আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ১৮:০৬

হাসপাতালে জামাই আদরে আছেন সাংসদপুত্র

বিডিটাইমস ডেস্ক
হাসপাতালে জামাই আদরে আছেন সাংসদপুত্র

গত বৃহস্পতিবার বেলা আড়াইটা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-২-এর দশম তলার ভিআইপি কেবিন থেকে বেরিয়ে এলেন চল্লিশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। পেছনে দুই কারারক্ষী। ওই ব্যক্তি কর্তব্যরত নার্সের কাছে এসে জানতে চান, চিকিৎসা ফাইল দেখা শেষ হয়েছে কি না। নার্স না সূচক জবাব দিলেন।
এরপর একটু থেমে থেকে ব্যক্তিটি উপস্থিত ব্যক্তিদের বলতে থাকেন, ‘স্পাইনাল কর্ডের সমস্যায় আমাকে ভোগাচ্ছে। রাতে ঘুম হয় না। এর আগেও আমি বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি হতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানের পরিবেশ খারাপ, তাই ভর্তি হইনি।’ বলতে বলতে তিনি হাসপাতালের কর্মীদের সঙ্গে খোশগল্প জুড়ে দেন। তিনি বলেন, ‘আমার মা পিনু খান এমপি ও মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক। বাবাও এমপি ছিলেন। আমিও একজন সিআইপি। আমার নাম বখতিয়ার আলম রনি, আওয়ামী লীগের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ও একটি ব্যবসায়ী সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক। অথচ ডিবি পুলিশ আমাকে ইস্কাটনের জোড়া খুনের মামলায় ফাঁসিয়ে দিল। শিগগিরই আমার জামিন হবে।’
পুরো ঘটনা এই প্রতিবেদক প্রত্যক্ষ করেন। জোড়া খুনের মামলার এই আসামির হাতে তখন কোনো হাতকড়া ছিল না। ১৫ মিনিট দাঁড়িয়ে হাসপাতালের কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলার পর তিনি আবার কেবিনে যান। হাসপাতালের কর্মচারীরা জানালেন, বখতিয়ার কেবিনে জামাই-আদরেই আছেন। মনে চাইলে কেবিনের সামনে বিনা বাধায় ঘুরে বেড়ান। হাসপাতালের খাবার তিনি খান না। তাঁর জন্য বাসা থেকে খাবার আসে। প্রায় সারা দিনই কেবিনে লোকজন আসে।
কর্তব্যরত কারারক্ষী আবদুর রহমান জানালেন, ‘ওনার পাহারায় সার্বক্ষণিক দুজন কারারক্ষী থাকেন। তবে উনি ভদ্র মানুষ, তাই হাতকড়া পরানোর আর দরকার হয় না। আর কেবিনের ভেতরেও তাঁকে হাতকড়া পরানো হয় না। বখতিয়ারের মা পিনু খান সাংসদ ও বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক।’
কারা সূত্র জানায়, বখতিয়ার কারাগারে ডিভিশনভোগী আসামি। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ কারাধ্যক্ষ মো. নেছার আলম গত বুধবার রাতে  বলেন, বখতিয়ার অর্থোপেডিক সমস্যায় ভুগছেন—কারা কর্তৃপক্ষকে এ কথা বলার পর চিকিৎসকের পরামর্শে গত ৩১ জানুয়ারি তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এরপর থেকে তিনি সেখানেই আছেন। কারাধ্যক্ষ এই কথা বললেও গত বুধবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, বখতিয়ার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধীন ১১০ নম্বর ভিআইপি কেবিনে চিকিৎসাধীন। তাঁর তত্ত্বাবধানকারী চিকিৎসক মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এস এম হাফিজ বলেন, বখতিয়ারের কিডনির সমস্যা রয়েছে। এ ছাড়া রাতে তাঁর ঘুম হয় না। এ কারণে তাঁকে সাইকোথেরাপি দেওয়া হচ্ছে। তাঁকে শিগগিরই ছেড়ে দেওয়া হবে।
হাসপাতাল ও কারা সূত্র জানায়, এর আগেও বখতিয়ার অসুস্থতার কথা বলে চার দফায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) প্রিজন সেলে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু চিকিৎসকেরা তাঁর কোনো রোঁগ খুজে পাননি। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) বখতিয়ারকে তিন দফায় মোট ১১ দিনের রিমান্ডে নিলে তিনি তিন দফায় অসুস্থতার কথা বলে বিএসএমএমইউর প্রিজন সেলে ভর্তি হয়েছিলেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির উপপরিদর্শক (এসআই) দীপক কুমার দাস সে সময়ে আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে বলেছিলেন, তিন দফায় অসুস্থতার ভান করায় বখতিয়ারকে বিএসএমএমইউতে চিকিৎসা করানো হয়। কিন্তু সেখানের চিকিৎসকেরা তাঁর কোনো রোগ খুঁজে পাননি।
গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর বখতিয়ার বিএসএমএমইউর প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন থাকাকালে হাসপাতালে পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল মজিদ ভূঁইয়া তাঁর চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিপত্র দেখে প্রথম আলোকে বলেছিলেন, বখতিয়ারের কোনো রোগ খুঁজে পাননি চিকিৎসকেরা। এরপরই বখতিয়ারকে প্রিজন সেল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
আদালত সূত্র জানায়, আগামীকাল ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ইস্কাটনে জোড়া খুনের মামলায় মহানগর দায়রা জজ আদালতে বখতিয়ারের বিচার কার্যক্রম শুরু হবে। এর আগে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। গত জানুয়ারিতে বিচার কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তাঁর আইনজীবী আবেদন করে দুই দফায় তারিখ পরিবর্তন করেন। অভিযোগ রয়েছে, আয়েশে থাকার জন্য বারবার অসুস্থতার কথা বলে বখতিয়ার হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। আর কালক্ষেপণ করতে বিচার কার্যক্রম বারবার পেছানো হয়েছে।
এই বখতিয়ার আলম নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গত বছরের ১৩ এপ্রিল গভীর রাতে রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে প্রাডো গাড়ি থেকে তাঁর পিস্তল দিয়ে চার-পাঁচটি গুলি ছোড়েন। এতে রিকশাচালক আবদুল হাকিম ও দৈনিক জনকণ্ঠর অটোরিকশাচালক ইয়াকুব আলী আহত হন। হাকিম ১৫ এপ্রিল ও ইয়াকুব ২৩ এপ্রিল মারা যান। এ ঘটনায় হাকিমের মা মনোয়ারা বেগম ১৫ এপ্রিল রাতে রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। ডিবি পুলিশ সূত্রবিহীন এই মামলায় তথ্যপ্রযুক্তি ও দৈনিক জনকণ্ঠর ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার (সিসি) সহায়তায় সাংসদপুত্রের প্রাডো গাড়ি এবং তাঁর ছেলে বখতিয়ারের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়।

 

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/আইএম

উপরে