আপডেট : ১ মার্চ, ২০১৬ ১০:০৩
জাতীয় কাউন্সিল

চাপের মুখে বিএনপি

বিডিটাইমস ডেস্ক
চাপের মুখে বিএনপি

ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল সামনে রেখে বেশ চাপের মুখে পড়েছে বিএনপি। কারণ, হাতে আছে মোটে ১৮ দিন, অথচ এখনো কাউন্সিলের ভেন্যু বা স্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি দলটি। এ কারণে প্রচার ও প্রকাশনাসহ বিভিন্ন কাজও বিঘ্নিত হচ্ছে। দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা বলছেন, সরকার ইচ্ছা করেই বিএনপিকে অস্থিরতার মধ্যে রেখেছে।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই পল্টন থানায় নাশকতার তিন মামলায় গতকাল সোমবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জামিনের মেয়াদ আরো ১৫ দিন বাড়িয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। ১৫ দিন পর আদালতে হাজির হয়ে আবারও তাঁকে জামিনের জন্য আবেদন করতে হবে। কিন্তু সে সময় তাঁর জামিন মিলবে কি না তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। তাঁরা ধরণা করছেন, দলের স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য মির্জা আব্বাসকেও কাউন্সিলের সময় কারাগারে থাকতে হতে পারে।

ফখরুলের জামিন নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা কয়েক দিন ধরেই আলোচনা করছিলেন। কারণ, ১৯ মার্চ কাউন্সিলের দিন ফখরুল কারাগারের বাইরে থাকতে পারবেন কি না এ নিয়ে তাঁদের সংশয় রয়েছে। গতকাল জামিনের মেয়াদ মাত্র ১৫ দিন বাড়ায় সেই সংশয় আরো প্রবল হয়েছে। বলা হচ্ছে, সরকার বিএনপিকে সুষ্ঠুভাবে কাউন্সিল করতে দিতে চায় না। সরকার কূটকৌশলের আশ্রয় নিতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে চেয়ারপারসন ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনও টেনে ১৯ মার্চ নেওয়া হয়েছে। কারণ, বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা আশঙ্কা করছিলেন, কাউন্সিলের আগে ওই দুই পদে নির্বাচন হলে সরকার কৌশলে অন্য কাউকে দিয়ে ওই দুই পদে মনোনয়নপত্র কেনানোর মাধ্যমে জটিলতা সৃষ্টি করতে পরে।

তবে নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় খালেদা জিয়া বলেছেন, সরকার যত বাধার সৃষ্টিই করুক না কেন, জাতীয় কাউন্সিল তিনি এবার করবেনই।

বিএনপির একাধিক নেতা আলাপকালে জানিয়েছেন, পরিস্থিতি তেমন নাজুক হলে নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে, এমনকি প্রয়োজন হলে গুলশান কার্যালয়ের সামনেও কাউন্সিল আয়োজন করা হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আসলে বিএনপির কাউন্সিল ঘিরে যাতে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি না হয় সরকার এ জন্য নানা কৌশল করছে। সম্ভবত এ জন্যই ভেন্যু নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু তার পরও আমরা কাউন্সিল করব।’

কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রকাশনা উপকমিটির আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘বিএনপির কাউন্সিলের ভেন্যু বা স্থান নিয়ে সরকার আমাদের এক ধরনের চাপের মুখে রেখেছে। উদ্দেশ্য হলো, এই কাউন্সিলে লাখ লাখ লোকসমাগম হতে পারে বলে সরকার আশঙ্কা করছে। তাই শেষ মুহূর্তে হয়তো তারা বলবে তোমরা অমুক জায়গায় কাউন্সিল করো। এটি সরকারের দেউলিয়াপনা ছাড়া আর কিছুই নয়।’

এক প্রশ্নের জবাবে আবদুল্লাহ আল নোমান আরো বলেন, স্থান নির্ধারিত না হওয়ায় কাউন্সিলের প্রকাশনা-ছাপা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ অনেক প্রকাশনাতেই স্থান উল্লেখ করতে হয়। কাউন্সিল উপলক্ষে দলের পক্ষ থেকে অন্তত ১০টি পুস্তিকা প্রকাশ করা হবে। 

কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ বলেন, ‘সরকার কিছু কূটচাল দিচ্ছে সেটি বোঝা যায়। তবে আমরা সতর্ক আছি। তাই কাউন্সিলের কাজ এগিয়ে চলছে। কাউন্সিলের ভেন্যু নিয়ে সংশয় থাকায় আমন্ত্রণপত্র ছাপার কাজ এখনো শুরু করা যায়নি। তবে অন্যান্য কাজ এগিয়ে চলছে।’

আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির আহ্বায়ক বিশিষ্ট সাংবাদিক শফিক রেহমান জানান, বিএনপির কাউন্সিলে বিশ্বের অনেক দেশের রাজনৈতিক দলের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হবে। কিন্তু স্থান নিয়ে সংশয় থাকায় তাঁদের আমন্ত্রণ পাঠাতে বিঘ্ন হচ্ছে। সরকারের এটি বোঝা উচিত যে বিদেশিদের এখানে আসতে বেশ কিছু আনুষ্ঠানিকতা করতে হয়। অথচ এসব ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি করে তারা (সরকার) সংকীর্ণতার পরিচয় দিচ্ছে।

জানা গেছে, ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির প্রধান, সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়ারপারসন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মিয়ানমারের ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির প্রেসিডেন্ট অং সান সু চি, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রধানসহ বিশ্বের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি রাজনৈতিক দলের প্রধানদের কাউন্সিলে আমন্ত্রণ জানানো হবে।

গত রবিবার গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে কাউন্সিল উপলক্ষে গঠিত আন্তর্জাতিক উপকমিটির কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে উপস্থিত বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন জানান, কাউন্সিলে বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদদের আমন্ত্রণ জানানো হবে। বিশেষ করে সার্কভুক্ত সব দেশের রাজনৈতিক দলের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হবে।

দলের ষষ্ঠ কাউন্সিল অনুষ্ঠানের ভেন্যু হিসেবে ব্যবহার করার জন্য গত ২৪ জানুয়ারি তিনটি জায়গায় চিঠি দেয় বিএনপি। এর মধ্যে শুধু সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পুলিশের অনুমতি সাপেক্ষে ব্যবহার করা যাবে বলে সম্প্রতি গণপূর্ত বিভাগ বিএনপিকে চিঠি দিয়ে জানায়। আর একাধিকবার দেনদরবার করা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ জানায়, রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য ওই স্থান ভাড়া দেওয়া হয় না। যদিও বিএনপির পঞ্চম কাউন্সিল ওই স্থানে অনুষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি দলের বিভিন্ন কর্মসূচিও ওই স্থানে প্রায়ই হচ্ছে—বিএনপির পক্ষ থেকে এমন তথ্য ও যুক্তি তুলে ধরা হয়।  

ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন কর্তৃপক্ষ বিএনপিকে মৌখিকভাবে জানিয়েছে, কাউন্সিল আয়োজনের অনুমতি তারা দেবে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তারা এ ব্যাপারে বিএনপিকে কিছু জানায়নি। ফলে বিএনপি নেতারা ধরে নিয়েছেন, বিএনপির দলীয় জনসভার মতো এক বা দুই দিন আগে হয়তো সরকারের ইঙ্গিতে অনুমতি পাওয়া যাবে।

কিন্তু দলীয় নেতারা বলছেন, জনসভার ক্ষেত্রে এক-দুই দিন আগে অনুমতি পেলেও কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়। কারণ সেখানে আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন কমই হয়। কিন্তু কাউন্সিল করতে হলে বড় ধরনের মঞ্চ নির্মাণ, প্রচুর প্রকাশনা ও ছাপার কাজ, আমন্ত্রণপত্র ছাপা ও বিলি করা, কাউন্সিলরদের জন্য পরিচয়পত্র তৈরি ও বণ্টনসহ অনেক কিছুর প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া আপ্যায়ন করতে হয় কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে। সব মিলিয়ে একটি রাজনৈতিক দলের এক মাসের প্রস্তুতি ও প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়।

সর্বশেষ ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিএনপির কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল।    

চেয়ারপারসন, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে তফসিল : বিএনপির চেয়ারপারসন ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে দলীয় নির্বাচন কমিশন।

২৯ ফেব্রুয়ারি সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার এ তফসিল ঘোষণা করেন। তফসিল অনুযায়ী, ১৯ মার্চ কাউন্সিলের দিন ওই দুই পদে ভোট হবে। 

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেন, দুই শীর্ষ পদে নির্বাচন করতে চাইলে ২ মার্চ থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা যাবে, জমা দেওয়া যাবে ৪ মার্চ পর্যন্ত। ৫ মার্চ বাছাই হবে, ৬ মার্চ পর্যন্ত মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করা যাবে। নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে রিটার্নিং অফিসারের অস্থায়ী কার্যালয়ে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়া যাবে।

জমির উদ্দিন সরকার বলেন, এ দুই পদে প্রার্থী হতে বয়স হতে হবে অন্তত ৩০ বছর। তাঁকে দলের চাঁদাদাতা সদস্য হতে হবে।

 

সূত্র: কালের কণ্ঠ

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জেডএম

 

উপরে