আপডেট : ২৮ জানুয়ারী, ২০১৬ ১৭:১৭

সমকামী সানজিদার প্রেমের গল্প

বিডিটাইমস ডেস্ক
সমকামী সানজিদার প্রেমের গল্প

একেবারেই নজিরবিহীন এক প্রেম! বিপরীত লিঙ্গের নয়, বরং সমলিঙ্গের দু’জন মানুষ জড়িয়েছে পরস্পরের প্রেমে। শুধু কি প্রেম, সে প্রেম রীতিমতো পরিণয়ে গড়িয়েছে।

 হ্যাঁ, মালাবদল করে দুই তরুণী সানজিদা আর পূজা ঘরও বেঁধেছেন গোপনে। এরপর এ নিয়ে হয়ে গেল কতো না নাটক--- থানা-পুলিশ, লোক জানাজানি! 

পিরোজপুর শহরের একটি গ্রাম থেকে আসা একজন নারী সানজিদা। ভালবেসেছেন তারই মত একজন নারীকে। আর সে কারণেই তাকে পড়তে হয়েছে নানা হয়রানিতে। জেলও খাটতে হয়েছে। সানজিদার মুখেই শুনুন নজিরবিহীন সেই ভালবাসার গল্প-

২০১৩ সালের কথা। সানজিদার বয়স তখন ২০ বছর। পড়ালেখার জন্য ঘর ছাড়ার পর এমন একজনের সাথে তার দেখা হল যাকে নিয়ে জীবনের বাকিটা সময় কাটাতে চাইলেন তিনি।

তবে সমস্যা হল সেই ব্যক্তিটি পুরুষ নয়, একজন নারী! বাংলাদেশের সমাজে সম লিঙ্গের বিয়ে গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে সুখের বদলে তাকে পড়তে হয়েছে অপহরণের অভিযোগের মুখে, খাটতে হয়েছে জেল।

পরিবারের সবচেয়ে বুদ্ধিমতী সন্তানটি সংসারের অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারবেন-এই আশায় সানজিদার স্কুল শিক্ষক বাবা তাকে বাড়ি থেকে দূরের শহরে পাঠাতে রাজি হন।

পিরোজপুর সরকারি কলেজে বাংলা সাহিত্যে পড়াশোনা শুরু সানজিদার। সেখানে হিন্দু ধর্মানুসারী একজন ব্যবসায়ী কৃষ্ণকান্তের অনুরোধে তার মেয়ে পূজাকে হোম টিউটর হিসেবে পড়াতে শুরু করেন সানজিদা। এরপর ১৬ বছর বয়সী পূজার সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হয় সানজিদার।

সানজিদার জিনস আর টি-শার্ট গতানুগতিক গ্রাম্য সমাজে কিছুটা দৃষ্টিকটু বলে বিবেচিত হলেও, কৃষ্ণকান্তের পরিবার তাকে বেশ পছন্দই করতো।

কিন্তু এই সমাজে দুটো মেয়ের প্রেম কেউ মেনে নেবে না সেটা ভালই জানতেন সানজিদা এবং পূজা। ফলে তারা পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

২০১৩ সালের জুলাই মাসে পিরোজপুরেরই সপ্তদশ শতকের একটি মন্দিরে গিয়ে মালা বিনিময়ের মাধ্যমে তারা বিয়ে করেন। হিন্দু বিয়ের রীতি অনুসারে পূজার সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দেন সানজিদা। এরপর তারা লঞ্চে করে বরিশালে চলে যান। সেখানে বাসা ভাড়া নেন, গড়েন সুখের সংসার।

সানজিদার ভাষায়, “সেখানেই আমাদের বিবাহিত জীবন শুরু করি। আমরা সেখানে দেড় সপ্তাহের মত ছিলাম। যে সময়টা ছিল আমাদের একসাথে কাটানো সবচেয়ে সুখের সময়”।

