আপডেট : ৯ মার্চ, ২০১৬ ১৫:৩৬

যেভাবে কার্যকর হবে নিজামী-কাসেমের মৃত্যুদণ্ড

বিডিটাইমস ডেস্ক
যেভাবে কার্যকর হবে নিজামী-কাসেমের  মৃত্যুদণ্ড

বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী এবং শহীদ কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিনসহ ছয়জনকে হত্যার দায়ে জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলীর চূড়ান্ত ভাগ্য ইতোমধ্যে নির্ধারণ হয়ে গেছে। একাত্তরে পাকিস্তানকে সহায়তাকারী এ দু’জনকে যেতে হচ্ছে ফাঁসির কাষ্ঠে।

তবে অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুদিন। এ ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের রায় ও আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের কিছু বিধি-বিধান পালন করতে হবে।

তবে দেশের এই দুই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড আপিলেও বহাল থাকায় এ রায় কার্যকর থেকে আর মাত্র তিন ধাপ দূরে রয়েছে।
 
এর মধ্যে প্রথম ধাপে রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দেওয়া সংক্ষিপ্ত রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ। এরপর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে রায় পুর্নবিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করতে পারবেন আসামিরা। রিভিউ খারিজ হলে সবশেষে ফাঁসির দড়ি থেকে বাঁচতে নিজামী-মীর কাসেম আলীর জন্য একমাত্র সুযোগ হিসেবে থাকবে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়া।
 
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর রায় পুনর্বিবেচনার(রিভিউ) আবেদনের সুযোগ পাবেন আসামি। রিভিউয়ের রায়ের ওপর ভিত্তি করে দণ্ড কার্যকর হবে। রিভিউ খারিজ হয়ে যদি ফাঁসি বহাল থাকে, তাহলে বাকি থাকবে শুধু প্রাণভিক্ষা।
 
গত ০৬ জানুয়ারি আপিল মামলার চূড়ান্ত সংক্ষিপ্ত রায় প্রকাশের পর নিজামী রিভিউ আবেদন করবেন কি-না এ প্রশ্নের জবাবে তার প্রধান আইনজীবী আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, আগেরগুলোতে (কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান, মুজাহিদ) রিভিউ করে ফল পাওয়া যায়নি। এখন এটাতে করা হবে কি-না সেটা মাওলানা সাহেব (নিজামী) জানেন। রায় পর্যালোচনা করে নিজামী যদি বলেন, তাহলে রিভিউ করা হবে।     
 
অন্যদিকে মঙ্গলবার (০৮ মার্চ) রায় ঘোষণার পর এক লিখিত বক্তব্যে মীর কাশেম আলীর স্ত্রী খোন্দকার আয়েশা খাতুন বলেন, আমরা ন্যায়বিচার বঞ্চিত হয়েছি, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর রিভিউ আবেদন করবো।
 
প্রথম মানবতাবিরোধী হিসেবে ফাঁসির কাষ্ঠে যাওয়া আবদুল কাদের মোল্লার পুর্নবিবেচনার রায়ে সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, আপিল বিভাগের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হলে ১৫ দিন সময় পাওয়া যাবে এ রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে। যদি আবেদন খারিজ হয় তাহলে রাষ্ট্রপতির প্রাণভিক্ষারও সুযোগ থাকছে।

আর এসব ধাপের পর সরকারের সিদ্ধান্ত অনুসারে রায় কার্যকর করা যাবে।

পূর্ণাঙ্গ রায়ের পূর্ব অভিজ্ঞতা
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লাকে ২০১৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেন আপিল বিভাগ। এর প্রায় আড়াই মাস পর ওই বছরেরই ০৫ ডিসেম্বর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন আপিল বিভাগ।

২০১৪ সালের ০৩ নভেম্বর জামায়াতের অপর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসির দণ্ড বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। এর সাড়ে তিন মাস পর ২০১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কামারুজ্জামানের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন আপিল বিভাগ।

আর জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসির দণ্ড গত বছরের ১৬ জুন বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। এর প্রায় সাড়ে তিন মাস পর ৩০ সেপ্টেম্বর তার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের সাকা চৌধুরীর আপিল মামলার রায়ে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে একই বছরের ২৯ জুলাই। আর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ পায় দুই মাস পরে মুজাহিদের সঙ্গে ৩০ সেপ্টেম্বর।

