আপডেট : ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ১৬:৫১

বাঙালিত্ব ত্যাগ করেও আসামে পরদেশী হয়েই রইলেন মুসলমানরা

বিডিটাইমস ডেস্ক
বাঙালিত্ব ত্যাগ করেও আসামে পরদেশী হয়েই রইলেন মুসলমানরা

‘একুশের চেতনা’ বাক্যবন্ধটি বাংলাদেশে প্রায়শই ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সে ইসলামি মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনই হোক, সংখ্যালঘুদের আস্থা ফেরানো, পাকিস্তানপন্থী খুনে জামাত নেতাদের ফাঁসি চেয়ে হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর সাহবাগ চত্বরে ধর্না বা গোটা বাংলাদেশ জুড়ে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের রমরমা— সব ক্ষেত্রেই সামনে উঠে আসে ‘একুশের চেতনা’। একুশের চেতনা বলতে আমরা যেটুকু বুঝেছি তা হল, একটা সর্বৈব সেকুলার বাংলাদেশ গড়ে তোলার আকাঙক্ষা, যেখানে সংখ্যালঘু মানুষ নিশ্চিন্ত নিরাপত্তায় বাস করবে। বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা তারা স্বপ্নেও ভাববে না। পাকিস্তানপন্থী কট্টর ধর্মীয় রাজনীতিকে নিকেশ করে বাংলার চিরায়ত সহনশীল ইসলামের ধারাবহিকতাকে সচল রাখা। আর প্রাত্যহিক ব্যবহারে, মননে, জীবনচর্যায় বাংলা ভাষার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার কায়েম করা। সর্বোপরি একুশের চেতনা হল মাতৃভাষা যে ‘মাতৃদুগ্ধ’ তা সর্বতো ভাবে মেনে নেওয়া।

এ নিয়ে কারও কোনও সন্দেহ থাকার কথা নয়। কিন্তু আমরা বরং এ বারের ‘একুশে’ উপলক্ষে সেই মানুষগুলোর কথা বলব, যারা স্বেচ্ছায় মাতৃভাষা ত্যাগ করে ভিন্ন এক ভাষাকে মাতৃভাষা হিসেবে মেনে নিয়েছে। আশ্চর্য সেই জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের সেই মানুষগুলোর রক্ত, মজ্জা, সামাজিক বাঁধন, ভাষা, উচ্চারণ, ধর্ম এবং সাংস্কৃতিক ধারাবহিকতার শরিক যাঁরা রক্ত দিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি ঘটিয়েছিলেন। যাঁরা একুশেকে বিশ্বে মাতৃভাষা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। বহু বহু বছর ধরে তারা বাংলাদেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলো থেকে অভিবাসন করে নামনি অসমে ব্রহ্মপুত্র নদীর চর এলাকায় বসত পেতেছিল। এবং অবশ্যই কঠিন দারিদ্র থেকে পালিয়ে দু’বেলা খেয়েপরে বাঁচার জন্য।

নামনি অসমে ব্রহ্মপুত্র নদীর অসংখ্য দ্বীপ এবং চরে একশো বছর ধরে যে গ্রামগুলি গড়ে উঠেছে সেখানকার বাসিন্দারা কেবল বাঙালিই নয়, বাঙালও বটে। কারণ তারা সবাই অসমে এসেছিল তদানীন্তন পূর্ববঙ্গ থেকে। তাই অসমে তাদের অনেকেই বলে ‘পূর্ববঙ্গমূলীয় মুসলমান’। চরের বাসিন্দা বলে কেউ বলে ‘চরুয়া মুসলমান’। অসমিয়ারা বলে ‘চর-চাপরি মুসলমান’। তবু চরের ওই সব গ্রামে একটিও বাংলা স্কুল নেই। সবই অসমিয়া স্কুল। সেখানে অসমিয়া, হিন্দি বা আরবি পড়ানো হলেও একটি স্কুলেও বাংলা পড়ানো হয় না। কারণ তারা ‘বাংলা’ ত্যাগ করে ১৯৫১ সালের জনগণনায় মাতৃভাষা ‘অসমিয়া’ লিখিয়েছিল। তা কি স্রেফ প্রাণে বাঁচতে নাকি অসমের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে আত্মীকরণের কোনও ঐকান্তিক তাড়নায়? পঞ্চাশ বছর পরেও তারা অসমে ‘অপর’ হয়ে আছে, ‘বিদেশি’, ‘বাংলাদেশি’ এবং ‘অনুপ্রবেশকারী’ হয়ে আছে— এই নিয়ে সংঘাত আর বিতর্কেরও শেষ হয়নি।

