আপডেট : ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ২০:৫৫

বঙ্গবন্ধুকে বহণকারী ডিসি-১০ বাংলাদেশ সরকারকে দিতে চান ক্যাপ্টেন মোস্তফা

বিডিটাইমস ডেস্ক
বঙ্গবন্ধুকে বহণকারী ডিসি-১০ বাংলাদেশ সরকারকে দিতে চান ক্যাপ্টেন মোস্তফা

দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে এসেছে স্বাধীনতা। কিন্তু জাতির প্রাণভোমরা তখনো পাকিস্তানে বন্দি। অবশেষে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বাঙালি ফিরে পায় প্রিয় নেতাকে।

সফল পরিসমাপ্তি ঘটে মহান মুক্তিযুদ্ধের। ওই দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের করাচি থেকে সরাসরি লন্ডনে এবং সেখান থেকে ভারত হয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন। আর এই মহান নেতাকে বহন করে ইতিহাসে স্থান করে একটি যন্ত্রযান ব্রিটিশ রয়েল এয়ার ফোর্সের বিমান ডিসি-১০।

বিমানটির মালিক এখন বাংলাদেশেরই রাজবাড়ীর কৃতী সন্তান ক্যাপ্টেন মোস্তফা আজিম আওলাদ। ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠা বিমানটি তিনি উপহার হিসেবে দিতে চান বাংলাদেশ সরকারকে।

সম্প্রতি গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে এক সাক্ষাৎকারে এমন অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন ক্যাপ্টেন মোস্তফা আজিম আওলাদ। তাঁর জন্ম রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার কসবামাজাইল গ্রামে। বাবার নাম ফেরদৌস রেজা আওলাদ। চার ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় তিনি। তাঁর এক বছর বয়সেই পরিবারটি ইংল্যান্ডে চলে চায়।

সেখানেই তাঁরা এখনো বসবাস করছেন। ছেলেবেলায়ই তাঁকে পেয়ে বসেছিল আকাশে ওড়ার স্বপ্ন। এরই ধারাবাহিকতায় ক্যাডেট অফিসার হিসেবে ১৯৮৫ সালে যোগ দেন ইংল্যান্ডের কিং এয়ার স্কুল অব ফ্লাইং (বিগেন হিল) বিদ্যালয়ে। এরপর ১৯৯১ সালে তিনি ব্রিটিশ এয়ারলাইনসে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি ওই এয়ারলাইনসের সিনিয়র ক্যাপ্টেন ও প্রশিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত। পাশাপাশি তিনি ইউএন চার্টার ফ্লাইট রক্ষণাবেক্ষণ করেন।

সেই সঙ্গে তিনি ২০০৫ সালে ইংল্যান্ডে ইম্পেরিয়াল এভিয়েশন নামে একটি প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছেন। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন দেশ থেকে পুরনো বিমান ক্রয় ও তা ভেঙে বিক্রির কাজ করে। এরই মধ্যে তাঁর ওই প্রতিষ্ঠান ২৩টি বিমান কিনেছে। আর এসবের দুটি ছাড়া সবই ইতিমধ্যে ভেঙে ফেলা হয়েছে। ভালো থাকা দুটি বিমানের একটি বিমান তিনি ইংল্যান্ডের ব্রুকলেন্স জাদুঘরে দাদা আওলাদ হোসাইনের নামে হস্তান্তর করেছেন। অন্য বিমানটি ডিসি-১০, যেটি তিনি সযতনে নিজ হেফাজতে রেখেছেন। কারণ বিমানটি বাংলাদেশের জন্ম ও বঙ্গবন্ধুর ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

ক্যাপ্টেন মোস্তফা আজিম বলেন, ‘আমি জন্মগতভাবে এক বাংলাদেশি। আমার গভীর ভালোবাসা আর দুর্বলতা রয়েছে বাংলাদেশকে ঘিরে। আর সে জন্যই বাংলাদেশ ও জাতির জনকের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই ডিসি-১০ পরম মমতায় আগলে রেখেছি মাসের পর মাস।’

আলাপচারিতায় জানা গেল, ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে ব্রিটিশ রয়েল এয়ার ফোর্স প্রকাশ্য নিলামে তোলে পুরনো হয়ে যাওয়া ১৬টি উড়োজাহাজ। এর মধ্য থেকে তিনটি উড়োজাহাজ কিনে নেয় ইম্পেরিয়াল এভিয়েশন। এক কোটি ৩০ লাখ টাকায় কেনা ডিসি-১০ বিমানটির ভিআইপি লগবুক পরীক্ষা করে ক্যাপ্টেন মোস্তফা আজিম জানতে পারেন, ওই বিমানে চড়েই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের করাচি থেকে লন্ডন ও পরে ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন।

