আপডেট : ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ১১:২৯

প্রিয় শালীন, ক্ষমা করে দিয়ো, আমরা কিছুই করতে পারিনি...

বিডিটাইমস ডেস্ক
প্রিয় শালীন, ক্ষমা করে দিয়ো,  আমরা কিছুই করতে পারিনি...

উত্তরায় গ্যাসের আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া শালীন বিন নাওয়াজ। শালীন রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্র ছিল। প্রিয় ছাত্রকে হারিয়ে শোকাতুর রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ প্রিন্সিপাল এম এম সালেহীন। তিনি তাঁর ফেসবুকে স্ট্যাটাসে শুনিয়েছেন মায়াকান্নার শোককথা। স্ট্যাটাসের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন শালীনের স্কুলে ভর্তি হওয়ার ফর্ম, জেডিসি পরীক্ষায় সব বিষয়ে এ প্লাস পাওয়া তার নম্বরপত্র এবং যুক্তরাষ্ট্রে এক বছরব্যাপী ‘ইয়েস প্রোগ্রামে’ যাওয়ার জন্য তার নিজের হাতে লেখা আবেদনপত্রটি।

গত শনিবার রাতে দিয়েছেন ফেসবুকের ‘হ্যালো প্রিন্সিপাল আরইউএমসি’ পেজে। তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসটি ছিলো এরকম।    

‘আরইউএমসির (রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ) প্রিন্সিপাল হিসেবে আজকে সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিনের মুখোমুখি হতে হলো আমাকে। শোক প্রকাশের কোনো ভাষা নেই। সকালে টেবিলের ওপর একটি ফাইলে এই কাগজগুলো পেলাম। সব শেষ। ফাইলটা বন্ধ করে দিলাম। আমার বাচ্চাটা এখন বরিশালের কোথাও চিরশান্তির ঘুম ঘুমাচ্ছে। ওর বাবা আজ বিকেলে মারা গেছেন। জানতেও পারেননি ছেলের ভাগ্যে কী ঘটেছে। ...প্রিয় শালীন, ক্ষমা করে দিয়ো। আমরা কিছুই করতে পারিনি...।’

এম এম সালেহীন বলেন, ‘টেবিলের ওপর কাগজগুলো দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি। প্রচণ্ড মনঃকষ্টে দিন পার করার পর রাতে এই স্ট্যাটাসটা দিয়েছি। জানি এতে ওর কিছু হবে না। তবু নিজেকে ব্যর্থ সান্ত্বনা দেওয়া।’

২৬ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার সকালে উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ৮ নম্বর বাড়ির সপ্তম তলার একটি ফ্ল্যাটে গ্যাসের আগুনে দগ্ধ হন শালীনের পরিবারের সবাই। ফ্ল্যাটটিতে কয়েক দিন আগে স্ত্রী ও তিন ছেলেকে নিয়ে ওঠেন ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের প্রকৌশলী মো. শাহনাওয়াজ (৫০)। আগুনে দগ্ধ হয়ে তাঁর ছোট ছেলে জায়ান বিন নাওয়াজ এবং বড় ছেলে শালীন বিন নাওয়াজ শুক্রবারই মারা যায়। একদিন পর শনিবার বিকেলে মারা যান শাহনাওয়াজ। ৯০ শতাংশ পোড়া শরীর নিয়ে শালীনের মা সুমাইয়া খানম বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে রয়েছেন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। চিকিৎসকেরা বলছেন, তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক।

সুমাইয়াকে গতকাল বিকেলে সার্বক্ষণিক পরিচর্যা কেন্দ্র (এইচডিইউ) থেকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়েছে। বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়কারী সামন্ত লাল সেন বলেন, শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হওয়ায় এই স্থানান্তর।

শনিবার ছিল শালীনের স্কুলের শিক্ষাসফর। বন্ধু ও সহপাঠীদের সঙ্গে তার যাওয়ার কথা ছিল সোনারগাঁয়ে। তার মৃত্যুর খবর পেয়ে ওই দিনের স্কুলের সব কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। শনিবার সকাল সাড়ে সাতটায় তার জন্য আয়োজন করা হয় বিশেষ অ্যাসেমব্লির। ওই দিনই দুপুর সাড়ে ১২টায় স্কুল প্রাঙ্গণে শালীন ও তার ছোট ভাইয়ের জানাজা হয়। রাতে বরিশালে নানার বাড়িতে তাদের দাফন করা হয়।

শালীন তারা বাবা শাহনাওয়াজ, ছোট ভাই জায়ানের মৃত্যু তাঁদের স্বজনবন্ধুদের ভাসিয়েছে শোকের সাগরে। মেজো ছেলে জারিফ বিন নাওয়াজ (৬ শতাংশ দগ্ধ) এখন চিকিৎসা নিচ্ছে একটি বেসরকারি হাসপাতালে। তাকে এখনো জানানো হয়নি বাবা ও দুই ভাইয়ের পরিণতির কথা। জানানো হয়নি মায়ের কথা।

নয় ভাইবোনের মধ্যে সুমাইয়া সবার ছোট। পড়াশোনা করেছেন বরিশাল উইমেন্স কলেজে। বাড়ি বরিশাল শহরেরই নবগ্রাম সড়কে। বড় হয়েছেন বাবা, মা, ভাই-বোনের আদর পেয়ে। সেই সুমাইয়ার কষ্ট এখন সহ্য করতে পারছেন না তাঁর স্বজনেরা।

সুমাইয়ার ভাই আবুল হাসানাত খান বলেন, ‘আমাদের সবার ছোট বোন। ওর কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না।’ কথা শেষ করতে পারেন না হাসানাত, কান্নায় ভেঙে পড়েন।

শাহনাওয়াজের লাশ গতকালও ঢাকা মেডিকেলের মর্গে ছিল। তাঁর ভাই কামরুল আহসান বলেন, আজ সোমবার শাহনাওয়াজের লাশ ঝালকাঠিতে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে জানাজা শেষে বাবার কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হবে।

এদিকে আগুনের ঘটনায় কামরুল আহসানের করা অপমৃত্যু মামলার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মিজানুর রহমান বলেন, গ্যাসলাইনে ত্রুটি, আগুনের উৎপত্তি, বিস্তার এবং ভবনের নকশার বিষয়ে জানতে তিতাস গ্যাস, ফায়ার সার্ভিস এবং রাজউককে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এসব সংস্থা থেকে মতামত এলে বোঝা যাবে কারও গাফিলতির কারণে ঘটনাটি ঘটেছে কি না।

 

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জেডএম

উপরে