটা বানান ভুলের (‘ফাউন্ডেশন’কে ‘ফান্ডাশন’) কারণেই ফাঁস হয়ে যায় হ্যাকার দলের জোচ্চুরি। পঞ্চমবার টাকা পাঠানোর কথা ছিল শ্রীলংকায়। টাকা হস্তান্তর করতে হবে ২০ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে বানানের ভুল চোখে পড়ে ব্যাংক কর্মকর্তাদের। সন্দেহ বাড়ে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আগে পাঠানো টাকাগুলোও হ্যাকারদের কবলেই পড়েছে। জানা যায়, বানান ভুলের কারণে এই ট্রান্সফারটি না আটকালে অন্তত ১ বিলিয়ন ডলার মানে বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিতে পারত হ্যাকাররা। জানা যায়, ‘শালিকা ফাউন্ডেশন’-এর নামে টাকা হাতানোর পরিকল্পনা ছিল হ্যাকারদের। কিন্তু ‘ফাউন্ডেশন’ বানানটি ভুল লেখায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ক্লারিফিকেশনের জন্য পাঠানো হয়। তখনই সেই টাকা হস্তান্তর বন্ধ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই নামে শ্রীলংকায় কোনো এনজিও নেই। এমনকি ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে আর কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি।

এদিকে লেনদেনের প্রত্যেকটি ধাপ সম্পর্কে আরসিবিসি ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লরেনজো ট্যান জানতেন বলে অভিযোগ করেছে ব্যাংকটির জুপিটার স্ট্রিট শাখার ব্যবস্থাপক মাইয়া সান্তোষ দেগুইতো। পুরো ঘটনাটি এখন তদন্ত করে দেখছে ফিলিপিন্সের সিনেট, ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন এবং ফিলিপিন্সের ‘এমিউজমেন্ট অ্যান্ড গেমিং কর্পোরেশন’ যারা সেখানকার জুয়ার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে।

যেভাবে হাতবদল হয় অর্থ: এই চুরি যাওয়া অর্থ কীভাবে হাতবদল হয়েছে, তার মোটামুটি একটা চিত্র দিয়েছে ফিলিপিন্সের ডেইলি ইনকোয়ারার পত্রিকা। পত্রিকাটির রিপোর্টে বলা হয়, রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে এই অর্থ তাদের ক্লায়েন্টদের মাধ্যমে চলে যায় স্থানীয় এক ফরেন এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীর কাছে। ৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার স্থানীয় মুদ্রায় বিনিময়ের পর এই পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৭০ কোটি পেসোতে। এরপর এই অর্থ চলে যায় তিনটি বড় ক্যাসিনোতে। এগুলো হল : সোলারি রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনো, সিটি অব ড্রিমস এবং মাইডাস। পুরো অর্থ খরচ করে সেখানে জুয়া খেলার জন্য চিপস কেনা হয়েছে। এরপর জুয়া খেলে এই চিপস আবার ফিলিপিনো মুদ্রায় কনভার্ট করা হয়েছে।

ফিলিপিন্সে অর্থ স্থানান্তর সহজ: ২০০১ সালে ফিলিপিন্সের এন্টি মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট (এএমএলএ) আইন পাস করে দেশটি। যার মাধ্যমে জুয়াড়িদের সন্দেহভাজন অর্থ স্থানান্তরের তালিকা প্রস্তুত করার নিয়ম করা হয়। ২০১৩ সালে এ সংক্রান্ত আইনের সংশোধন করেন দেশটির আইনপ্রণেতারা। ফলে এফএটিএফের পক্ষে জুয়াড়িদের অর্থ জালিয়াতির সন্দেহজনক রেকর্ড তৈরি করাটা একটু দুরূহ হয়ে যায়। ফিলিপিন্সের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান তেরেসিতা হারবোসা বলেন, ‘মানি লন্ডারিং’ সংক্রান্ত আইনটি অকার্যকর থাকায় অর্থ পাচার করা অতি সহজ।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/এসএম

উপরে