এরপরই তিনি আর বিমানটি ভাঙতে দেননি। বরং বিমানটি সচল রাখতে সযতনে রক্ষণাবেক্ষণ শুরু করেন। তিনি বিমানটি অনেকটা ফাংশন রুমের মতো করে সাজিয়েছেন এবং নানা অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দিচ্ছেন। আর ঢাউস আকারের ওই ডিসি-১০ বিমানে একসঙ্গে ১৩০ জন মানুষ বসে খাওয়া দাওয়া করতে পারে। বর্তমানে ভাড়া বাবদ যে টাকা তাঁর রোজগার হয় তার পুরোটাই তিনি ব্যয় করছেন বিমানটি রক্ষণাবেক্ষণের কাজে।

রাজবাড়ীর এই কৃতী সন্তান জানান, বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত বিমানটি তিনি বাংলাদেশ সরকারকে দিতে চান বিনা মূল্যেই। তাঁর এই ইচ্ছার বিষয়টি তিনি সাবেক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী কর্নেল (অব.) ফারুক খানকে জানিয়েছেন।

এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে একাধিকবার মতবিনিময়ও হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আগামী জুন মাসে বিমানটি পরিদর্শনের কথা রয়েছে। তবে সরকারি সিদ্ধান্তের অভাবে তিনি এখনো বিমানটি হস্তান্তর করতে পারেননি।

জানা গেল, মোস্তফা আজিম স্ত্রীকে নিয়ে বেশিরভাগ সময় ইংল্যান্ডেই থাকেন। তবে মন চাইলেই দেশে ছুটে আসেন। ওঠেন রাজধানী ঢাকার গুলশানের বাসায়। রাজবাড়ীর গ্রামের বাড়িতে যেতেও ভোলেন না। এখানে তাঁদের পরিবারের প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা, আতাহার হোসেন উচ্চ বিদ্যালয় এবং আমজাদ হোসেন কলেজে তিনি সময় দেন।

শুধু তাই নয়, তাঁদের বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া বিএনসিসি দলটির ব্যয়ভার তিনি নিজেই বহন করেন। পরিচালনার ভারও তুলে নিয়েছেন নিজ কাঁধে। কথা প্রসঙ্গে মজার একটি তথ্য জানালেন মোস্তফা আজিম। বললেন, ‘একবার স্ত্রীর জন্য গাড়ি কিনতে গিয়ে একটি যুদ্ধবিমান ক্রয় করে সারা বিশ্বে হৈচৈ বাধিয়ে দিই। আর হৈচৈ হবেই বা না কেন! ওই যুদ্ধবিমানটি ছিল ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের।’

নিজের কর্মব্যস্ততা সম্পর্কে বলতে গিয়ে মোস্তফা আজিম জানান, জীবনের প্রথম সেসনা ওয়ান-৫২ বিমান নিয়ে স্বপ্নের আকাশে উড়েছিলেন তিনি। এরপর বিদেশি বিভিন্ন সিনেমায় তিনি বিমান নিয়ে কাজ করেছেন।

এ ছাড়া টিভি চ্যানেল ডিসকভারি, বিবিসি, সিএনএনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করে চলেছেন। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৪ ও ২০০৬ সালে তিনি পেয়েছেন বিবিসি ব্লুপিটার পুরস্কার।

 প্রসঙ্গত, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু হানাদারমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন বিজয়ের মালা পরে। সেদিন গোটা বাঙালি জাতি রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিল। কখন তাদের প্রিয় নেতা, স্বাধীন বাংলার মহান স্থপতি স্বাধীন দেশের মাটিতে আসবেন। পুরো দেশের মানুষই যেন জড়ো হয়েছিল ঢাকা বিমানবন্দর এলাকায়। বিমানবন্দর থেকে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দান (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পর্যন্ত রাস্তা ছিল লোকারণ্য। অবশেষে আকাশ ফুঁড়ে নেমে আসে ডিসি-১০। বিমানটির খোলা দরজায় বিজয়ের বেশে দেখা দেন বঙ্গবন্ধু।

উপরে