আপডেট : ১৫ মার্চ, ২০১৬ ২২:৫৩

বন্ধ হয়নি ধর্ষণের বিতর্কিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা

বিডিটাইমস ডেস্ক
বন্ধ হয়নি ধর্ষণের বিতর্কিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা

ধর্ষণের শিকার মেয়েশিশু ও নারীদের ‘টু ফিঙ্গার্স টেস্ট’ নামে একটি বিতর্কিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা এখনো বহাল আছে। এ পরীক্ষা না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। সেই নির্দেশের আলোকে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় একটি দিকনির্দেশনা তৈরি করে আদালতে দাখিল করেছে। তবে ওই দিকনির্দেশনায় পরীক্ষাটি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়নি। বলা হয়েছে, একান্ত প্রয়োজন না হলে এ পরীক্ষাটি করা যাবে না। এই দিকনির্দেশনার ব্যাপারে আদালতে এখনো শুনানি না হওয়ায় পদ্ধতিটি যথারীতি চালু আছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে পরীক্ষাটির কেতাবি নাম ‘পার ভ্যাজাইনাল টেস্ট’ হলেও এটি ‘টু ফিঙ্গার্স টেস্ট’ নামে প্রচলিত। এতে ধর্ষণের শিকার মেয়েশিশু বা নারীর যোনিতে চিকিৎসক আঙুল দিয়ে পরীক্ষা করে কতগুলো সিদ্ধান্ত জানান। বিশেষ করে নারী বা শিশুটি ‘শারীরিক সম্পর্কে অভ্যস্ত’ কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত টানেন চিকিৎসক।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বৈজ্ঞানিকভাবে এই পরীক্ষার কোনো গুরুত্ব না থাকলেও ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত পক্ষ চিকিৎসা সনদটিকে, বিশেষ করে অবিবাহিত কিশোরী ও নারীর চরিত্র নিয়ে সংশয় প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করে থাকে।

সম্প্রতি ভারতের আদালত পরীক্ষাটি বাতিল করার নির্দেশ দিয়েছেন। বাংলাদেশে মানবাধিকার ও নারী সংগঠনগুলো বহু বছর ধরে এই পরীক্ষা বাতিলের দাবি করে আসছে। ‘নারীপক্ষ’-এর নির্বাহী কমিটির সদস্য রীতা দাশ রায় বলেন, ‘কুমারীত্ব থাকা বা না থাকার সঙ্গে ধর্ষণের শিকার হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। এ কথাটা বহু বছর ধরে আমরা বলার চেষ্টা করে আসছি।’

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় ‘ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার শিকার নারী ও মেয়েশিশুদের পরীক্ষা ও চিকিৎসা বিষয়ে দিকনির্দেশনা’ তৈরিতে যে কমিটি গঠন করেছিল, রীতা দাশ রায় সেই কমিটির একজন সদস্য।
আদালতের নির্দেশে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক এবং স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যার চিকিৎসক ও মানবাধিকারকর্মীরা একটি দিকনির্দেশনা চূড়ান্ত করেন। ২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর এটি আদালতে জমা পড়েছে।

স্বাস্থ্যসচিব সৈয়দ মনজুর-উল-ইসলাম বলেন, ‘আদালতের নির্দেশে নীতিমালা তৈরি হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে জমাও দেওয়া হয়েছে।’

ব্লাস্টের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্রসচিব বরাবর রুল জারি করেন। সেখানে ‘টু ফিঙ্গার্স টেস্ট’ কেন আইনানুগ কর্তৃত্ববহির্ভূত এবং অবৈধ হবে না জানতে চাওয়া হয়। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসচিবকে ধর্ষণের শিকার মেয়েশিশু ও নারীদের জন্য নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দেন।

পরীক্ষাটি বাতিলের দাবি যে কারণে: ধর্ষণের পর একজন মেয়েশিশু বা নারীকে দীর্ঘ ও কঠিন স্বাস্থ্যপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এর একটি ‘টু ফিঙ্গার্স টেস্ট’। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চিকিৎসক বলেন, স্বাস্থ্যপরীক্ষার প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট কিছু তথ্য চাওয়া হয়। সে জন্য পরীক্ষাটি করা হয়ে থাকে। তবে শিশুদের যোনিপথের আঘাত খালি চোখেই দেখা যায়। সে জন্য খুব জরুরি না হলে পরীক্ষাটি করা হয় না।

মানবাধিকারকর্মীরা যে যুক্তি তুলছেন, তা হলো পরীক্ষাটির ফলাফল অনুমানভিত্তিক। এটি ধর্ষণের শিকার মেয়েশিশু ও নারী এবং চিকিৎসকের দৈহিক গড়নের ওপর নির্ভর করে। শিশু ও অল্প বয়স্ক নারীদের জন্য পরীক্ষাটি যন্ত্রণাদায়কও। আরও যে প্রশ্নটি উঠছে, তা হলো বিবাহিত নারীরা যখন ধর্ষণের শিকার হবেন, তখন ‘টু ফিঙ্গার্স টেস্ট’-এর কোনো যুক্তিই নেই।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দিকনির্দেশনায় যা আছে: দিকনির্দেশনায় চিকিৎসককে প্রথমে স্বাস্থ্যপরীক্ষা সম্পর্কে ধর্ষণের শিকার নারী বা মেয়েশিশুর অভিভাবককে জানানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণে ঘটনার পারিপার্শ্বিকতার ওপর জোর দিতে বলা হয়েছে। চিকিৎসকেরা অন্যান্য আলামত যথেষ্ট বিবেচিত হলে ‘টু ফিঙ্গার টেস্টের’ প্রয়োজন আছে কি নেই, সে সম্পর্কে মন্তব্য করবেন। তাঁরা একান্ত প্রয়োজন না হলে টু ফিঙ্গার টেস্ট করবেন না বলেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে মর্যাদাহানিকর ভাষা ব্যবহারে বিশেষ করে ‘অভ্যাস’, ‘অভ্যস্ত’ এমন শব্দ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/এসএম

উপরে