আপডেট : ১৩ মার্চ, ২০১৬ ০৯:০১

বিমানবন্দরে মশার চাষ!

বিডিটাইমস ডেস্ক
বিমানবন্দরে মশার চাষ!

মশার কামড়ে তো মরে যাব। এটা তো বিমানবন্দর নয়, যেন মশার খামার।’ গত শুক্রবার রাতে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কথাগুলো বলছিলেন মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসের যাত্রী তানিয়া আজিম। কেবল যাত্রীরা নন, বন্দর-সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য কর্মকর্তা-কর্মচারী মশার জ্বালায় অতিষ্ঠ।

বিমানবন্দরে বিভিন্ন বিমান সংস্থা, শুল্ক কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষ (সিভিল এভিয়েশন) ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করলে মশার ভোগান্তি থেকে রেহাই পাওয়া যেত।

বিমানবন্দর ঘুরে জানা গেছে, প্রতিবছর গড়ে সাত মাস মশার দাপট থাকে শাহজালাল বিমানবন্দরে। অক্টোবর মাস শুরু হতে না হতেই মশার উপদ্রব শুরু হয়। শীতকালে তা সহ্যের বাইরে চলে যায়। এপ্রিলের পর বৃষ্টি হলে মশার দাপট কিছুটা কমে।
বিমানবন্দরের মতো সংরক্ষিত স্থানে কেন এত মশা? এর কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, ১৯৭১ একর আয়তনের এই বিমানবন্দরের প্রায় অর্ধেক জায়গাজুড়ে আছে ছোট-বড় জলাশয়। মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাস বৃষ্টির কারণে এই জলাশয়গুলো পানিতে ভরে যায়। বর্ষা চলে যাওয়ার পর শুষ্ক মৌসুমে এসব জলাশয়ে অল্প পানি জমে থাকে। এ সময় সেখানে মশার বংশবিস্তার ঘটে। দিনের বেলা মশার দাপট না থাকলেও রাতের বেলা বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থাপনায় ঢুকে পড়ে মশা। এ ছাড়া কার্গো গুদাম এলাকায় মশার কারণে অবস্থান করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়।

বন্দর সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশের সর্ববৃহৎ এই বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ মিলিয়ে প্রতিদিন ১০০টি ফ্লাইট পরিচালিত হয়। এ জন্য প্রতিদিন ১৩ হাজার যাত্রী আসা-যাওয়া করেন। তাঁদের সঙ্গে ৩–৪ হাজার দর্শনার্থীও আসেন।
একটি বিদেশি বিমান সংস্থার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, প্রচুর বৈদ্যুতিক আলো ও প্রবেশপথ খোলা থাকায় মূল টার্মিনালে সন্ধ্যার পরপরই মশা ঢুকে পড়ে। রাতে আউট-বে এলাকায় উড়োজাহাজ থামার পর যাত্রীদের বহনকারী বাস আসতে মিনিট পাঁচেক দেরি হয়। সে সময় উড়োজাহাজ থেকে নামার পর মশার ঝাঁক রীতিমতো যাত্রীদের ঘিরে ধরে। রাতের বেলা মশার কামড় খেয়ে অনেকে লাফাতে লাফাতে যাত্রীদের চেক-ইনের কাজ করেন।

মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি বিমান সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, অবতরণের পর কিংবা উড্ডয়নের আগে উড়োজাহাজের ভেতরে স্প্রে করে মশা নিধনের দায়িত্ব সিভিল এভিয়েশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের। কিন্তু তাঁরা এ কাজ করেন না। তাই ককপিটসহ উড়োজাহাজের ভেতর যাত্রী-বৈমানিক—সবাইকেই মশার কামড় খেতে হয়। সিভিল এভিয়েশনে অভিযোগ করেও কাজ হয়নি। বাধ্য তাঁরা নিজেরাই স্প্রে এনে উড়োজাহাজের ভেতর থেকে মশা তাড়ানোর চেষ্টা করেন। রাত গড়িয়ে সকাল ১০টা পর্যন্ত বোর্ডিং ব্রিজ, গ্রিন চ্যানেল ও ক্যানপি এলাকায় মশার ঝাঁক উড়তে থাকে।

আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আমরা পোশাক পরে বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালন করি। তাই যাত্রীরা মশার সমস্যা সমাধানে আমাদের কাছে অভিযোগ করেন। দেশে বিমানযাত্রীর সংখ্যা বাড়ছে, তাই অভিযোগও বেশি শুনতে হচ্ছে।’

বিমানবন্দরে পরিচ্ছন্নতার কাজ করে থাকে একে ট্রেডার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান। তারা কেবল আন্তর্জাতিক যাত্রীদের জন্য চারটি ভিআইপি কক্ষ এবং একটি অভ্যন্তরীণ ভিআইপি কক্ষে মশার ওষুধ স্প্রে করে। এ ছাড়া বিমানবন্দরে অন্যান্য এলাকায় মশার ওষুধ স্প্রে করে থাকে সিভিল এভিয়েশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। একে ট্রেডার্সের সুপারভাইজার সেলিম আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, পাঁচটি ভিআইপি কক্ষে প্রতিদিন মশা মারার প্রায় ৩০টি বোতল ওষুধ স্প্রে করতে হচ্ছে তাঁদের।

সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ জানায়, মশা নিধন তাদের একার পক্ষে সম্ভব নয়, এ জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাঁচটি মেশিন প্রতিদিন মশা নিধনের কাজে ব্যবহার করা হয়। এ জন্য পর্যাপ্ত ওষুধ আছে। এসব তথ্য জানান শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন জাকির হাসান। তিনি বলেন, ‘মশার কারণের সঙ্গে জড়িত আছে সিটি করপোরেশনের কর্মকাণ্ড। মশা মারতে প্রতিদিন ফগিং করছি। আল্টা লো ভলিউম স্প্রে করা হচ্ছে। মশার ডিম পাড়ার স্থান পরিষ্কার করা হয়েছে। পুকুরগুলো ৩০-৪০ লাখ টাকা খরচ করে পরিষ্কার করানো হয়েছে। সিটি করপোরেশন যদি উত্তরা এলাকায় ফগার মারত, তাহলে বিমানবন্দরে মশা চলে আসত না। আমরা মশা মারছি, কিন্তু আবার অন্য জায়গা থেকে মশা চলে আসছে। মেয়র মহোদয় যদি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতেন, তাহলে ভালো হতো।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সালেহ ভূঁইয়া বলেন, বিমানবন্দরে মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের নয়। তা-ও বিশেষ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন মশার ওষুধ ছিটিয়ে দেয়। বিমানবন্দর এলাকায় সিভিল এভিয়েশনের দুটি জলাশয় আছে। এগুলো কচুরিপানায় ভরে থাকায় মশা জন্মায়। সিভিল এভিয়েশনকে একাধিকবার বলার পরেও তারা সেটা পরিষ্কার করে না। সূত্র- প্রথম আলো

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জেডএম

উপরে