আপডেট : ৪ মার্চ, ২০১৬ ১০:২১

নারী ঘটিত কারণেই সাবেক সচিবের আত্মহত্যা

বিডিটাইমস ডেস্ক
নারী ঘটিত কারণেই সাবেক সচিবের আত্মহত্যা

‘তুই আমাকে ঘরের কথা শুনাইস না। বলিস না নানীর কথা। মুখে আনিস না ছেলে-সন্তানের কথাও। আমার বুকে বড় জ্বালারে। আহারে বুক আমার ঝাঝরা হয়ে গেছে’ হোটেলে অবস্থানকালীন প্রায়শ এরকমই জ্বালা-যন্ত্রণার কথা বলে গেছেন সাবেক ভূমি সচিব ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন (৬২)। কক্সবাজার সাগর পাড়ের হোটেল সী হ্যাভেন গেষ্ট হোমের নারী কর্মচারি (সুইপার) নুর বানু (৩৫) এসব কথা বলেন। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেছেন- সচিব কোন কারনে হয়তোবা মানসিক চাপে ছিলেন।

হোটেলের নির্জন কক্ষে আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া এই সচিব ১৯৯৬ সালের বহুল আলোচিত জনতার মঞ্চের একজন সমর্থকও ছিলেন। তিনি এসময় বান্দরবান জেলায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। বান্দরবান জেলা প্রশাসন সুত্রে জানা গেছে, মো. দেলোয়ার হোসেন ১৯৯৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৯৯ সালের ৫ এপ্রিল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন পার্বত্য বান্দরবান জেলায়।

চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার লুন্তি নোয়াবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন তিনি। কচুয়া উপজেলার অপর একজন বাসিন্দা দেশের বরেণ্য ব্যক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ড. প্রফেসর মুনতাসীর মামুন জানান-‘সরকারি পদস্থ কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন আমার এলাকার বাসিন্দা। তিনি জনতার মঞ্চের সমর্থক ছিলেন বলে শুনেছি। ওয়ান ইলেভেনের সময় দুদক সচিব হিসাবেও কর্মরত ছিলেন তিনি।’

কক্সবাজারের হোটেলটির ১০১ নম্বর কক্ষে টানা ২৬ দিন অতিবাহিত করেছেন আমেরিকার বিশ্ববিখ্যাত হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া সাবেক এই সচিব। গত ২৯ ফেব্রুয়ারি কক্ষটির দরজা ভেঙ্গে বৈদ্যুতিক ফ্যানের সাথে গামছা দিয়ে ফাঁস লাগানো সচিবের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। শহরের কলাতলীস্থ আবাসিক হোটেল সী হ্যাভেন গেষ্ট হোমের ম্যানেজার মকবুল হোসেন জানান, দেলোয়ার হোসেন ২ জানুয়ারী থেকে গত ৩ ফেব্রুয়ারি দুই মাসের জন্য ২৪ হাজার টাকা নগদ পরিশোধ করে হোটেল কক্ষ ভাড়া নিয়েছিলেন। আমেরিকায় পড়াশুনাকালীন সময়ের গল্প শুনাতেন তিনি হোটেল ম্যানেজারকে।

হোটেল কক্ষ ভাড়া নেয়ার সময় নিজের নাম গোপন রেখে তিনি হোটেল ম্যানেজারকে জানান-তাঁর নাম শাহরিয়ার হাসান। লাশের পরিচয় না মিলায় পুলিশ ময়না তদন্তের পর শেষ পর্যন্ত কক্সবাজার পৌরসভাকে দিয়ে বেওয়ারিশ হিসাবে লাশ দাফন করে। এদিকে হোটেল কক্ষ ভাড়া নেয়ার সময় সচিবের সাথে মিঠুন নামের একজন আত্মীয় পরিচয়ধারিও ছিলেন। মিঠুন নামের এই ব্যক্তি কে তার সর্ম্পকে জানা যায়নি।

হোটেলটিতে উঠে সাবেক সচিব নিজের ব্যবহারের জন্য একটি থালা, গ্লাস ও চামচ সহ মশারি কিনেন। বাইরের হোটেলের খাবার এনে নিজ কক্ষেই তিনি খেতেন। দিনের বেলায় ডিউটিতে এসে হোটেলের নারী সুইপার আনোয়ারা এবং নুর বানু দুইজনই এই বয়োবৃদ্ধ লোকটির সেবা শুশ্রুষা করেছেন। আনোয়ারা বলেন-‘তিনি কেন যে এত বড় সর্বনাশ করলেন জানিনা। তবে তিনি বড় খান্দানি লোক ছিলেন। মাঝে মধ্যে লুঙ্গি এবং জামা-কাপড়ও ধুয়ে দিতে অনুরোধ করতেন। তা আমরা যথারীতি করতাম।’

