আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ২২:১৬

কোনো পড়াশুনা জানে না তারা দোভাষি হিসেবে বেতন নিচ্ছেন ডলারে

বিডিটাইমস ডেস্ক
কোনো পড়াশুনা জানে না তারা দোভাষি হিসেবে বেতন নিচ্ছেন ডলারে

পুরান ঢাকার বঙ্গবাজার সাশ্রয়ী মূল্যে পোশাক কেনার জন্য বিখ্যাত।মৌসুম ভেদে পোশাকের জন্য শুধু দেশের নাগরিক নন, বাংলাদেশে বসবাসরত বিদেশি কিংবা বঙ্গবাজার সম্পর্কে যেসব বিদেশি জানেন, তারাও বাংলাদেশে এলে ঢু মারেন এখানে।  আর তাদের কেনাকাটায় সাহায্য করেন দোভাষীরা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, বিদেশিদের মুখে শুনে শুনে ভাষা রপ্ত করেছেন তাঁরা। এভাবেই অন্তত কাজ চালিয়ে নেওয়ার মতো ১০টির বেশি ভাষা রপ্ত করেছেন তাঁরা।

তাঁদের মধ্যে সাতজন নারী। তাঁরা বেশির ভাগ সময় এখানেই বসে থাকেন। নজর রাখেন সামনের সড়কে। যানবাহন থেকে কোনো বিদেশি নাগরিক নামার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা এগিয়ে যান। যিনি আগে গিয়ে কথা বলতে পারবেন তিনিই দোভাষীর কাজটি পান। ক্রেতাদের কেউ কেউ একাধিক বা অনেক বেশি পণ্য কেনাকাটা করেন তখন কয়েকজন মিলে কাজ পান। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা এই কাজ করছেন। তবে বিদেশি নাগরিক হত্যাসহ বিভিন্ন কারণে ইদানীং আর আগের মতো বিদেশিদের দেখা মেলে না। ফলে তাঁদের আয় কমেছে।

রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় বড় বড় হোটেল ও মার্কেট হয়েছে। বিদেশিরা হোটেলের কাছাকাছি মার্কেটে বেশি যাচ্ছেন। যানজট ঠেলে আর এত দূরে আসতে চাচ্ছেন না।
বঙ্গবাজারের এই দোভাষীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশি নয়। কেউ কেউ তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। ছোটবেলায় এখানে কাগজ কুড়াতে আসতেন কেউ কেউ। তখন বিদেশিদের আনাগোনা ছিল ব্যাপক। বিদেশিদের পিছু পিছু ঘুরে বিভিন্ন ভাষা রপ্ত করে ফেলেছেন। এখন তাঁরা দোভাষীর কাজটিকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। তবে কাগজে-কলমে এই দোভাষীদের কোনো স্বীকৃতি নেই। নেই কোনো পরিচিতি কার্ড। ফলে অনেক সময় বিদেশিরা তাঁদের বিশ্বাস করতে চান না। রাস্তাঘাটে রাত-বিরাতেও অনেক বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।

দোভাষীদের পায়ে প্লাস্টিকের চপ্পল। বেশির ভাগেরই পোশাক-আশাকে দৈন্যের ছাপ। তবে এই দোভাষীরাই যখন ইংরেজি বা নিজেরা নিজেদের মধ্যে অন্য দেশের ভাষায় স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলে তখন অন্য পোশাক বা অন্য বিষয়গুলো ম্লান হয়ে যায়। কথা হয় এমন কয়েকজন দোভাষীর সাথে।

শারীরিক প্রতিবন্ধী (উচ্চতায় বেশ খাটো) মিরাজুল আলম বললেন, ‘বিদেশিরা এলে তারা যে ব্র্যান্ডের জামাকাপড় চায় তা দোকানে নিয়া দেখাই। তারা জিনিসপত্র সস্তা পাইয়্যা বস্তা ভইরা কেনে। বৃষ্টির দিনে ছাতা নিয়া দাঁড়াই থাকি। কেনাকাটা শেষে গাড়িতে তুলে দিই। বিদেশিরা খুশি হয়ে যা দেয় তা-ই নিই।’ বেশ গর্বের সঙ্গেই জানালেন, তিনি অনেকগুলো ভাষা জানেন।

দুই সন্তানের জননী পারভীন বললেন, ‘আমি খুব অল্প পড়ছি। ছোটবেলা থেকে এইখানে থাকতে থাকতে বহু ভাষা শিইখ্যা ফালাইছি। ফ্রান্সের ভাষা, ইংরেজি, আরবি বেশি বলতে পারি। কোনো দিনে পাঁচ শ থেকে দুই হাজার টাকাও পাই। আবার কোনো সময় কাজ থাকে না।’ রাবেয়া জানালেন, তাঁর স্বামীও একসময় এই কাজ করতেন। কিন্তু কাজ কমে যাওয়ায় এখন অন্য ব্যবসা শুরু করেছেন।
স্বামী নেশা করে এবং কোনো কাজ করে না বলে বেবি আক্তার স্বামীকে তালাক দিয়েছেন। ছয় বছর বয়সী সন্তানকে মায়ের জিম্মায় রেখে প্রতিদিন তিনি এখানে আসেন দোভাষীর কাজ করতে। নাদিয়া আহমেদের দুই সন্তান। স্বামী রিকশা চালান। বাড়িতেও ইংরেজিতে কথা বলেন কি না, জানতে চাইলে নাদিয়া হেসে বলেন, ‘স্বামী তো ইংরেজি বুঝে না।’
বঙ্গবাজারের বিভিন্ন দোকানের মালিক বা কর্মচারীরা এই দোভাষীদের কাজটিকে স্বাগতই জানান। তবে অনেকেই অকপটে স্বীকার করলেন, দোভাষীদের জন্যই তাঁরা বিদেশিদের কাছে বেশি দাম হাঁকাতে পারেন না। অন্যদিকে আবার এই দোভাষীরাই বিদেশিদের দোকানে নিয়ে আসেন বলে ব্যবসাও হয়।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/এসএম

উপরে