আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ১৬:২৩

নতুন রূপে ফিরে এসেছে মসলিন, দাম কত?

বিডিটাইমস ডেস্ক
নতুন রূপে ফিরে এসেছে মসলিন, দাম কত?

এখন থেকে চারশ-পাঁচশ বছর আগে ঢাকাই মসলিনের কদর ছিল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। মসলিনের প্রসঙ্গ উঠলে তার সাথে অনেক গল্পও সামনে আসে। জনশ্রুতি আছে যে একটি মসলিন শাড়িকে দিয়াশলাইয়ের বাক্সে রাখা সম্ভব। যদিও এর স্বপক্ষে কোন প্রমাণ মেলেনা। দিয়াশলাইয়ের বাক্সে রাখা সম্ভব না হলেও, মসলিনের কাপড়ের সূক্ষ্মতা এবং হালকা আরামদায়কভাব নিয়ে কোন বিতর্ক নেই। এই মসলিন বিলুপ্ত হয়ছে আজ থেকে অন্তত তিনশ বছর আগে।

ইতিহাসের অংশ হওয়া মসলিনকে আবারও ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ হিসেবে রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরে শুরু হয়েছে মাসব্যাপী মসলিন প্রদর্শনী। দৃক নামে ঢাকার একটি সৃজনশীল প্রতিষ্ঠান দাবি করেছে একটি মসলিন শাড়ি তৈরি করার কথা। আর দৃক, আড়ং ও জাতীয় জাদুঘরের যৌথ আয়োজনে নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে শোভা পাচ্ছে নতুন-পুরনো মিলিয়ে ঐতিহ্যবাহী মসলিন। তবে তা শুধু প্রদর্শনের জন্যই, তাই দামের ব্যাপাটা উল্লেখ নেই। আগামী ৩ মার্চ পর্যন্ত সেখানে দর্শকরা দেখতে পাচ্ছে মসলিনসংক্রান্ত শিল্পকর্ম। পাশাপাশি জানা যাচ্ছে, মসলিনকে ঘিরে নানা তথ্য, গল্প ও ইতিহাস।

জানা যায়, ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় সপ্তদশ শতকে মসলিন শিল্প বিকাশ লাভ করেছিল। তবে মুঘল আমলে মসলিন কাপড়ের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সে যুগে মসলিন তৈরির জন্য বিখ্যাত ছিল ঢাকা, ধামরাই, সোনারগাঁ, টিটবাদি, জঙ্গলবাড়ী আর বাজিতপুর। জঙ্গলবাড়ী অধিকাংশের পেশা ছিল মসলিন বোনা। জঙ্গলবাড়ী থেকে মাইল কুড়ি দূরে বাজিতপুরে জন্মাত উন্নতমানের কার্পাস, যা থেকে তৈরি হতো উঁচুমানের মসলিন।

আরো জানা যায়, ঢাকায় তখনকার সময়ে সাত শর বেশি তাঁতি নিয়োজিত ছিল এ কাজে। মসলিন তৈরি করার জন্য দরকার হতো বিশেষ ধরনের তুলা ও ফুটি কার্পাস। এ বিশেষ ধরনের কার্পাসটি জন্মাত মেঘনা নদীর তীরে ঢাকা জেলার কয়েকটি স্থানে। সাধারণত, মহিলারাই সুতা কাটা আর সূক্ষ্ম সুতা তোলার মতো পরিশ্রম এবং ধৈর্যের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। সুতা তোলার সময় কম তাপ এবং আর্দ্রতার দরকার হতো। তাই একেবারে ভোর বেলা আর বিকেলের পরে এ কাজ করা হতো। আর্দ্রতার খোঁজে অনেক সময় নদীতে নৌকার ওপর বসে সুতা কাটার কাজ চলত।

এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে ২০১৪ সাল থেকে মসলিন নিয়ে গবেষণা শুরু করে দৃক। গত বছর একটি মসলিন শাড়ি তৈরি করতে সমর্থ হয় প্রতিষ্ঠানটি। তবে মসলিন তৈরির কাজটি ছিল ভীষণ জটিল, কঠিন ও সময়সাধ্য। তার চেয়েও বড় কথা হলো মসলিন তৈরির জন্য দরকার হয় অসামান্য নৈপুণ্য ও পরম ধৈর্য। এমনটা জানান দৃকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম। তিনি জানান, ‘মসলিনের গবেষণা শুরুর পর একপর্যায়ে ভারতের জয়পুরে ফুটি কার্পাসের কাছাকাছি প্রজাতির তুলার বীজ পাওয়া যায়। সেই তুলা থেকে তৈরি হয়েছে নতুন এই মসলিন কাপড়। বস্ত্র প্রকৌশলীরা এটিকে মান ঢাকাই মসলিনের কাছাকাছি বলে মত দিয়েছেন বলেও জানান সাইফুল ইসলাম।’

মুঘল আমলে মেঘনা ও শীতলক্ষ্যার পারে যে ফুটি কার্পাস তুলার চাষ হতো, তা দিয়ে তৈরি করা যেত মসলিন। তবে মসলিন তৈরির উপযোগী সেই পরিবেশ আর নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ায়ও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এ বিষয়টি একটু সমস্যা তৈরি করতে পারে। তবে গবেষকরা জানান, ‘লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট জাদুঘরে তখনকার মসলিনের একাধিক নমুনা রয়েছে। আদি মসলিনের ডিএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিস্তারিত জানা যাবে। সেটা থেকে মাটির গুণাগুণ, আবহাওয়া পরিস্থিতি ও মসলিনের জন্য নির্ধারিত এলাকাগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এসব সমন্বয় করা সম্ভব হলে আবারও মসলিনের সেই হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

পাশাপাশি গবেষণার মাধ্যমে আসল ফুটি কার্পাসের বীজ উত্পাদন, গুণগতমানের উন্নয়ন, দক্ষ তাঁতিদের সম্পৃক্ত করা হলে সাফল্য অনিবার্য।’ মসলিনের গৌরব ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে খুবই আশাবাদী যুক্তরাজ্যের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট জাদুঘরের সিনিয়র কিউরেটর রোজমেরি ক্রিল। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একসময় মসলিন মানেই ছিল বাংলার ইতিহাস। সেই ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং বিবর্তনের ধরনও ছিল খুব চমকপ্রদ। দুঃখজনক হলো, এ দেশে এক খণ্ডও মৌলিক মসলিন নেই। তবে আমাদের জাদুঘরে তা এখনো সংরক্ষিত আছে। মসলিনের পুনরুজ্জীবনে আমরা প্রয়োজনীয় সকল সহযোগিতা দিয়ে যাব। কারণ পশ্চিমা দেশগুলোতে এসব কাপড়ের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, যা বাংলাদেশ গ্রহণ করতে পারে।’

এ বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জামাল আবদুল নাসের চৌধুরী বলেন, ‘আজকাল বাজারে যে জামদানি পাওয়া যায়, তা মসলিনেরই একটি ধারা। এগুলো যেহেতু এখনো টিকে আছে, সেহেতু মসলিনকেও ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। দেশে গত বছর জিআই প্রকাশিত হয়েছে, যা দেশের যেকোনো পণ্যের প্যাটেন্ট সংরক্ষণে ভূমিকা রাখবে। মৌলিক মসলিন ফিরিয়ে আনা সরকারের একটি স্বপ্ন বলেও জানান তিনি।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/এসএম

উপরে