তবে বেশির ভাগ সময় তাঁকে ভাত খাওয়াতেন হোটেলের নারী কর্মী নুর বানু। নুর বানু বলেন-‘আমি তাঁকে নানা ডাকতাম। তিনিও বেশ স্নেহ করতেন। মাঝে মধ্যে টুকটাক বখশিষ দিতেন। আমি যখন নানী এবং পুত-ঝিয়ের কথা জানতে চাইতাম তখন তিনি বুক চাপড়িয়ে বলতেন-এসব বলিস না। আমার বুক ঝাঝরা হয়ে গেছে।

পুলিশ জানায়, নিহত মো. দেলোয়ার হোসেন একজন অবসরপ্রাপ্ত সাবেক সচিব। তিনি ঢাকার বাসিন্দা। তার বাবার নাম মৃত সোনা মিয়া। তার ১ ছেলে ২ মেয়ে। পুলিশের ধারণা, পরিবারের অবহেলার কারণে তিনি কক্সবাজার এসে একা অবস্থান করতেন। আর পরিবারের এই অবহেলাই তার আত্মহত্যার কারণ। কক্সবাজার সদর থানার উপ পরিদর্শক ও মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম জানান, ‘আত্মহত্যার ব্যাপারে স্বজনেরা কিছুই স্বীকার করতে রাজি নয়। তবে নারী সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে তিনি বেশ কিছু ক্ষোভের কথা লিখে গেছেন।’ শহিদুল আরো জানান, সচিব পুত্র রাজিব তাকে জানান তার পিতা হার্ভাডে লেখাপড়া করেছেন।

হোটেল কক্ষ থেকে সচিবের লেখা ৮ পৃষ্ঠার যে চিরকুটটি উদ্ধার করা হয়েছে তাতে তিনি লিখেছেন-এই মৃত্যু’র জন্য কেউ দায়ী নন। আজ না হয় কাল মরতেই হবে। তিনি চিরকুটে সবচেয়ে বেশী লিখেছেন নারী প্রসঙ্গ নিয়ে। লিখেছেন, নারীর প্রতি মোহ সবারই থাকে। নারীর কারনে অনেক বিখ্যাত লোককেও কারাগারে যেতে হয়েছে। এ কারনেই আমেরিকার ২১ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা একজন গভর্নরকেও বিদায় নিতে হয়েছে। এমনকি বিল ক্লিনটনের মত প্রেসিডেন্টকেও বিদায় নিতে হয়েছে নারীর কারনেই।

এসব কারনেই তদন্তকারি কর্মকর্তার প্রাথমিক ধারণা-পারিবারের সাথে নারী ঘটিত মান-অভিমান জনিত কোন বিষয় রয়েছে। এই কারনে তিনি পরিবারের কাছ থেকে দুরে থাকার চেষ্টা করছিলেন হয়তোবা। কেননা তিনি আত্মহত্যার আগে আরো বহুবার কক্সবাজারে কাটিয়ে গেছেন। শহরের আবাসিক হোটেল সী পার্ল এর ম্যানেজার মহিউদ্দিন জানান, দেলোয়ার হোসেন দীর্ঘ দিন যাবত কক্সবাজার অবস্থান করছেন। গত কয়েক বছর ধরে তিনি তাকে দেখে আসছেন।  তবে মাঝে-মধ্যে বেশ কিছুদিনের জন্য দেখা যেত না। তিনি খুবই সাংস্কৃতিক মনা মানুষ। গত  ২ ফেব্রুয়ারি নিজ খরচে তিনি গানের পার্টির আয়োজন করেছিলেন।

এদিকে সাবেক সচিবের মৃত্যুর ৪ দিনের মাথায় গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে মোবাইল কম্পানী টেলিটকে কর্মরত তার একমাত্র সন্তান রাজিব এবং ঘনিষ্ট আত্মীয় সরকারের একজন ডেপুটি সেক্রেটারি (ডিএস) সহ কয়েকজন আত্মীয় কক্সবাজার আসেন। তারা মরহুম সচিব দেলোয়ার হোসেনের কবর জিয়ারত করেন এবং কবরের চারপাশে বেড়া দিয়ে সংষ্কার করতে দেন। কবরে লাগানোর জন্য একটি সাইনবোর্ডও তৈরি করা হয়েছে। পুলিশকে আত্মীয় স্বজনরা জানিয়ে দিয়েছেন, তারা নিহতের মরদেহ নিয়ে যাবেন না। সন্তান রাজিবও সংবাদকর্মীদের সাথে কথা বলতে নারাজ।

এ ব্যাপারে, কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসলাম হোসেন জানান, সাবেক সচিব দেলোয়ার হোসেন সর্বশেষ দায়িত্ব পালন করেন ঢাকার সাভারে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র লোক প্রশাসন কেন্দ্রে। তিনি স্বেচ্ছায় অবসর প্রাপ্ত হন। প্রাথমিক অবস্থায় দেখা যাচ্ছে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেই মারা গেছেন অবসর প্রাপ্ত সচিব দেলোয়ার হোসেন। তিনি কেন আত্মহত্যা করেছেন তা এখনও  জানা যায়নি।

সূত্র: কালের কণ্ঠ

উপরে