উনিশ শতকের শেষের দিকে পূর্ববঙ্গের দরিদ্র মুসলমান চাষিরা অসমে যেতে শুরু করে। ওই চাষিদের ব্রিটিশ সরকার অসমে নিয়ে গিয়েছিল রীতিমতো পরিকল্পিত ভাবেই। ওই সময় ব্যাপক ভূমিকম্প এবং কালাজ্বর আর ম্যালেরিয়ায় অসমে বহু লোক মারা যায়। তাতে ফসল উত্‌পাদনে ভীষণ রকমের মন্দা দেখা দেয়। বহু জমি পতিত হয়ে যায়। এ ছাড়া অসমে চা বাগান পত্তনের পরে ছোটনাগপুর, ওড়িশা এবং অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক নিয়ে যাওয়ায় খাদ্যশস্যের চাহিদাও প্রচুর বেড়ে যায়। কৃষি উত্‌পাদন বাড়িয়ে এই রকম একটা পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্যই ইংরেজরা পূর্ববঙ্গ থেকে দরিদ্র মুসলমান চাষিদের অসমে নিয়ে যেতে শুরু করে। কারণ ব্রিটিশ শাসকরা জানত, পূর্ববঙ্গের ওই চাষিরা জমি হাতে পেলে মাটিতে সোনা ফলাতে পারে। মূলত ভূমিক্ষুধা, হিন্দু জমিদারদের অত্যাচার এবং অজানা পৃথিবীর রঙিন স্বপ্ন তাদের টেনে নিয়ে গিয়েছিল অসমে।

১৮৮৫ সালের পরে ব্রিটিশ সরকার পূর্ববঙ্গের মূলত ময়মনসিং, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর এবং অল্পবিস্তর জলপাইগুড়ি এবং কোচবিহার প্রভৃতি জেলার মুসলমান চাষিদের অসমে নিয়ে যাওয়ার জন্য নানা ভাবে উত্‌সাহিত করতে শুরু করে। অসমে যেতে ইচ্ছুক চাষিদের জন্য ‘ফ্যামিলি টিকিট’ চালু করে ব্রিটিশ সরকার। চাষিরা পাঁচ টাকার সেই টিকিট কিনে ট্রেনে, স্টিমারে বা জাহাজে অসমের যে কোনও অঞ্চলে যাওয়ার সুযোগ পেত। এবং কৃষিকাজে উত্‌সাহ দিতে তাদের তিন বছরের খাজনাহীন জমি পত্তনের সুযোগ দেওয়া হয়। ১৯০২ সালে পূর্ববঙ্গ থেকে অসম পর্যন্ত রেলপথ তৈরির পরে বিপুল সংখ্যায় পূর্ববঙ্গীয় মুসলমান চাষি অসমে যেতে শুরু করে। ১৯০৫ সালে বাংলা ভাগ করে পূর্ববঙ্গের জেলাগুলোর সঙ্গে অসমকে জুড়ে নতুন প্রদেশ তৈরি করলে বিপুল সংখ্যায় প্রব্রজন ঘটতে থাকে। এই প্রব্রজন ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। প্রব্রজনের ফলে অসমের জনবিন্যাসে অল্প সময়ের মধ্যে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে। হঠাৎ পরিবর্তনের সেই অভিঘাত স্থানীয় অসমিয়া এবং উপজাতিদের ক্ষিপ্ত করে তোলে। তার ফলে অভিবাসীদের সঙ্গে স্থানীয়দের সংঘাত হয়েছে বার বার। তার পরেও পূর্ববঙ্গ থেকে অসমে ঢোকা কিন্তু কমেনি।

