আপডেট : ১ মার্চ, ২০১৬ ০৯:৩১

শেষ হলো প্রাণের মেলা, মোট বই বিক্রি ৪০ কোটিরও বেশি

বিডিটাইমস ডেস্ক
শেষ হলো প্রাণের মেলা, মোট বই বিক্রি ৪০ কোটিরও বেশি

শেষ হলো মাসব্যাপী একুশে বইমেলা ২০১৬। সেইসঙ্গে ভাঙলো লাখো-কোটি বাঙালীর মিলনমেলা। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান শান্তিপূর্ণভাবে বইমেলা শেষ হওয়ার কথা উল্লেখ করে জানান, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকায় নির্বিঘ্নে বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জঙ্গিবাদের কথা মাথায় রেখে ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। তাই কোন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছাড়াই সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে বইমেলা।

২৯ দিনের মেলায় নতুন বই এসেছে ৩ হাজার ৪৪৪টি। এছাড়া একাডেমির নজরুল মঞ্চ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে মোট ৫৩৫টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচিত হয়েছে। মহাপরিচালক বলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্টল মালিকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও আজকের সম্ভাব্য বিক্রি যুক্ত করে এবারের গ্রন্থমেলায় মোট বিক্রি ৪০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ২০১৫ ও ২০১৪ সালের গ্রন্থমেলায় যথাক্রমে মোট বিক্রি হয়েছে ২১ কোটি ৯৫ লাখ ও ১৬ কোটি টাকা। মেলার পরিসর ও প্রকাশনা সংস্থার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় গতবারের তুলনায় এবার প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ বিক্রি হয়েছে।

মেলার কমিটির সদস্যসচিব ড. জালাল আহমেদ বলেন, বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত বইয়ের চাহিদা থাকে সবসময়ই। এবারও মেলায় বাংলা একাডেমির প্যাভিলিয়নসহ বিভিন্ন স্টল ও বিক্রয় কেন্দ্র থেকে একাডেমির বিক্রিত বইয়ের পরিমাণ ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ২০১৫ ও ২০১৪ সালে বাংলা একাডেমি যথাক্রমে বই বিক্রি করেছে ১ কোটি ৫৮ লাখ ৩৫ হাজার ২৫৮ টাকা ও ১ কোটি ১৮ লাখ ৯ হাজার ১৭৬ টাকা। গতবারের তুলনায় এবার বাংলা একাডেমির বিক্রি ৮ লাখ ৩৫ হাজার ২৫৮ টাকা কম হয়েছে।

৪ স্টল সিলগালা
মেলার নীতিমালা ভঙ্গ ও কপিরাইট আইন অমান্য করার অপরাধে এবারের মেলায় অংশ নেয়া চারটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের স্টল বন্ধ করে দেয়া হয়। ‘রঙিন ফুল’সহ তিনটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের স্টল বন্ধ করা হয় কপিরাইট আইনের আওতায়। মেলার নীতিমালা ভঙ্গের অভিযোগে বন্ধ করা হয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ব-দ্বীপের স্টল।

নতুন বই
একুশে বইমেলার আজ সমাপনী দিনে নতুন বই এসেছে ১৪০টি এবং মাসব্যাপী পুরো মেলায় বই প্রকাশিত হয়েছে ৩ হাজার ৪৪৪টি। মাসব্যাপী গ্রন্থমেলায় সবচেয়ে বেশি এসেছে কবিতার বই ৯৩৯টি। এরপরেই আছে উপন্যাস ৫২৯টি, গল্প ৫০৩টি, প্রবন্ধ ১৯৭টি, শিশুতোষ ১৬২টি, ছড়া ১১২টি, মুক্তিযুদ্ধ ১০১টি উল্লেখযোগ্য। মূলমঞ্চ সন্ধ্যায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় একুশে গ্রন্থমেলার সমাপনী অনুষ্ঠান। এতে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি সচিব আক্তারী মমতাজ। শুভেচ্ছা বক্তৃতা প্রদান করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। বইমেলার প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন একুশে বইমেলার সদস্যসচিব ড. জালাল আহমেদ। বক্তব্য দেন ইভেন্ট সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইভেন্ট টাচ ইন্টারন্যাশনালের সিইও মেজর (অব.) মাইনুল হাসান।

