আপডেট : ২ মার্চ, ২০১৬ ১৩:৪৯
রয়টার্সের প্রতিবেদন

সিরিয়ায় যৌনদাসী হিসেবে বন্দি কয়েক ডজন বাংলাদেশি

বিডিটাইমস ডেস্ক

সিরিয়ায় যৌনদাসী হিসেবে বন্দি কয়েক ডজন বাংলাদেশি
ফাইল ছবি

কয়েক ডজন বাংলাদেশি নারী গৃহযুদ্ধকবলিত সিরিয়ায় যৌনদাসী ও গৃহকর্মী হিসেবে বন্দি জীবন যাপন করছেন। ভালো কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁদের প্রথমে লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে পাঠায় পাচারকারীরা। পরে তাঁদের জোরপূর্বক সিরিয়ায় পাঠিয়ে গৃহস্থালি ও যৌনকর্মে বাধ্য করা হয়।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন বাংলাদেশের র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) এক শীর্ষ কর্মকর্তা। তিনি জানান, র‍্যাবে তাঁর ইউনিট ৪৫ জন নারীর অভিযোগ পেয়েছে, যাঁরা গত বছর সিরিয়ায় অনৈতিক ব্যবহার, প্রহার, নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

অন্যদিকে বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে গত এক বছরে একশরও বেশি নারী সিরিয়ায় পাচার হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধের কারণে দেশটি থেকে বাংলাদেশের এসব নারীদের ফেরত আনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

র‍্যাব-৩-এর কমান্ডার খন্দকার গোলাম সারোয়ার গত সোমবার রয়টার্সকে জানান, তাঁরা শাহিনুর নামে এক নারীর বিষয়টি প্রথম জানতে পারেন। ওই নারী সিরিয়ায় তাঁর বন্দিকর্তার হাত থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর তাঁর মাকে ফোন করেন। পরে ওই মা বিষয়টি র‍্যাবকে জানান। তিনি বলেন, ‘শাহিনুরকে প্রথমে লেবাননে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু সেখানে না নিয়ে আরো পাঁচ নারীসহ তাকে দুবাই নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাদের সিরিয়ায় পাঠানো হয় এবং সেখানে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।’ শাহিনুর জানিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে আরো বাংলাদেশি নারী রয়েছেন।

র‍্যাব কমান্ডার বলেন, ৩৪ বছর বয়সী ওই নারী এখন খুবই অসুস্থ এবং চলাফেরা করতে পারছেন না। খবর পেয়ে সিরিয়ায় বাংলাদেশের কর্মকর্তারা তাঁকে একটি ফ্লাইটে ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। তিনি গুরুতর কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। দেশে তাঁর চিকিৎসা চলছে।

‘যৌনদাসী ও গৃহকর্মী হিসেবে বাংলাদেশি নারীদের সিরিয়ায় পাচার’ শীর্ষক রয়টার্সের এই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার হিসাবে মতে, বিভিন্ন দেশে ৮০ লাখের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশ ও সিঙ্গাপুরে গেছেন। সাধারণত তাঁরা স্বেচ্ছায় বিদেশে যান। কিন্তু বাংলাদেশি শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এমন ঘটনাও জানা যাচ্ছে, যাঁদের বিদেশে জোর করে পাঠানো হয়। বিদেশ গমনের খরচ (রিক্রুটমেন্ট ফি) খুব বেশি হওয়ায় তাঁরা এ খপ্পরে পড়েন। কারণ শর্ত অনুযায়ী বিদেশে নিয়োগকর্তারা তাঁদের রিক্রুটমেন্ট ফি শোধ করে এবং একই সঙ্গে তাঁদের চলাফেরায়ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে নারীরা সাধারণত গৃহকর্মী হিসেবে যান। কিন্তু সেখানে তাঁরা নির্যাতনের শিকার হন এবং পরাধীনতার শৃঙ্খলে বন্দি হন।

র‍্যাব কর্মকর্তা সারোয়ার বলেন, ‘পাঁচ বছর ধরে গৃহযুদ্ধ চলা সিরিয়া এখন নারী পাচারকারীদের নতুন গন্তব্য হয়ে উঠেছে। এ ক্ষেত্রে পাচারকারীরা বাংলাদেশি রিক্রুটমেন্ট এজেন্সিকে ব্যবহার করছে। এ কাজে আইনি বৈধতা দিতে তারা কাগজপত্রে গন্তব্য দেশ হিসেবে লেবানন ও জর্দানের কথা উল্লেখ করে। এ দুটি দেশে নিয়ে যাওয়ার পর পাচারকারীরা তাঁদের সিরিয়ায় পাঠিয়ে দেয়। সেখানে নেওয়ার পর নারীদের বিভিন্ন ব্যক্তির হাতে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এ অবস্থায় বন্দি হয়ে পড়া নারীদের পালাবার কোনো সুযোগ থাকে না।’

সারোয়ার আরো বলেন, ‘এ পর্যন্ত বাংলাদেশে আটজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বেশির ভাগই রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির মালিক ও কর্মচারী। তারা জেনে বা না জেনে আন্তর্জাতিক পাচারকারীচক্রের অংশ হয়ে গেছে। তবে সিরিয়া, জর্দান ও লেবাননের পাচারকারীদের চিহ্নিত করা যায়নি।’

র্যাবের এই কর্মকর্তা জানান, নির্যাতিতরা বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র নারী। এক বছরের চাকরি এবং মাসে ২০০ ডলার (১৫ হাজার টাকা) বেতনের শর্তে তাঁদের কাছ থেকে রিক্রুটমেন্ট ফি হিসেবে গড়ে ৩০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘গ্রাম থেকে যাওয়া এসব নারী সরল ও অশিক্ষিত। সিরিয়া সম্পর্কে, বিশেষ করে সেখানে কী ঘটছে সে সম্পর্কে তারা কিছু জানে না। তারা ভাবে, তারা লেবানন বা জর্দানে যাচ্ছে একটি ভালো জীবনের আশায়।’

গত বছর পাচার ১০০ : বিবিসি জানায়, গত বছর বাংলাদেশ থেকে একশরও বেশি নারী সিরিয়ায় পাচার হয়েছে। ইতিমধ্যে পাচার হওয়া নারীদের কয়েকজন দেশে ফিরে এসে নানা ধরনের নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন।

র্যাবের কর্মকর্তারা জানান, ফেরত আসা নারীদের অভিযোগের ভিত্তিতে পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযানে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। অন্তত তিনজন নারী দেশে ফিরে এসে নানা ধরনের নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন।

নির্যাতিত নারীদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে বিবিসি বাংলাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, বিষয়টি নিয়ে তাঁরা খুব বেশি এগোতে পারেননি। কারণ সিরিয়াতে ব্যাপক যুদ্ধের জন্য ওই সব নারীর অবস্থান নিশ্চিত হওয়া কঠিন। সেখানে কোনো বাংলাদেশি দূতাবাস নেই। একটি কনস্যুলেট ছিল সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে। যেসব পাসপোর্ট নম্বর পাওয়া গেছে তাতে দেওয়া জরুরি টেলিফোন নম্বরগুলো কাজ করছে না। এ ছাড়া পুরো বিষয়টি আসলে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সেখানেও কাজের সমন্বয়ের অভাব রয়েছে।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/আরকে 

উপরে