এমনকি তারা যে বাসায় থাকতেন সেই বাসার মালিকও তাদের দুটি মেয়ের এই প্রেমের সম্পর্কে অভিভূত হয়ে তাদের আশ্রয় দেন বলে জানান সানজিদা।

তবে পূজার বাবা কৃষ্ণকান্ত থানায় গিয়ে সানজিদার বিরুদ্ধে তার মেয়েকে অপহরণের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। এতেই ভেঙ্গে যায় তাদের সুখের সংসার।

এদিকে মামলার পরে বরিশাল শহর ছেড়ে সানজিদা এবং পূজা চলে যান ঢাকায়। মোহাম্মদপুরের মোহম্মদীয়া হাউজিংয়ের ৫ নম্বর রোডের ১১ নম্বর বাসা ‘ময়না ভিলায়’ আবারও সংসার শুরু করেন তারা।

এভাবে পিরোজপুর ছাড়ার পর তিন মাস কেটে যায়। এমনই এক সময় পুলিশের বিশেষ বাহিনী র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‍্যাব) তাদের খুঁজে বের করে।

সানজিদাকে গ্রেপ্তার করে পিরোজপুর পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়। আর পূজাকে তুলে দেয়া হয় তার পরিবারের কাছে।

এরপর সানজিদাকে পড়তে হয় নানা বিদ্রূপের মুখে। তাকে অনেকেই প্রশ্ন করেন, তোমাকে দেখতে তো খুব নিষ্পাপ মনে হয়। তবে তোমার মনটা এত কুৎসিত কেন।

বাংলাদেশে সমকামীদের একটি সংগঠন বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির পরিচালক ফরিদা বেগম বলছিলেন, এটা শুধু দুই নারীর প্রেমের ঘটনাই নয়, একইসঙ্গে এখানে হিন্দু-মুসলিম দুই ধর্মের প্রেমের বিষয় রয়েছে। ফলে বিষয়টি কিভাবে সামলাতে হবে সেটি পুলিশ এমনকি সানজিদার আইনজীবীও ঠিক বুঝে উঠেতে পারছিলেন না।

গ্রেপ্তারের পর আড়াই মাস কারাভোগ করে জামিনে মুক্তি পান সানজিদা। জেলের ভেতর নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে হয় তাকে। তবে সবচেয়ে কষ্টকর ছিল তার লিঙ্গ পরীক্ষার বিষয়টি, জানান সানজিদা।

তিনি বলেন, "নারী পুলিশ সদস্যদের পাঠানো হতো আমি ছেলে না মেয়ে সেটি দেখতে। সে এসে আমার সারা শরীরে হাত দিয়ে দেখতে থাকে। এটি ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে লজ্জাজনক পরিস্থিতি। এতটাই নির্মম ছিল যে আমার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছা করতো। তারা তিনবার একই কাজ করে”।

তবে বাংলাদেশের গণমাধ্যম বিষয়টিকে দুর্ধর্ষ এবং রোমাঞ্চকর প্রেমের গল্প হিসেবে তুলে ধরে প্রচার করে।

সাংবাদিকদের সেসময় পূজা একটি বিবৃতি দেন। সেখানে বলা হয়, “একটি ছেলে যদি একটি মেয়েকে ভালবাসতে পারে। তাহলে একটি মেয়ে আরেকটি মেয়েকে ভালবাসতে পারবে না কেন?”

এই নজিরবিহীন প্রেমকে হরমনজনিত কোনও সমস্যা বলে মানতে নারাজ সানজিদা। তার দাবি তিনি প্রকৃতিগত ভাবে একজন নারী এবং একজন নারী হিসেবেই তিনি আরেকজন নারীকে ভালবাসেন।

সানজিদা নানা হয়রানি ও সামাজিক হেনস্থার পরও মনে করেন, একজন নারীকে ভালবাসার অধিকার তার রয়েছে। সে কারণেই সম্ভবত তিনি আবারও প্রেমে পড়েছেন এবং তার ভালবাসার মানুষটি এবারও একজন নারীই।

 

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

 

উপরে