২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ফাঁসির সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ দিয়ে জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায় ঘোষণা করেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল  হোসেনের নেতৃত্বে ৫ বিচারপতির আপিল বেঞ্চ।
 
গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর সাঈদীর আপিল মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন আপিল বিভাগ।
 
সবাই চূড়ান্ত রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে রিভিউ আবেদন করেন এবং সাঈদী ছাড়া প্রত্যেকের রিভিউ খারিজ হয়েছে। সাঈদীর আবেদন শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

তবে সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদ ছাড়া আর কেউ প্রাণভিক্ষা চাননি। কাদের মোল্লা-কামারুজ্জামানের রিভিউ খারিজের পর এবং সাকা-মুজাহিদের প্রাণভিক্ষা নাকচের পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সরকার।

ওই চারজনের পর এবার রিভিউ আবেদন করা এবং তা খারিজ সাপেক্ষে জামায়াতের আমির নিজামীর  ও মীর কাসেমের দণ্ড কার্যকরের পালা।

নিজামী
আলবদর বাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডার মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশ গত ০৬ জানুয়ারির সংক্ষিপ্ত রায়ে বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। সেই থেকে এ মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অপেক্ষা করছেন উভয়পক্ষ।
 
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নিখিল পাকিস্তানের সভাপতি হিসেবে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী কিলিং স্কোয়ার্ড আলবদর বাহিনীর শীর্ষনেতা সুপ্রিম কমান্ডার ছিলেন নিজামী। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা ছাড়াও সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটি (ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়) হিসেবে আলবদর বাহিনী ও ছাত্রসংঘের অপরাধের দায়ও নিজামীর বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছে রায়ে।
 
দেশের এই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার সংক্ষিপ্ত আকারে চূড়ান্ত ওই রায় দেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ। অন্য বিচারপতিরা হচ্ছেন, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
 
নিজামীকে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড এবং হত্যা-গণহত্যা ও ধর্ষণসহ সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটির প্রমাণিত ৮টি মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে ৪টিতে ফাঁসি ও ৪টিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে ৩টিতে ফাঁসি ও ২টিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। অন্য তিনটিতে চূড়ান্ত রায়ে দণ্ড থেকে খালাস পেয়েছেন নিজামী, যার মধ্যে একটিতে ফাঁসি ও দু’টিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ ছিল ট্রাইব্যুনালের রায়ে।    
 
মীর কাসেম আলী
মঙ্গলবার একাত্তরে আলবদর বাহিনীর তৃতীয় শীর্ষনেতা মীর কাসেম আলীর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রেখেছেন সর্বোচ্চ আদালত।

শুরু হয়ে গেছে এ মামলারও পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের অপেক্ষা।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মূল হোতার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শহীদ কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিনসহ ছয়জনকে হত্যা-গণহত্যার দায় (১১ নম্বর অভিযোগ) প্রমাণিত হওয়ায় তাকে সর্বোচ্চ দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে আপিল মামলার রায়ে। ১১ নম্বর ছাড়াও ১২ নম্বর অভিযোগে রঞ্জিত দাস লাতু ও টুন্টু সেন রাজুকে হত্যার দায়েও কাসেমের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। তবে চূড়ান্ত রায়ে প্রমাণিত না হওয়ায় এ অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দিয়েছেন আপিল বিভাগ।

ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত মোট ১০টি অভিযোগের মধ্যে আরও ৬টি অভিযোগে মীর কাসেমের সাজা বহাল এবং আরও ২টি থেকে অব্যাহতি ও খালাস দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে চূড়ান্ত রায়ে ফাঁসির পাশাপাশি ৫৮ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ পেয়েছেন তিনি।   

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী কিলিং স্কোয়ার্ড আলবদর বাহিনীর তৃতীয় শীর্ষনেতা ছিলেন জামায়াতের বর্তমান কর্মপরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলী। সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটি (ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়) ও জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ (যৌথ দায়বদ্ধতা) হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে আলবদর বাহিনী ও ছাত্রসংঘের অপরাধের দায়ও তাই বর্তেছে তার ওপরে।

দেশের এই অন্যতম শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার সংক্ষিপ্ত আকারে চূড়ান্ত এ রায় দেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ। বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা হলেন- বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মোহাম্মদ বজলুর রহমান।

 

উপরে