অনুষ্ঠানে প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চায় অবদানের জন্য ফরাসি গবেষক ও অনুবাদক ফ্রাঁস ভট্টাচার্য ও প্রবাসী বাঙালি কথাশিল্পী মন্জু ইসলামকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ পুরস্কার-২০১৫ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করা হয়। ফ্রাঁস ভট্টাচার্য অনুপস্থিত থাকায় তার পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেন রামেন্দু মজুমদার। পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদের হাতে পুরস্কারের অর্থমূল্য ৫০ হাজার টাকার চেক, পুষ্পস্তবক, সনদ এবং ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে ২০১৫ সালে প্রকাশিত বিষয় ও গুণমানসম্মত সর্বাধিক সংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য মাওলা ব্রাদার্সকে চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার ২০১৬, ২০১৫ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে গুণমান ও শৈল্পিক বিচারে সেরা গ্রন্থের জন্য ভূমেন্দ্র গুহ সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের মূলানগ পাঠ-ভূমিকা ও কবিতা গ্রন্থের জন্য বেঙ্গল পাবলিকেশনস্ লিমিটেড, বুলবুল আহমেদ সম্পাদিত Buddhist Heritage of Bangladesh গ্রন্থের জন্য নিমফিয়া পাবলিকেশন ও শেখ তাসলিমা মুন রচিত আমি একটি বাজপাখিকে হত্যা করতে চেয়েছিলাম গ্রন্থের জন্য পাঠসূত্রকে মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০১৬, ২০১৫ সালে প্রকাশিত শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণমান বিচারে সর্বাধিক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য ময়ূরপঙ্খিকে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার ২০১৬ এবং ২০১৬ সালের একুশে বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে থেকে নান্দনিক অঙ্গসজ্জায় সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সময় প্রকাশন, মধ্যমা পাবলিকেশন ও জ্যার্নিম্যান বুকস্কে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০১৬ প্রদান করা হয়। পুরস্কারপ্রাপ্ত সকল প্রকাশককে ২৫ হাজার টাকার চেক, সনদ ও ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।

বেস্ট সেলার বই
একুশে বইমেলায় জনপ্রিয় লেখক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখা বই বেস্ট সেলারের তালিকায় আছে। এবার মেলায় এই লেখকের বই এসেছে পাঁচটি। এগুলোর মধ্যে একটি প্রবন্ধ সংকলন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তাম্রলিপি থেকে আসা এ লেখকের সায়েন্সফিকশন ‘ক্রেনিয়াল’ বইটি বিক্রির তালিকায় শীর্ষে। প্রায় একইরকম বিক্রি হয়েছে সময় থেকে আসা কিশোর উপন্যাস ‘স তে সেন্টু’, চন্দ্রদ্বীপের ‘দুষ্টু হাতি এবং ইঁদুর’, কাকলীর ‘তিতুনি এবং তিতুনি’। জাফর ইকবালের পরপরই আনিসুল হকের বইয়ের বিক্রি ভাল বলে জানা গেছে। এই লেখকের নতুন উপন্যাস দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিক্রির তালিকায় আছে। প্রথমা থেকে প্রকাশিত তার ‘জেনারেল ও নারীরা’ বিক্রির শীর্ষে। মেলায় ঐতিহ্য থেকে আসা ‘মাফরাফি’ শিরোনামের বইটি বিপুল পরিমাণে বিক্রি হয়েছে।

ঐতিহ্যর প্রধান বিক্রয় কর্মকর্তা কাজল তালুকদার জানান, বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ক্যাপ্টেনের জীবনী নির্ভর এ বইটি তাদের বেস্ট সেলার। পাঠক সমাবেশ থেকে আসা ‘মীর মশাররফ হোসেন: অপ্রকাশিত ডায়েরি’, ‘প্লেটো রিপাবলিক’ ও ‘ভাষান্তরসমগ্র’ প্রচুর বিক্রি হয়েছে। জার্নিম্যান বুকস থেকে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও লেখক মুনতাসীর মামুনের ‘ঢাকার খাল পোল ও নদীর চিত্রকর’ বিক্রিও বেশ ভাল। সিরিয়াস বইগুলোর মধ্যে প্রচুর বিক্রি হয়েছে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বই ‘জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি’। সংহতি থেকে গতবার মেলায় আসা বইটি এবার নতুনের মতই বিক্রি হয়েছে। মেলায় বইয়ের দুইটি সংষ্করণ শেষ হয়েছে। অ্যাডর্ন থেকে আসা পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা বইয়ের অনুবাদ ‘আমার বাবা রবীন্দ্রনাথ’ প্রচুর বিক্রি হয়েছে। ভাল বিক্রির তালিকায় ছিল একই প্রকাশনী থেকে আসা আবুল কাসেমের মহাভারতকেন্দ্রীক উপন্যাস ‘অনার্যজন’। ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকার ‘ইয়ের্মা’ কিংবা বিশ্বজিৎ ঘোষের ব্যতিক্রমী ভাবনার ‘নৈঃসঙ্গ্যচেতনা’ বইগুলোরও বিক্রি ছিল খুব ভালো।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জেডএম

 

উপরে