বিভিন্ন জেলায় পূর্ববঙ্গীয় মুসলমানদের জনসংখ্যার হার থেকে তার একটা ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে। ১৯০১ সালের জনগণনা অনুযায়ী অসমে মুসলিম ছিল ১৫ শতাংশের কাছাকাছি। ১৯৫১ সালে সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ২৪.৭ শতাংশে। ১৯৯১-এর আদমসুমারিতে বেড়ে হয়েছে ৩০.৯ শতাংশ। অসমে মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার জাতীয় গড়ের থেকে অনেকটাই বেশি। ২০১১-র আদমসুমারি তথ্য অনুযায়ী অসমের মোট জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশ মুসলমান। নামনি অসমে নয়টি জেলার মধ্যে সাতটিতে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ। ২০০১-এ নামনি অসমের পাঁচটি জেলা ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। ২০১১-র জনগণনা রিপোর্টে দেখা গেল আরও দু’টি জেলা যুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া কামরূপ এবং নলবাড়ি জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা গত দশ বছরে এতটাই বেড়েছে যে সেখানে হিন্দু জনসংখ্যার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। জনসংখ্যার এই দ্রুত ক্রমবর্ধমান বিন্যাস থেকে আমরা বুঝতে চাইছি পূর্ববঙ্গমূলীয় মুসলমান সেখানে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেও যথেষ্ট শক্তিশালী হয়েও আজও এত ভীত সন্ত্রস্ত্র কেন!

পূর্ববঙ্গ থেকে আসা ওই মানুষেরা গোড়ার দিকে স্থানীয় অসমিয়া এবং আদিবাসীদের বিস্তর বিরোধিতার মুখে পড়েছিল। ঘর জ্বালিয়ে, ফসল নষ্ট করে তাদের উৎখাত করার চেষ্টাও হয়েছে। টিকে থাকার জন্য লড়াই করতে হয়েছে বিস্তর। সেই লড়াইয়ে মৌলানা ভাসানির মতো প্রবাদপ্রতিম নেতারাও নেতৃত্ব দিয়েছেন। ত্রিশ এবং চল্লিশের দশক জুড়ে নানবিধ লাঞ্ছনা সইতে সইতে চরের বাঙালি মুসলমান শান্তিতে চাষবাস করার সুযোগ পাওয়ার বিনিময়ে নিজেদের অসমিয়া হিসেবে পরিচয় দেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিল। তবে, এর পিছনে তদানীন্তন মুসলমান রাজনৈতিক নেতাদের প্ররোচনা কম ছিল না। স্বাধীনতার পরে অসমের সেই নেতারা পাকিস্তানে চলে যাওয়ার আগে চরের মুসলমানদের পরামর্শ দিয়ে যান, ভাষার জন্য আর সংঘাতে না গিয়ে বরং অসমিয়া ভাষাকে গ্রহণ করে নেওয়াই শ্রেয়। ভাষাটা যাক, অন্তত ধর্মটা বাঁচুক।

পূর্ববঙ্গ থেকে আসা চর এলাকার তাবত্‌ বাঙালি মুসলমান সেই সিদ্ধান্ত মতো ১৯৫১ সালের জনগণনায় নিজেদের মাতৃভাষা বাংলা না লিখিয়ে অসমিয়া লেখায়। পাঁচ দশক ধরে তারা চরের গ্রামগুলোতে তিল তিল করে যে সমস্ত বাংলা মাধ্যম স্কুল গড়ে তুলেছিল, অসমিয়াদের সন্তুষ্ট করতে তার অনেকগুলোই নিজের হাতে পুড়িয়ে দেয়। ওই সব এলাকার বাকি বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলো রাতারাতি অসমিয়া মাধ্যমের স্কুলে পরিণত করে ফেলে। হাট-বাজারের মতো প্রকাশ্য জায়গায় তারা আড়ষ্ট এবং অক্ষম ভাঙাচোরা অসমিয়া ভাষা বলতে শুরু করে। শুরু হয় তাদের আত্ম-প্রবঞ্চনার গ্লানিময় অধ্যায়। অসমিয়া ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে ভাগ্যতাড়িত ওই জনগোষ্ঠীর স্বাভাবিক আত্মীকরণের প্রক্রিয়া কখনও শুরুই হয়নি। বরং স্রেফ প্রাণ বাঁচাতে তারা মাতৃভাষা ত্যাগ করেছিল। ইতিহাসে সম্ভবত এর কোনও নজির নেই।

