আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৫ ০১:৫২

একদলে বসে বসে সিল মারে, অন্যরা বসে বসে ভাঁজ করে; বরিশালে ভোটার আছে কয়জনা

আজিম হোসেন, বরিশাল
একদলে বসে বসে সিল মারে, অন্যরা বসে বসে ভাঁজ করে; বরিশালে ভোটার আছে কয়জনা

কনকনে শীত উপেক্ষা করে গৌরনদী পৌরসভা নির্বাচনে ভোট দিতে এসেছেন ষাটোর্ধ বৃদ্ধা আমেনা বেগম। ভোট কেন্দ্রে প্রথমে তাকে প্রবেশ করতেই দেয়নি আওয়ামীলীগ সমর্থিত নৌকা মার্কার প্রার্থী হারিচুর রহমানের সমর্থকরা। কেন্দ্রের সামনে বসে কান্নাকাটি করলে পরে তাকে দুটো ব্যালট দেয়া হয় ভোট দেবার জন্য।

তাও আবার মেয়র প্রার্থীরটা বাদ দিয়ে কেবল দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর। কারণ মেয়র প্রার্থীর ভোট অনেক আগেই শেষ করে দেয়া হয়েছিলো। আর মেয়র প্রার্থীর সিলমারা ওই ব্যালট পেপারগুলো কেন্দ্রের সামনে বসেই উপজেলা যুবলীগ নেতা বুলবুল হাওলাদারের নেতৃত্বে ভাজ করে তা বক্সে ঢুকাচ্ছিলো নৌকা প্রতীকের সমর্থকরা। এ চিত্র গৌরনদী পৌরসভার কাশেমাবাদ সিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসার।

গতকাল দুপুর সাড়ে বারোটার সময় ওই কেন্দ্রে গেলে এমন চিত্রই দেখা যায়। যদিও কেন্দ্রে অভ্যন্তরে কাউকেই প্রবেশ করতে দেয়নি নৌকা প্রতীকের কর্মী-সমর্থকরা। এ কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার সিদ্দিকুর রহমানের সাথে কথা বলে জানা যায় মোট ২৬৫৭ ভোটের ২২শতাধিক ভোট দুপুর ১২টার মধ্যে কাস্ট হয়েছে। আর ভোটার উপস্থিতি বেশী হবার কারণে এমনটি সম্ভব হয়েছে বলে তিনি জানান। কেন্দ্রের সামনে বসে সিলমারা ব্যালট পেপার ভাজ করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিষেধ করেছি শোনেনা। ওপর মহলকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। গৌরনদী পৌরসভার প্রায় ৮টি ভোট কেন্দ্র ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে।

বানারীপাড়া পৌরসভা নির্বাচনে অধিকাংশ কেন্দ্রেই বিএনপির প্রার্থীর কোন পোলিং এজেন্টকে পাওয়া যায়নি। কারণ বিএনপির প্রার্থীর ধানের শীষ প্রতীকের এজেন্টকে আওয়ামীলীগ প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়ে তার এজেন্ট কার্ড নিয়ে ছবি ফেলে দিয়ে তারাই(নৌকা প্রতীকের কর্মীরা) ভোট কক্ষে অবস্থান করছিলো। বানারীপাড়া পৌরসভার রউফ মিয়ার বাড়ির সামনের মোবাইল টাওয়ার সংলগ্ন অস্থায়ী কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় বিএনপির প্রার্থী মাহাবুব মাস্টারের পোলিং এজেন্ট এর কার্ড ঝুলানো গোলাম রাব্বি নামের এক যুবক নৌকা প্রতীকে সিল পেটাচ্ছেন। যদিও ওই কার্ডে কোন ছবি সংযুক্ত ছিলো না। তার পরিচয় জানতে চাইলে তিনি ধানের শীষের পোলিং এজেন্টের ওই কার্ডটি দেখান। যদিও গোলাম রাব্বি নামের যে যুবককে ধানের শীষের পোলিং এজেন্ট দেয়া হয়েছিলো তাকে দেখা কেন্দ্রের বাইরের একটি দোকানে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে। কারণ তাকে ভোট গ্রহণ শুরু হবার সাথে সাথে মারধোর করে বুথ থেকে বের করে দেয়া হয়েছিলো। গোলাম রাব্বির অভিযোগ তার র্ক্ডা সাইফুল নামের আওয়ামীলীগের এক কর্মী পরে সিল পিটিয়েছেন। তাকে বুথে প্রবেশের সাথে সাথে মারধোর করে র্ক্ডা রেখে বের করে দেয়া হয়।

ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার কাওসার হোসেন বলেন, শুনেছি ধানের শীষের যিনি পোলিং এজেন্ট ছিলেন তিনি নিজেই নাকি বের হয়ে গিয়েছিলেন বুথ থেকে। এতে আমাদের করার কিছুই নাই। বানারী পাড়া পৌরসভার ৮নং কুন্দের হাট কালিবাড়ি মন্দির অস্থায়ী কেন্দ্রেও একই চিত্র দেখা যায়। সেখানে বিএনপির প্রার্থীর পোলিং এজেন্টকে ভোট কক্ষ থেকে বের করে দিয়ে তার ছবি ফেলে দিয়ে ব্যাবহৃত কার্ড ঝুলিয়ে নৌকা প্রতীকের পক্ষে সিল পেটানো হচ্ছিলো। কেবল এ পৌরসভায়ই নয় বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ,মূলাদী ও বাকেরগঞ্জে ভোট গ্রহণে একই চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে।

এ পৌরসভাগুলো বেশকিছু কেন্দ্রে বিএনপির মেয়র প্রার্থীর পোলিং এজেন্টকে প্রবেশই করতে দেয়া হয়নি। তাদের পরিচয়পত্র নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর সমর্থকরা নিয়ে ছবি ফেলে দিয়ে তারপর তা ব্যবহার করে নৌকার পক্ষে সিল পিটিয়েছেন। অর্থাৎ এ চারটি পৌরসভায় আওয়ামীলীগের মেয়র প্রার্থীকে তাদের কর্মীরা কৌশলেই ভোট দিয়েছেন।

উজিরপুর পৌরসভার নির্বাচনের চিত্র একটু পৃথক। এ পৌরসভার রসুলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সকাল সোয়া আটটার মধ্যে দুইশত ভোট কাস্ট হয়েছে এমন তথ্য ছড়িয়ে পরলে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী শহিদুল ইসলাম ভোট গ্রহণে বাধা দেয়। পরে প্রশাসন তাকে কেন্দ্র থেকে বের হতে বললে তার সমর্থকদের সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়।

এ কারণে ওই কেন্দ্রে দুইঘন্টা ভোট গ্রহণ বন্ধ থাকে।  বিএনপির মেয়র প্রার্থী শহিদুল ইসলামের অভিযোগ নির্বাচনের আগের দিন রাতে দুইশত ব্যালট পেপারে নৌকা প্রতীকের সিল পিটিয়ে তা ব্যালট বক্সে  ভরে রাখা হয়েছে। এ খবর ছড়িয়ে পরলে প্রিজাইডিং অফিসার বলেন সোয়া আটটার মধ্যে দুইশত ভোট কাস্ট হয়ে গেছে। তার প্রতিবাদ জানালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সাথে নিয়ে আওয়ামীলীগ ক্যাডাররা হামলা চালায় তার কর্মী-সমর্থকদের ওপর।

তবে ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার আবুল কালাম আজাদ বলেন, তার কেন্দ্রে মোট ভোট ১০৮৭টি। কিন্তু নির্বাচন অফিস থেকে তাকে সারে আটশ ব্যালট পেপার দেয়া হয়েছিলো। বাকি দুইশ ব্যালট তিনি পাননি। এ কারণে সমস্যা হয়েছে। তাই দুইঘন্টা ভোটগ্রহণ বন্ধ থাকলেও পরে আবার তা চালু হয়েছে। উজিরপুর পৌরসভার ৮নং মাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, উজিরপুর মহিলা কলেজ কেন্দ্র  ও নং এম এ রশীদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে বেলা সারে এগারোটার মধ্যে ৭০ভাগ ভোট প্রদত্ত হয়েছে। তবে ভোটার উপস্থিতি তেমন একটা চোখে পরেনি।

তবে বরিশাল জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আ. হালিম খান বলেছেন, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া বরিশালের ছয়টি পৌরসভায়ই শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোথাও কোন বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া যায়নি। তবে বরিশালে পৌরসভা নির্বাচনে গড়ে শতকরা ৭০ভাগ ভোট প্রদত্ত হয়েছে বলে তিনি জানান।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জেডএম

উপরে