নামনি অসমের সেই চরবাসীরা প্রাণপণে বাঙালিত্ব বর্জনের চেষ্টা চালিয়েছে, অথচ ৬২ বছরে সে আজও ‘অসমিয়া’ হয়ে উঠতে পারেনি। অসমিয়াদের কাছে সে বড়জোর ‘ন অসমিয়া’ (নতুন অসমিয়া)। তাকে এখন স্রেফ ‘মুসলমান’ পরিচয়ে বেঁচে থাকতে হয়। নামনি অসমের মুসলমানেরা সম্ভবত বিশ্বের একমাত্র মানবগোষ্ঠী যাদের কোনও জাতি বা ভূমি পরিচয় নেই। তাদের পরিচয় কেবল ‘মুসলমান’। তারা বাঙালি তো নয়ই, অসমিয়াও নয়। অসমে জাতিভিত্তিক যে তালিকা তৈরি হয় সেখানে নেপালি, বিহারি, মারোয়ারি, মিসিং, ডিমাসা, অহোম, নাগা, মণিপুরি এবং বাঙালির পাশাপাশি থাকে ‘মুসলমান’। আবার সরকারি নথিতে তারা ‘অসমিয়া’ হলেও বাড়িতে, গ্রামে এবং নিজেদের মধ্যে কিন্তু সেই বাংলাভাষীই। কেবল বাড়িতেই তারা বাংলায় কথা বলে না, স্কুলে বা মসজিদে এবং সামাজিক মেলামেশাতেও তাদের ভাষা বাংলা। এমনকী, নিজেদের সাবেক রংপুর, ময়মনসিংহ বা বগুড়ার পরিচয় পর্যন্ত ত্যাগ করেনি তারা। বাঙালি মুসলমানের অসমিয়া হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সে তার ‘বাঙালিত্ব’ বিসর্জন দেওয়ায় অসমে একমাত্র হিন্দু বাঙালিরাই ‘বাঙালি’। সেখানে ‘মুসলমান’রাও বাংলাভাষী হিন্দুদের ‘বাঙালি’ বলে চিহ্নিত করে।

এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ‘অনুপ্রবেশ’-এর রাজনীতি এবং অত্যন্ত জোরালো একটা প্রচার। আসু, অগপ এবং বিজেপি-র ক্রমাগত প্রচারে আসমের বেশির ভাগ মানুষ এখন বিশ্বাস করে, চরের ‘বাংলাদেশি’ মুসলমানরা অনুপ্রবেশকারী এবং অবাধ অনুপ্রবেশ চলছেই। সরকারি কোনও তথ্য না থাকলেও ওই রাজনৈতিক দলগুলির দাবি, অসমে ‘বিদেশি’ আছে ৫১ লাখেরও বেশি। অথচ তারা বাংলা ত্যাগ করে অসমিয়াকে মাতৃভাষা হিসেবে লেখানোর ফলে অসমিয়ারা কয়েক দশক পরে অসমে ভাষিক সংখ্যাগরিষ্ঠের মর্যাদা পায়। ১৯৩১ সালে অসমে অসমিয়াভাষী ছিল ৩১.৪ শতাংশ। ১৯৫১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৬.৭ শতাংশ। অন্য দিকে অসমের বাংলাভাষী ২৬.৮ শতাংশ (১৯৩১) থেকে কমে হয় ১৬.৫ শতাংশ (১৯৫১)।

মাতৃভাষা ত্যাগ করেও কিন্তু তারা অসমে ‘আপন’ হতে পারেনি। মাতৃভাষা হারানো সেই বাঙালি মুসলমানের সঙ্কট অনির্বচনীয়। মাতৃভাষা ত্যাগ করেও তারা অসমে ‘অপর’ হয়েই রয়েছে। সে আবার বাঙালি হিন্দুর কাছেও ‘অপর’। সে অসমিয়া মাধ্যমে পড়াশোনা করে। কিন্তু বাড়িতে বগুড়া বা ময়মনসিংহের টানে বাংলা বলে। ঠিক করে অসমিয়া বলতে পারে না, চারটে বাংলা মিশে যায়। আবার ভাল করে বাংলা বলতে পারে না, কথার মধ্যে অসমিয়া ঢুকে পড়ে। তা হলে তারা ঘুরে দাঁড়াচ্ছে না কেন? তাদের বক্তব্য, সময় হয়নি। তবে ‘একদিন সময় নিশ্চয়ই আসবে’, এমনই আশা তাদের।

মাতৃভাষা হারানো সেই বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক সঙ্কটও কম নয়। পুরোদস্তুর অসমিয়া হয়ে উঠতে গিয়ে তারা মাতৃভাষার সঙ্গে পুব বাংলা থেকে বয়ে আনা সংস্কৃতিটাও বিসর্জন দিয়েছে। নামনি অসমের জেলায় জেলায় ওই নব্য অসমিয়াদের মহল্লাগুলোয় ঘুরলে তা টের পাওয়া যায়। মসজিদ আর মাদ্রাসাকেন্দ্রিক ধর্মভিত্তিক সংস্কৃতি ছাড়া তাদের কার্যত কোনও সাংস্কৃতিক অবলম্বন নেই। ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, মুরশিদি, ফকিরি, সহজিয়া, বাউল, যাত্রাপালা, এমনকী সারি-জারি-মর্শিয়া গানও তারা হারিয়ে ফেলেছে। ওই গ্রামগুলোতে জুম্মার নমাজের সময় মসজিদে খোতবার ভাষণটা কিন্তু বাংলাতেই দেন ইমাম সাহেব। কিংবা গ্রামে গ্রামে যে উরস বা জলসার আয়োজন হয়, বক্তারা সেখানে বাংলাতেই ধর্মীয় প্রবচন দিয়ে থাকেন।

এখন অসমে তারা প্রায়শই হীন অর্থে এবং ব্যঙ্গার্থে ‘মিয়াঁ’ এবং বহিরাগত অর্থে ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে পরিচিত। এই অপমানের পরিচয় তাদের নিত্যসঙ্গী। অথচ, অসমিয়া হয়ে ওঠার তাগিদ তাদের এত বেশি যে প্রতিবেশী হিন্দু বাঙালির সঙ্গে তারা ভাষাতুতো সম্পর্কটুকু রাখতেও দ্বিধান্বিত। এমনকী, যখন ১৯৬০-’৬১ সালে বরাক উপত্যকার বাঙালিরা মাতৃভাষায় শিক্ষার দাবিতে আন্দোলন করে এবং পুলিশের গুলিতে ১১ জনের মৃত্যু হয় তখনও পূর্ববঙ্গীয় ওই চরের মুসলমানেরা তাদের সঙ্গ দেয়নি। অথচ মাতৃভাষা ত্যাগ করার এত দিন পরেও তাদের হাস্যকর ভাবে নিজেদের অসমিয়া প্রমাণ করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়।

‘বাংলাদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের যে ভাবে লাঞ্ছিত এবং অপমানিত করা হয় সেখানে পুলিশ, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দলগুলো সমান ভাবে যুক্ত। ভোটের রাজনীতিতে তারা স্রেফ ভোটব্যাঙ্ক। খুব দুর্বল এবং নড়বড়ে হলেও একটা অন্য রকম স্বর যেন শোনা যাচ্ছে। প্রত্যেক বার আদমসুমারির আগে মাতৃভাষা ‘বাংলা’ লেখানোর একটা তোড়জোড় শুরু হয়। কিন্তু, সেই বিচ্ছিন্ন সংকল্পগুলোকে জোড়া দিয়ে বড় একটা আন্দোলন গড়ে তোলার মতো উপযুক্ত রাজনৈতিক উদ্যোগ না থাকায় শেষ পর্যন্ত তা কিছু ব্যক্তিগত সদিচ্ছার অপমৃত্যু হিসেবে থেকে যায়। প্রত্যাঘাত অবশ্যম্ভাবী জেনেও কেউ কেউ স্বপ্ন দেখেন শিকড়ে ফেরার। গভীর ব্যথায় ধপড়ির গিয়াসুদ্দিন যখন বলেন, ‘নিজের জিহ্বা কাইট্যা দিসি।’ এবং ‘তার বিনিময়ে কী পাওয়া গেল তার হিসেবটা বুঝে নেওয়ার সময় এসেছে’, তখন কি কোথাও ‘একুশের চেতনা’র স্পর্শ থাকে! থেকে যায়!

উপরে